আমরা অনেক ছোট বিষয়কে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখি। অর্থবিত্তে ছোট, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ছোট, বংশমর্যাদায় ছোট, সামাজিক সম্মানের বিবেচনায় ছোট, শিক্ষা-দীক্ষায় ছোট, বয়সে ছোট এমন যত ‘ছোট’ রয়েছে সবই যেন আমাদের দৃষ্টিতে খানিকটা অবহেলার পাত্র। অনেক সময় বয়সে বড়রা ছোটদের অবহেলা করে। সম্পদশালীরা দরিদ্রদের তাচ্ছিল্য করে। বিদ্যাবুদ্ধিতে যারা অগ্রসর, তারা অনগ্রসরদের ছোট করে দেখে। সন্দেহ নেই, এ তাচ্ছিল্য ও অবহেলার দৃষ্টি অবশ্যই নিন্দনীয়।
আমাদের জীবন চলার পথে পথে, ঘরে-বাইরে নানা জায়গায় ছোট ছোট পুণ্যময় এমন অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যেগুলো নিজ নিজ ক্ষুদ্রতাসহই সফলতার পথে আমাদের পৌঁছে দিতে পারে অনেক দূর। আবার এমন অনেক ছোট ছোট পাপের কাজও রয়েছে, যেগুলো ক্ষুদ্র হলেও আগুনের ফুলকির মতো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে আমাদের ইমান-আমল সবকিছু। দৃশ্যত ক্ষুদ্র এসব পাপ-পুণ্য নিয়েই আমার আজকের আলোচনা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে, সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে, সে তাও দেখবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)
মানুষ ছোট-বড় যে কাজই করুক, তা পাপের হোক আর পুণ্যের, গোপনে হোক কিংবা প্রকাশ্যে, নিজ নিজ আমলনামায় মানুষ কিয়ামতের দিন সবকিছুই দেখতে পাবে। বড় বড় পাপ কিংবা পুণ্যের একটা সাধারণ হিসাব তো মানুষের থাকে। কিন্তু ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর এমন অনেক কিছুই সেদিন আমলনামায় মানুষ দেখতে পাবে- যার প্রকাশ সে কল্পনাও করতে পারেনি। আমলনামার এ ব্যাপকতা দেখে মানুষের চোখমুখ থেকে তখন ঝরতে থাকবে বিস্ময়। বিশেষত যারা অপরাধী, পাপ ও অন্যায় যাদের বেশি, নিজেদের কৃতকর্মের এমন ধারণাতীত সংরক্ষণ দেখে তাদের মুখে উচ্চারিত হবে হতাশার সুর। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘...এবং আমলনামা উপস্থিত করা হবে। এতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদের দেখবে আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবে- ‘হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কোনোকিছুই বাদ দেয় না, বরং তা সবকিছুরই হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ (সুরা কাহফ, আয়াত : ৪৯
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নেক আমলের ইচ্ছা করল, কিন্তু এখনো তা আমলে পরিণত করেনি; (এ ইচ্ছার কারণে) তার আমলনামায় একটি নেকি লেখা হবে। আর যে ব্যক্তি এ ইচ্ছাকে আমলে পরিণত করল, তার আমলনামায় ১০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত নেকি লেখা হবে। আর যদি কোনো গুনাহের ইচ্ছা করে; কিন্তু গুনাহটি না করে তার আমলনামায় কিছুই লেখা হবে না। যদি গুনাহটি করে বসে, তাহলে কেবল তাই (অর্থাৎ একটি গুনাহ) লেখা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩০)
অনেক ক্ষুদ্র বিষয় আমাদের জীবন সাজিয়ে রেখেছে। আমাদের মুগ্ধ ও আনন্দিত করে রেখেছে। হাঁড়িভর্তি খাবারের স্বাদ স্বাভাবিক রাখার জন্যে লবণ দিতে হয় খুব সামান্যই। সামান্য এ লবণটুকুর অভাবে দামি খাবারের স্বাদ বিস্বাদে পরিণত হতে পারে। আবার প্রয়োজনীয় বলে যদি একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে সে খাবার চেখে দেখার সাধ্য হবে না কারও। একইভাবে নিভু নিভু দুর্বল একটু আগুন থেকেও অসতর্কতাবশত সৃষ্টি হতে পারে বড় অগ্নিকা-, জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে পারে ঘর-বাড়ি। সামান্য একটু অসতর্কতায় হারিয়ে যেতে পারে কোটি টাকার সম্পদ। চোখের সামনে নাই হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর ধরে চালানো অবিরাম সাধনার ফল। ছোট বলে তাই কোনোকিছুকেই তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘ভালো কোনো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না। কাউকে এক টুকরো রশি দিয়ে সহযোগিতা করে হোক, কাউকে একটি জুতার ফিতা দিয়ে হোক, তোমার পানির পাত্র থেকে পানিপ্রত্যাশী কারও পাত্রে সামান্য পানি ঢেলে দিয়ে হোক, মানুষের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক কোনো কিছু সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে হোক, হাসিমুখে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে হোক, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সালাম দিয়ে হোক, পৃথিবীতে কোথাও কারও একাকিত্ব দূর করে দিয়ে হোক কোনো কিছুকেই তুমি তুচ্ছ মনে করবে না। তোমার কোনো অন্যায়ের কথা জেনে কেউ যদি তোমাকে গালি দেয় আর তুমি জানো তার মধ্যেও এ দোষটি রয়েছে, তখন তুমি তাকে গালি দেবে না; এতে তার প্রতিদান তুমি পেয়ে যাবে, আর তার গুনাহ তার কাঁধেই থাকবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৫৯৫৫)
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুচ্ছ মনে করা হয় এমন সব পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থেকো। তুচ্ছ এসব পাপের দৃষ্টান্ত তো এমন যেমন কিছু মানুষ একটি উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করল। তখন তাদের একজন একটি লাকড়ি নিয়ে এলো। আরেকজন আরেকটি লাকড়ি নিয়ে এলো। এভাবে তাদের এ পরিমাণ লাকড়ি সংগ্রহ হয়ে গেল, যা (যেটির আগুন) দিয়ে তারা তাদের রুটি সেকে নিতে পারে। সন্দেহ নেই, এ তুচ্ছ পাপগুলোতে যখন কেউ লিপ্ত হয়, সেগুলো তখন তাকে ধ্বংস করে দেয়। (তাবারানি, হাদিস : ৫৮৭২; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ১৭৪৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৮০৮)
ছোট ছোট পুণ্য আর তুচ্ছ পাপ নিয়ে এই হলো হাদিসের নির্দেশনা। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য আমরা উল্লেখ করেছি মানুষের আমলনামায় ছোট-বড় সব আমলই সংরক্ষিত থাকবে এবং কিয়ামতের দিন সব আমলেরই হিসাব হবে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েরও হিসাব হবে। হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার মাত্রা যে কতটা বেশি হবে, তা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। কোরআন ও হাদিস শরিফে এর কিছুটা বর্ণনা রয়েছে। যেমন, সুরা আবাসায় বলা হয়েছে এভাবে, ‘যখন কিয়ামত উপস্থিত হবে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানাদি থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।’ (আয়াত ৩৩-৩৭)
এমন পরিস্থিতিতে সামান্য কয়টি নেকির জন্যেও মানুষ আক্ষেপ করবে। হাদিসে তো এমন কথাও বর্ণিত হয়েছে দুনিয়াতে মুসলমান বান্দাদের যেসব দোয়া কবুল করা হয় না, কিয়ামতের দিন তাকে সেসব দোয়ার প্রতিদান দেওয়া হবে। তখন সে আক্ষেপ করে বলবে, হায়! দুনিয়াতে যদি আমার কোনো দোয়াই কবুল করা না হতো! এই হচ্ছে দুনিয়া আর আখেরাতের পার্থক্য।
দুনিয়ার ভালোমন্দ কাজের ফল আমাদের ভোগ করতে হবে আখেরাতে। কাজ ভালো হোক আর মন্দ ভালো কাজ করা আর মন্দ থেকে বাঁচা বা মন্দ থেকে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করা; তা করে যেতে হবে এ দুনিয়াতেই। আখেরাতে নতুন করে আমল করার কোনো সুযোগ থাকবে না। দুনিয়ার অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিও কোনো কাজে আসবে না। কাজে দেবে কেবল আমল। কারও কোনো দেনা শোধ করতে হলেও তা আমলের বিনিময়েই করতে হবে। পরকালীন এ বাস্তবতাকে সামনে রাখলেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলকে তাচ্ছিল্য না করার বিষয়টি বোঝা যায়।
প্রসঙ্গত, নিয়মিত কোনো আমল যদি ছোটও হয়, ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন করার ফলে এ ছোট আমলটির প্রতিদানও হয়ে যায় পাহাড়সম। আর ছোট আমল হলেও তা নিয়মিত করা আল্লাহ পছন্দ করেন।
এ ছাড়াও হাদিসে এমন অনেক আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো বাহ্যত খুবই ছোট, একেবারে মামুলি বলা চলে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মামুলি এ আমলগুলোর জন্যেই ঘোষিত হয়েছে অগণিত পুরস্কার। ছোট সে আমলগুলো যদি নিয়মিত করা যায়, তবে তো ওপরের গাণিতিক হিসাবও এখানে যথেষ্ট নয়। লক্ষ করুন, ফজরের নামাজের পর নিজ জায়গায় বসে যদি কেউ ইবাদত-বন্দেগি করতে থাকে, এরপর সূর্য ওঠার পর দুই রাকাত ইশরাকের নামাজ আদায় করে, তবে সে একটি হজ ও একটি ওমরাহ আদায় করার সওয়াব পাবে।
দুই রাকাত নফল নামাজ, ওয়াজিব কিংবা ফরজ নয়, সুন্নতে মুআক্কাদাও নয়, এমন দুই রাকাত নামাজের বদলায় পাওয়া যাচ্ছে একটি নফল হজ ও একটি নফল ওমরাহর সওয়াব। বছরের পর বছর ধরে যে নিয়মিত ইশরাকের নামাজ আদায় করে যাচ্ছে, তার পুরস্কারের হিসাব কি নামাজে তিলাওয়াতকৃত সুরাগুলোর অক্ষরসংখ্যা, নামাজের প্রতিটি দোয়া ও জিকিরের অক্ষরসংখ্যা ইত্যাদি অনুসারে এখানে করা যাবে? না। তার জন্যে ঘোষিত হয়েছে, আরও অনেক অনেক বড় পুরস্কার। গণিতিক হিসাব তাই এখানে অচল। এভাবেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলগুলো আমাদের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের পরকালকে আলোকিত করে তুলতে পারে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির অসিলা হতে পারে।