করোনা কেড়ে নিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রবীণ অভিনেতা সাদেক বাচ্চুকে। গতকাল বেলা পৌনে ১১টায় মহাখালীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাকে স্মরণ করেছেন চলচ্চিত্র জগতের সহযাত্রীরা। লিখেছেন আল মাসিদ
দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাই
আলমগীর
আমার পরিচালিত শেষ সিনেমা ‘একটি সিনেমার গল্প’তে বাচ্চু অভিনয় করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দুর্দান্ত অভিনয় করে গেছেন। জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন আমার সিনেমাটি করে। সেরা খলনায়ক হিসেবে তিনি পুরস্কার পান। এটা চলচ্চিত্র জগতের একজন হিসেবে আমার কাছে গর্বের, একই সঙ্গে তৃপ্তির। সত্যি কথা বলতে, তিনি আমাকে পুরস্কার পাওয়ার পর কিছুই বলেননি। অনেক পরে, এই তো কয়েক মাস আগে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনাকে ফোন করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। তা ছাড়া পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টিতে ধাতস্থ হতে আমার বেশ সময় লেগেছে। আপনার সিনেমার মাধ্যমে আমি পুরস্কারটি পেয়েছি, এ জন্য আমার সব কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি।’ আসলে তিনি খুব বিনয়ী মানুষ ছিলেন, যদিও আমরা একসঙ্গে খুব বেশি কাজ করিনি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তাকে বেহেশত নসিব করুন। দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাই।
করোনা আমাদের আর কত কাঁদাবে
গুলশান আরা চম্পা
আমি সত্যি বাকরুদ্ধ! বিশ্বাসই করতে পারছি না বাচ্চু ভাই আমাদের মাঝে নেই। করোনা আমাদের আর কত কাঁদাবে? কত প্রিয়জনকে আর আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে? আমরা যারা বেঁচে আছি তারাও স্বস্তিতে নেই করোনার জন্য। তার ওপর কাছের মানুষদের চলে যাওয়া মেনে নেওয়ার মতো নয়। কতই বা বয়স হয়েছিল তার? কী যে ভালো ব্যবহার করতেন আমার সঙ্গে, তা বলে বোঝাতে পারব না। তার হাসিমাখা মুখখানি আমার চোখের পাতায় ভাসছে। দেখা হলে ম্যাডাম ছাড়া কথা বলতেন না। আমি মাঝে মাঝে বিব্রত হতাম, বলতাম বাচ্চু ভাই, আপনি আমার কত সিনিয়র। কোথায় আমি আপনাকে সম্মান করব, কিন্তু উল্টো আমাকে সম্মান করছেন। অনেক সিনেমায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। খুব ভালো অভিনেতা ছিলেন। অনেক সময় বলতেন, ম্যাডাম এই জায়গাটায় আপনি এভাবে ডায়ালগটা দিলে ভালো হতো। সর্বশেষ করেছি ‘একটি সিনেমার গল্প’। তবে এখানে তার সঙ্গে আমার কোনো দৃশ্য ছিল না। এসএ হক অলিকের ‘আরও ভালোবাসব তোমায়’ সিনেমায় তিনি আমার ভাইয়ের চরিত্র করেছিলেন। এক এক করে প্রিয় মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন। শ্যুটিং সেটে গিয়ে প্রিয়জনদের আর পাব না, এটা ভাবতেই খারাপ লাগছে।
খুব ভালো মানুষ ছিলেন
সোহানুর রহমান সোহান
এই তো সেদিন এফডিসিতে তার সঙ্গে দেখা। আমি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলাম, আমার খোঁজখবর নিলেন। অথচ আজ তিনিই করোনার বলি হলেন! ভাবতেই মাথাটা ঝিম ধরে যাচ্ছে। খুব ভালো মানুষ ছিলেন বাচ্চু সাহেব। শিল্পী হিসেবে কেমন ছিলেন তা সবাই জানেন। একটা কথা অনেকেই জানেন না, এ প্রজন্মের অনেক নায়ক-নায়িকা তার কাছ থেকে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আমার অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। পরস্পরের বাসায় যাতায়াত ছিল নিয়মিত। আমার ‘কথা দাও সাথী হবে’ ও ‘স্বামী ছিনতাই’ ছবি দুটিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করেছিলেন। তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সব তারকার কাছেই তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার মানুষ। কারণ অভিনয় নিয়ে তার জ্ঞান ছিল উল্লেখ করার মতো। খলনায়ক, ইনোসেন্ট, বড়লোক, গরিব সব চরিত্রেই অনায়াসে নিজেকে মেলে ধরতে পারতেন। তাকে বলা যেতে পারে পর্দার খলনায়ক, বাস্তবের নায়ক।
সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো
আলীরাজ
বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় চল্লিশ বছর তো হবেই। আমি ঢাকা থিয়েটার করতাম, তিনি নিজের দল মতিঝিল থিয়েটারে মঞ্চ নাটক করতেন। সেই পরিচয়ের পর টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র সবকটি অধ্যায় একসঙ্গে পার করেছি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আমরা একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছি। তার পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর শুনে মনে হয়েছিল আমিই পুরস্কার পেয়েছি। তার আরও অনেক আগেই এই পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল। যাই হোক, তিনি বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড়, কিন্তু সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, করোনাকালেও একাধিকবার ফোনে কথা হয়েছে। আমি বলতে চাই, পর্দায় খলনায়ক হিসেবে অনেক বিধ্বংসী হলেও বাস্তবে একজন ভালো মানুষ বলতে যা বোঝায় বাচ্চু ভাই ছিলেন তাই। কোনো দিন কাউকে মনে কষ্ট দিয়ে কথা বলতে শুনিনি। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
অভিনয়ের টিপস নিয়েছি
সাইমন সাদিক
আমার দুর্ভাগ্য বাচ্চু আঙ্কেলের সঙ্গে কখনো অভিনয় করতে পারিনি। কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা কম ছিল না। আমার বাবার নাম সাদিক, আর চাচার নাম বাচ্চু। আমি মজা করে বলতাম, আপনি একাই আমার বাবা আর চাচার নাম নিয়েছেন! করোনার আগে আমার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে নাটকের শ্যুটিংয়ে গিয়েই আমাকে ফোন করেছিলেন, আমি কাকতালীয়ভাবে সেখানেই ছিলাম। গভীর রাতে অনেক বন্ধু মিলে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। অভিনয়ের ব্যাপারেও টিপস নিয়েছি। তিনি যেখানে থাকুন আল্লাহ যেন ভালো রাখেন।