ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লাপাত্তা

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় যাদের ক্রেডিট ইনফরমেশন (সিআইবি) প্রতিবেদন খারাপ তাদের ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানিয়ে ঋণ নিয়ে দিচ্ছে একটি চক্র। নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে আসল এনআইডির সব তথ্য ঠিক রেখে শুধু নাম্বার পরিবর্তন ও নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন করে ভুয়া এনআইডি তৈরি করছে চক্রটি। এনআইডিতে হাতের ছাপও সঠিক দিচ্ছে। এভাবে ঋণ নেওয়াদের তালিকায় রয়েছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীও। আর এজন্য চক্রটি দুই ধাপে বাগিয়ে নিচ্ছে মোট অঙ্কের টাকা। চক্রটি ভুয়া এনআইডি তৈরিতে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং ওই এনআইডি দিয়ে তোলা ঋণের ১০ ভাগ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ওইসব ব্যাংক। এই চক্রের সঙ্গে রয়েছে কিছু সাবেক ও বর্তমান ব্যাংকার এবং থানা নির্বাচন অফিসের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। গত শনিবার রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে এ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের (ডিবি) সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম।

গ্রেপ্তাররা হলেন মো. সুমন পারভেজ (৪০), মো. মজিদ (৪২), সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর (৩২), মো. আনোয়ারুল ইসলাম (২৬) ও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (৪১)। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে দ্বৈত, জাল ও ডুপ্লিকেট ১২টি জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর রাজধানীর সবুজবাগ থানা নির্বাচন অফিসের ও আনোয়ারুল ইসলাম গুলশান থানা নির্বাচন অফিসের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। তাদের গতকালই সাময়িকভাবে অব্যাহতি দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আইডিইএ প্রকল্প।

এ বিষয়ে এনআইডি নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকেই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যারাই এর সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে দুটি তদন্ত কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিবির ভাষ্য, ব্যাংকের ঋণ নিয়ে কেউ ঋণখেলাপি হলে তাদের সিআইবি খারাপ হয় ফলে পুনরায় তারা ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন না। তখন সুমন ও মজিদ ঋণ পাস করে দেবেন বলে প্রথমে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নিতেন। পরে ঋণ পাস হলে, ঋণের টাকার ১০ শতাংশ দিতে হবে বলে চুক্তি করতেন। চুক্তিতে একমত হলে তারা প্রথমে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দিতেন। পরে ঋণ পাস হলে চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণ টাকার ১০ শতাংশ হারে নিয়ে নিতেন। এ জাল পরিচয়পত্র তৈরি করে দিতেন তাদের সহযোগী সিদ্ধার্থ ও আনোয়ারুল। তারা প্রত্যেকটি জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি বাবদ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে নিতেন। দুজনই ই-জোন কোম্পানির মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগকৃত নির্বাচন কমিশনের অধীনে খিলগাঁও ও গুলশান অফিসে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করার কারণে তারা নির্বাচন কমিশন অফিসের সফটওয়্যার ব্যবহার করে সহজেই জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে পারতেন।

ডিএমপির গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ চক্রের হোতা সুমন পারভেজ ও মজিদ। ২০১৭ সাল থেকে তারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫টি ভুয়া এনআইডি তারা তৈরি করেছে বলে স্বীকার করেছেন। অনেক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীও তাদের সহায়তায় ঋণ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘চক্রটি নির্বাচন অফিসের ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের মাধ্যমে ভুয়া এনআইডি তৈরি করছে। ঢাকার অন্তত ১৬টি থানার নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে নেওয়া কিছু ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এই চক্রে রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা তাদের ঋণ দেওয়ার টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে এই চক্রের মাধ্যমে ঋণ দিচ্ছেন।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ চক্রের সহায়তায় ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে অনেকে। ভুয়া এনআইডিতে ঋণ নেওয়ায় ব্যাংকও তাদের খুঁজে পায় না। এ চক্রের মাধ্যমে ঋণ নেওয়াদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা সাবেক ব্যাংকার আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বিভিন্ন সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হন। ফলে তার ক্রেডিট ইনফরমেশন (সিআইবি) প্রতিবেদন খারাপ হওয়ায় আর ঋণের আবেদন করতে পারছিলেন না। সম্প্রতি তিনি এই চক্রের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ফের ঋণ পেতে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করেন। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সিটি ব্যাংকের নিকেতন শাখা থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন। আর এজন্য চক্রটিকে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরির জন্য ১ লাখ টাকা এবং ঋণ পাওয়ার পর দিতে হয় ঋণের শতকরা ১০ ভাগ টাকা। পরে এই চক্রের সঙ্গে মামুন নিজেও জড়িয়ে পড়েন। মামুন তার স্ত্রী রোজিনা রহমানের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ভুয়া এনআইডিও তৈরি করেছেন।

মো. মিল্টন নামে আরেক ব্যক্তি এই একই চক্রের মাধ্যমে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে রাজধানীর নর্থ সাউথ রোডের সাউথবাংলা ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। ইয়াছির নামে আরেক ব্যক্তি সিটি ব্যাংকের প্রগতি সরণির শাখা থেকে ভুয়া এনআইডি দিয়ে নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা ঋণ। সালেহ আহমেদ নামে আরেক ব্যক্তি একইভাবে ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। আবদুল মজিদ এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ নেন ২০ লাখ টাকা। চক্রটি আরও অন্তত ২০ জনকে একইভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ করিয়ে দিয়েছে।