মসজিদ কমিটি ও দুজন গ্রাহকের ওপরে দায় চাপিয়ে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তিতাসের কমিটি। এ সময় জ্বালানি সচিব আনিছুর রহমান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল ফাত্তাহ, তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন এবং তদন্ত কমিটির প্রধান আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সংবাদ সম্মেলনে তিতাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই বিস্ফোরণে তিতাসের কোনো দায় নেই।
গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে এশার নামাজ আদায়ের সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩১ জন মারা গেছেন। বিস্ফোরণের পর ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ অবস্থায় ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অন্য দগ্ধদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এক ব্যক্তি কেবল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বিস্ফোরণের পর অভিযোগ ওঠে, তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের লিকেজের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপর তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক আব্দুল ওহাবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার ১৩ দিন পর প্রতিবেদন দিল তিতাস।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘দায় শুধু এককভাবে কাউকে দেওয়া যাচ্ছে না। তিতাসের পাইপলাইনে যেমন সমস্যা ছিল তেমনি গ্রাহকেরও দায় আছে। দুই পক্ষেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তিতাসের প্রতিবেদন আমরা আজ হাতে পেলাম। এখন সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। ডিপিডিসির অবৈধ লাইনের বিষয়ে তদন্ত চলছে এখনো। কেউ দায়ী হলে তিতাসের মতোই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতিমধ্যে তিতাসের ৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে সাসপেন্ড করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিতাসের লিকেজ মেরামতসহ পুরনো পাইপলাইন বদলে নতুন পাইপলাইন করার বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেয়েছি আমরা। এখন দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’
প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্তকারী দলের প্রধান আব্দুল ওহাব বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পরপরই আমাকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি গত ৯ দিন কাজ করেছে। আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার চেষ্টা করেছি। মূলত গ্যাসের লিকেজ কীভাবে হলো তা দেখতে মসজিদের আশপাশের সব মাটি তুলে ফেলে অনুসন্ধান করেছি। এতে আমরা দেখতে পাই মসজিদ নির্মাণের সময় আমাদের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তারা। সেখানে আমরা চার জায়গায় পাইপের র্যাপিং উঠে গিয়ে মরিচা পড়ে লিকেজের তথ্য পাই। আর মসজিদের অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় নানা দিক থেকেই গ্যাস লিকেজ হতে পারে। এর বাইরে বিদ্যুতের দুই লাইন থাকায় একটি লাইনে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আরেকটি লাইন চালু করতে গেলে স্পার্ক হওয়া স্বাভাবিক। এই স্পার্ক থেকে মসজিদের ভেতরে জমে থাকা গ্যাস থেকে আগুন লাগতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই এলাকার মো. শওকত ও বারাক নামে দুজন ১৯৯৬ সালে গ্যাসের দুটি লাইন নেয়। এরপর তারা তিতাসের অনুমতি ছাড়া রাইজার স্থাপন করে। পরে তারা এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় সেই রাইজার মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেয়। পরিত্যক্ত রাইজারটি বন্ধ না করে মাটির নিচে দেওয়ার কারণেও গ্যাসের লিকেজ হতে পারে। সুতরাং গ্যাস লিকেজের জন্য ওই দুই ব্যক্তিও দায়ী।’
দুর্ঘটনার পর মসজিদ কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, গ্যাসলাইনের লিকেজ মেরামতের জন্য তিতাসের স্থানীয় অফিসে জানানো হলে তারা ঘুষ চায়। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন বলেন, ‘আমরা ঘুষের বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করে দেখেছি। অনেকে গণমাধ্যমের সামনে এই অভিযোগ করলেও বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেছি। এমনকি গত ছয় মাসের তিতাসের ফতুল্লা অফিসের অভিযোগ কল রেকর্ড চেক করেছি। এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। তিতাসের আটজন এখন বরখাস্ত আছে। সত্যিই কেউ যদি দোষী হয় তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
যা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে : তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্তপ্রধান জানান, টিনশেড মসজিদটি ১৯৯৬ সালে পাকা ভবনে রূপান্তরিত করা হয়। এর আগে ১৯৮৭ সালে তিতাস গ্যাসের এক ইঞ্চি ব্যাসের নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়, যা থেকে ৩টি আবাসিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে; যার একটি ছিল মসজিদের দক্ষিণে এবং অপর দুটি মসজিদের উত্তর দিকে। মসজিদের উত্তর পাশের রাস্তায় সংযোগ দুটির সার্ভিস লাইন প্রায় চার ফুট মাটির নিচে ছিল। মসজিদের পূর্ব পাশে তিতাস গ্যাসের এক ইঞ্চি ব্যাসের একটি বিতরণ লাইন রয়েছে। তাছাড়া মসজিদের উত্তর পাশের রাস্তায় দুটি ৩ বাই ৪ ইঞ্চি ব্যাসের পরিত্যক্ত সার্ভিস লাইন রয়েছে। সেই সার্ভিস লাইনের নিচ দিয়ে মসজিদের উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর দিকের ৪নং কলামের বেইজ নির্মাণ করা হয়েছে। বেইজ নির্মাণ করার সময় মাটি খনন, সাটারিং স্থাপন কাজে কোদাল, গাঁইতি, হাতুড়ি ব্যবহার হয়েছে। তাতে ‘মেকানিক্যাল ড্যামেজ বাই এক্সটারনাল থ্রাস্ট’-এর জন্য পাইপের উপরিভাগ দেবে গেছে এবং গ্যাসলাইনের রেপিং নষ্ট হয়েছে, ফলে গ্যাস পাইপ (এমএস পাইপ) মাটির সংস্পর্শে আসে এবং মরিচাজনিত কারণে পাইপে লিকেজ সৃষ্টি হয়েছে। মসজিদ কমিটি মসজিদের কলামের বেইজ তৈরি করার সময় তিতাস গ্যাসকে অবহিত করলে ওই সার্ভিস লাইন অপসারণ করতে বা ক্ষতিগ্রস্ত রেপিং মেরামত করে দিত। তাহলে লিকেজ সৃষ্টি হতো না।
তিনি আরও জানান, মসজিদের উত্তর দিকের পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ৪ ফুট পুরুত্ববিশিষ্ট আরসিসি ঢালাই করা রাস্তা। গ্যাস লাইন লিকেজ হওয়ার পর লিকেজ গ্যাস সরাসরি আরসিসি ঢালাইবিশিষ্ট রাস্তা ভেদ করে ওপরে আসতে পারেনি কিন্তু পাইপলাইনের পাশেই (মাত্র ১৬ ফুট দক্ষিণে) মসজিদের দেয়াল। কিন্তু সেই দেয়ালের নির্মাণ মান খুবই খারাপ ছিল বা দেয়ালে আস্তরণ ছিল না। তাছাড়া পাকা বাড়ি বা মসজিদ নির্মাণের সময় মানসম্মত ফ্লোর নির্মাণ করার বিধান রয়েছে, যা এখানে করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে ফ্লোর টাইলসের সংযোগস্থল থেকে গ্যাস বের হতে পারে। আবার মসজিদের নিচের মাটির কম্পাকশন ঠিক ছিল না। মসজিদের নিচের মাটি যথাযথ না থাকায় গ্যাস সরাসরি ওপরের দিকে বের হতে পারেনি। এ কারণে গ্যাস মসজিদের ভেতরে চলে যেতে পারে এবং ফ্লোরের বিভিন্ন স্থানে টাইলসের সংযোগস্থল থেকে বের হতে পারে। আবার লিকেজস্থল থেকে প্রায় ৪০-৫০ ফুট দূরে মসজিদে প্রবেশপথ (কলাপসিবল গেট) পর্যন্ত গ্যাস প্রবাহিত হতে পারে ও কলাপসিবল গেটের নিচ দিয়ে গ্যাস বের হতে পারে। এসব বিষয়ের কারণে মসজিদ নির্মাণকাজের ত্রুটিগুলো নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিদ্যুতের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মসজিদে দুটি বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। যার মধ্যে একটি সংযোগ ছিল বৈধ এবং অপর সংযোগটি মিটারবিহীন এবং অবৈধ। উক্ত বৈধ ও অবৈধ সংযোগ দুটির মধ্যে একটি চেঞ্জ ওভার ছিল। একটি ফিডারের বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্য ফিডার থেকে তারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করত। অপরদিকে বৈধ সংযোগটি তিন ফেইজবিশিষ্ট কিন্তু অবৈধ সংযোগটি সিঙ্গেল ফেইজবিশিষ্ট ছিল। মসজিদ কমিটির সভাপতি আ. গফুর বিষয়টি স্বীকার করে বিভিন্ন মিডিয়াসহ তদন্ত কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য, চেঞ্জ ওভার সুইচ ব্যবহার করে বিদ্যুতের ফিডার পরিবর্তন করার সময় কম-বেশি স্পার্ক হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা ৪০ মিনিটে বিদ্যুতের লোডশেডিং হওয়ায় মসজিদের মুয়াজ্জিন চেঞ্জ ওভার দিয়ে বিদ্যুতের ফিডার পরিবর্তন করার সময় স্পার্কের সৃষ্টি থেকে মসজিদে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে বিস্ফোরণ বা অগ্নিদুর্ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে।
তদন্ত কমিটির মতামত ও সুপারিশে দায়ী করা হয় ওই এলাকার দুজন গ্রাহককে। বলা হয়, মসজিদের উত্তর পাশের পূর্ব-পশ্চিম সড়কে তিন ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ লাইন নির্মাণের পর আগে স্থাপিত এক ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ লাইন হতে আবাসিক সংযোগ নেয় মো. শওকত আলী এবং মো. বারেক দেওয়ান। তারা তিন ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ লাইনে তিতাস গ্যাসের রাইজার স্থানান্তরবিষয়ক নিয়ম-কানুন না মেনে, তিতাস গ্যাস নারায়ণগঞ্জ অফিসকে না জানিয়ে, নিজেদের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে অনভিজ্ঞ কোনো ওয়েন্ডার দিয়ে রাইজার দুটি স্থানান্তর করেছে এবং রাইজার দুটির দৃশ্যমান অংশ কেটে ফেলে। তিতাসের লোক স্থানান্তর করলে সার্ভিস লাইন ও সার্ভিস লাইনের সংযোগস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতো। এতে এই দুর্ঘটনার সৃষ্টি হতো না। অর্থাৎ এই দুই গ্রাহক নিয়মবহির্ভূতভাবে রাইজার স্থানান্তর করায় এই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এবং সে জন্য তারা দায়ী।
এদিকে মসজিদে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে পুরো দোষ চাপানো হয়েছে মসজিদ কমিটির ওপর। বলা হয়, গ্যাস নিজে নিজে জ্বলতে পারে না। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য মসজিদ কমিটি দায়ী। মসজিদ কমিটি দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই মসজিদে গ্যাসের গন্ধ পাচ্ছিল। তারপরও মসজিদ কমিটি এসি অংশের দরজা জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে নামাজ আদায় করেছে কিন্তু নিরাপত্তার জন্য মুসল্লিদের সতর্ক করা হয়নি। মসজিদ কমিটির অজ্ঞতা-অসচেতনতার জন্য এবং মসজিদে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য এই দুর্ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। তাই এর দায়ভার তাদের ওপর বর্তায়।
কমিটি আরও জানায়, মসজিদটি নির্মাণ ও তৃতীয় তলাবিশিষ্ট মসজিদ ভবন নির্মাণ করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা মসজিদ কমিটির তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছে।
এর বাইরে তদন্ত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ তিতাসের অধীনে থাকা গ্যাস পাইপ নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন শ্রেণির সংযোগ ইত্যাদি পরিদর্শন করে লিকেজ শনাক্ত করা এবং লিকেজ স্থান অবিলম্বে মেরামতের ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া ওই অফিসকে তাদের নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কে স্বল্প সময় পরপর পরীক্ষা বা পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিকের জোগান দিতে কর্র্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।