তালেবানের বাধা সরকার

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো মুসলিম দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। পশ্চিমা লবি এ শান্তিচুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অন্যরা ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র সরকাররা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর নতুন করে কোনো যুদ্ধ বাধাননি। উল্টো বেশ কয়েকটি দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।

অনেকে ট্রাম্পের এ ঘোষণাকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু এটাও সত্যি, ট্রাম্প প্রশাসন তখনই যুদ্ধরত কোনো দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছেন যখন ওই দেশে তাদের মদদপুষ্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে গেছে। বলা চলে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজে যুদ্ধ না করে প্রক্সি ওয়্যারের দিকে ঝুঁকছে বেশি। এমন বাস্তবতাতেই সামনে চলে আসে আফগানিস্তানে তালেবান ও দেশটির সরকারের শান্তি আলোচনা ইস্যু।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় দোহাতে তালেবান ও আফগান সরকার আলোচনা বসেছে। কাতারের শান্তি আলোচনায় আফগান সরকারের পক্ষ থেকে তালেবানকে কারাবন্দি যোদ্ধাদের মুক্তির শর্তে ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’র আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে শান্তি ফেরাতে সবার আগে ‘ইসলামি শাসনব্যবস্থা’ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে তালেবান। আফগানিস্তানে কোন শাসন ফিরবে তা নির্ধারণ করতে পারবে না দেশটির জনগণ। শাসনের ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করবে হয় তালেবান পক্ষ নয়তো যুক্তরাষ্ট্র মদদপুষ্ট আফগান সরকার।

দুই দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতে আফগানিস্তানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। এবার শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশটির নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনায় অংশ নিচ্ছে তালেবান। গত শনিবার থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় তাদের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দশক ধরে চলমান যুদ্ধের অবসান ছাড়াও দেশটিতে নারী অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে আলোচনায়।

আফগান সরকারের প্রধান বলেছেন, তালেবানরা যুদ্ধবিরতির শর্তে তাদের কারাবন্দি যোদ্ধাদের মুক্ত করতে পারে। আফগান উচ্চ পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘আমাদের সবাইকে মানবিক হতে হবে। প্রাণহানি বন্ধে উভয়পক্ষকেই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’ আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘এ যুদ্ধের বিজয়ী নেই।’

তালেবানের পক্ষ থেকে তাদের নেতা আবদুল গনি বারাদার বলেছেন, সমঝোতার বিষয়টিকে ‘ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া’ সম্ভব হবে। তিনি আফগানিস্তানকে দেখতে চান একটি ‘স্বাধীন, একত্রিত ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার অধীনে; যেখানে সমস্ত জাতি-গোত্রের মানুষ বৈষম্যহীন বাস্তবতায় বসবাস করবে’।

যুক্তরাষ্ট্র উভয়পক্ষকে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য উৎসাহিত করছে। সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে শান্তির সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা আগামী দিন, সপ্তাহ এবং মাসের আলোচনায় নিঃসন্দেহে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবো।’ শান্তি আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছায় সশস্ত্র এ গোষ্ঠী। চুক্তি অনুযায়ী, সেনা প্রত্যাহার ও কারাবন্দি তালেবান সদস্যদের মুক্তি মিললে আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয় তারা। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মার্চ মাসে আফগান শান্তি আলোচনা শুরুর কথা থাকলেও তালেবানের এক বিতর্কিত নেতার মুক্তি নিয়ে মতবিরোধের জেরে তা পিছিয়ে যায়।

পর্দার আড়ালে কয়েক মাস দরকষাকষির পর অবশেষে আফগান সরকারের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসলেন তালেবান নেতারা। এ বৈঠক ফলপ্রসূ হলে তা ঐতিহাসিক ঘটনা হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েক দশকের যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে ফের শান্তির বাতাবরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।