আবদুল কাদিরের হাতেই লেগ স্পিনের পুনর্জন্ম হয়েছিল। বিশ্বাস না করলে শেন ওয়ার্নের মন্তব্যটা শুনে নিতে পারেন, ‘১৯৯৪ সালে আমার প্রথম পাকিস্তান সফরে কাদিরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমরা যারা লেগ স্পিন করতাম, তারা কিন্তু কাদিরকেই সামনে রেখে এগিয়েছি।’
অথচ ওয়ার্নের জন্য কাদিরের বোলিং পরিসংখ্যান খুব সাধারণ মনে হয়। ৬৭ টেস্টে ২৩৬ উইকেট। গড় ৩২.৮০। (শেন ওয়ার্নের ১৪৫ টেস্টে ৭০৮ উইকেট)। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান মনে করতেন আজকের যুগ হলে কাদিরও ভূরি ভূরি উইকেট পেতেন, ‘কাদির একজন জিনিয়াস। সর্বকালের অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার। পরিসংখ্যান দিয়ে কাদিরের প্রতিভার বিচার করা যায় না। কাদির যদি এখন ক্রিকেট খেলত, যখন ‘ডিআরএস’-এর সুবিধা আছে, যখন ফ্রন্টফুটে লাগলেও আম্পায়াররা এলবিডব্লিউ দেন, তাহলে ওর উইকেট সংখ্যা শেন ওয়ার্নের মতোই হতো।’
কাদির সম্পর্কে পাকিস্তান অধিনায়ক ইমরান শুধু উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না গোটা অস্ট্রেলিয়া টিমও মনে করত লেগ স্পিনার হয়েও পেসারদের মতো আক্রমণাত্মক ছিলেন তিনি। তিরাশির বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যার প্রমাণ মিলেছিল। ওভালে খেলছিল পাকিস্তান ও উইন্ডিজ। প্রথমে ব্যাটিং করে ইমরানের দল ১৮৪ রান করে। সামান্য এই পুঁজিতে লড়াই দীর্ঘায়িত করতে রক্ষণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়েছিলেন ইমরান। কাদির সেটা বদলে সিলি মিড অফ মিড অনসহ একটা সিøপ ও গালি চেয়ে নেন। এবং ডেসমন্স হেইন্সকে বোল্ড করেন। এরপর ভিভ রিচার্ডসকে নামতে দেখে ক্লোজ ফিল্ডিং ছড়িয়ে দিতে থাকেন ইমরান। অধিনায়কের কাছে ছুটে গিয়ে কাদির বললেন, ‘কী করছো এটা?’ ইমরান বলেন, ‘তুমি কি ভিভকেও আক্রমণাত্মক ফিল্ডিংয়ে বল করতে চাও নাকি?’ কাদির বলেন, ‘সমস্যা কোথায়।’ ভিভ রিচার্ডসও ক্লোজ পজিশনে অত ফিল্ডার দেখে অবাক হয়ে কাদিরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তিনজন ক্লোজ ফিল্ডার নিয়ে আমাকে বোলিং করবে?’ যথারীতি লেগ স্পিন জাদুকরের উত্তর ছিল, ‘এভাবে বোলিং করতে আমার ভালো লাগে।’
ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ভিভ রিচার্ডস কিন্তু
পাকিস্তানের বিপক্ষে খুব সফল হতে পারেননি। কাদিরের মায়া ঘূর্ণিই ছিল কারণ। ক্রিকেটে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩৯ ইনিংসে ১০৭৯ রান করেছেন। গড় ৩০.৮২। রিচার্ডসের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১৬ কম। গত বছর প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যুর কথা শুনে রিচার্ডস বলেছিলেন, ‘আমি স্তম্ভিত। তার বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কত ভালো ক্রিকেটার ছিল সে।’
কাদির যখন টেস্টে আড়াইশোর বেশি উইকেট নিয়েছেন তখন ক্রিকেটে ফাস্ট বোলিংয়ের স্বর্ণযুগ চলছে। অস্ট্রেলিয়ায় লিলি-টমসন। উইন্ডিজে চার পেস ব্যাটারি। পাকিস্তানে ইমরান-সরফরাজ। ভারতে কপিল। দুনিয়ার কোথাও ভালো স্পিনার নেই। সবাই যখন লেগ স্পিনের মৃত্যুর আশঙ্কা করছিলেন তখনই কাদিরের অবির্ভাব। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেটে লেগ স্পিন কঠিনতম শিল্প। এখানে মাস্টারি দেখানো মোটেই সহজ কাজ নয়। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আমি তৃপ্ত কারণ ফাস্ট বোলিংয়ের স্বর্ণযুগে দুইশোর ওপর উইকেট নিয়েছিলাম স্পিনে। অন্য স্পিনাররা কেউ সফল হতে পারেনি। রীতিমতো ধ্বংস হয়েছে তারা। আমি কিন্তু সে যুগে সফল ছিলাম।’
তিরাশির অস্ট্রেলিয়া সফরে আবদুল কাদিরকে দেখে খুব প্রশংসা করেছিলেন আরেক লেগ স্পিনার রিচি বেনো। একবার লাহোরে তার সঙ্গে দেখাও হয়। সেই সাক্ষাৎ সম্পর্কে পাক কিংবদন্তি বলেন, ‘ছুটির দিন আমরা দুই-তিন ঘণ্টা কথা বলেছিলাম। কত ধরনের লেগ স্পিন হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমরা দুজনেই অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, এখন (কাদিরের সময়) কত বিচিত্র ধরনের লেগ স্পিন হয়। অথচ বেনোর মতো কিংবদন্তিও হাতেগোনা কয়েক ধরনের প্রথাগত লেগ স্পিনে উইকেট নিয়েছেন।’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গুগলি আর টপ স্পিনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেন কাদির।
লাহোরে ১৯৫৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সবজি ব্যবসায়ী বাবার ঘরে জন্ম কাদিরের। তাই ছেলেবেলায় সবজি বেচতে হয়েছে কাদিরকে। পরে ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা তাকে ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। মাঠে ও মাঠের বাইরে ছিলেন অধিনায়ক ইমরান খানের জানি দোস্ত। গত বছর বন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে ইমরান বলেন, ‘ড্রেসিং রুমের প্রাণ ছিল ও। সব সময় দলকে মাতিয়ে রাখত মজার মজার কথা বলে।’ মাত্র ৬৩ বছর বয়সে মজার কথা বলা সেই কণ্ঠ চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। মৃত্যুর ৯ দিন পরেই ছিল কাদিরের ৬৪তম জন্মদিন।