সন্তানদের অতি নিরাপদ (ওভার প্রোটেক্টেড) রাখলে শিশুর মধ্যে নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। এই শিশুরা বাস্তবের তুলনায় নিজেকে একটু বেশি শক্ত মনে করে অথবা তাদের ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে। ফলে শিশুরা নানা ধরনের সমস্যায় পড়ে। ওভার প্রোটেক্টেড শিশুরা কোনো দুঃখ, ব্যথা বা কষ্টকে মোকাবিলা করে বড় হতে শেখে না। তারা একটি নিরাপত্তাবলয়ের মধ্য দিয়ে বড় হয়। তারা বুঝতে পারে না কষ্ট কী জিনিস। সঙ্গে এটাও বুঝতে পারে না এটা কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়। ওভার প্রোটেকশন হয়তো শিশুর আত্মবিশ্বাসকে সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয় কিন্তু তার আবেগীয় সমস্যার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। অনেক বাবা-মা ওভার প্রোটেক্টশনের এই ক্ষতিকর দিকটিই বোঝেন না আবার যারা বোঝেন তারাও সন্তানের কষ্ট বা কান্না সহ্য হয় না বলে ওভার প্রোটেকশন দিতেই থাকেন। আসুন দেখে নিই কী কী কারণে বাবা-মায়েরা সন্তানকে ওভার প্রোটেকশন দিই। লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজির আহম্মেদ তুষার
‘মনটা ছোট হয়ে যাবে’
প্রায়ই বাবা-মায়েরা শিশুকে তার বয়স উপযোগী কাজ করতে না দিয়ে নিজেই করে ফেলেন। মনে করেন তাদের সন্তান করতে গিয়ে যদি ব্যর্থ হয়, তবে তার মনটা ছোট হয়ে যাবে, কষ্ট পাবে, নিজেকে ব্যর্থ মনে করবে বা তার আত্মমর্যাদা কমে যাবে। প্রকৃতপক্ষে জীবনে কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলে মানুষ বড় বড় প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার সাহস ও শক্তি পায়। এই বাবা-মায়েরা বলেন, ‘আমি করে দিলে তো কোনো ক্ষতি নেই; যত দিন পারি করে দেব।’ তৎক্ষণাৎ ক্ষতি হয়তো চোখে পড়ছে না কিন্তু শিশুর অবস্থা হয় শিকড় ও কাণ্ড নরম গাছের মতো। তাই শিশুকে দুর্বল ও ভঙ্গুর গাছের মতো তৈরি না করে ঝড়ঝাপটা মোকাবিলা করতে সক্ষম এমন মানুষ হিসেবে তৈরি করুন। শিশুকে তার বয়স অনুযায়ী কাজ করতে দিন।
আত্মবিশ্বাসের অভাব
অনেক বাবা-মা নিজের আত্মবিশ্বাসের অভাবে শিশুকে সব প্রতিকূলতার বাইরে রাখেন। নবম শ্রেণির ছাত্র তবুও বাবা-মা তাকে একই মহল্লার স্কুলে রেখে আসেন এই ভেবে যে, সে স্কুলে যেতে গিয়ে বিপদে পড়বে। রাস্তায় সাইকেল চালানোর তো চিন্তাই করতে পারেন না পদে পদে কত বিপদ! এসবই বাবা-মায়েরা করেন কারণ তারা সন্তানকে বাইরে বা তাদের চোখের আড়ালে পাঠাতে ভরসা পান না। তাদের চোখে সন্তান তখন অনেক ছোট থাকে। এমনটা না করে বয়স উপযোগী কাজগুলো করতে দিতে হবে। হ্যাঁ, তারা ছোটখাটো ঝামেলায় পড়তেই পারে, এই ঝামেলা থেকেই তারা শিখবে কীভাবে প্রতিকূল পৃথিবীটাকে জয় করতে হয়।
বাবা-মায়ের কষ্ট
বাস্তবে মানুষকে অনেক প্রতিকূলতা বা বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করতে হয়। শিশু যদি নিিদ্র নিরাপত্তার আবরণে মানুষ হয়, তবে পূর্ণ বয়সে বাস্তবকে মোকাবিলা করতে পারে না। কোনো শিশু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলে তার দুই ধরনের অভিজ্ঞতা হতে পারে। প্রথমটি কষ্ট বা ব্যথা এবং দ্বিতীয়টি হলো ক্ষতি। কষ্ট বা ব্যথা পাওয়ার মাধ্যমে শিশু বাস্তবের প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস পায়। বাস্তবতাকে বুঝতে পারে। কিন্তু বেশি প্রতিকূল বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়লে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। যেসব বাবা-মা প্রতিকূলতার মাত্রাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন, তারা সন্তানকে ওভার প্রোটেক্টশনের মধ্যে রাখেন। অর্থাৎ অল্প ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়কেও তাদের কাছে ভয়ংকর মনে হয়। যেমন ১৪-১৫ বছরের কিশোরকে তার বাবা-মা বাইসাইকেল নিয়ে রাস্তা পার হতে দিতে চান না। কারণ এক দিন রিকশায় খোঁচা লেগে তার পায়ে আঁচড় লেগেছিল। এরপর থেকে তারা ভাবেন রাস্তা পার হতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটবে। এই ক্ষেত্রে অথচ ওই একই রাস্তায় তার বয়সী অনেক কিশোর শুধু রাস্তা পারই হয় না, তারা হরহামেশাই রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছে। একই রকমভাবে ১৭ বছরের কিশোর ১৫-২০ মিনিট পরে এলে যদি বাবা-মা ধরেই নেয় সে হয়তো খারাপ হয়ে যাচ্ছে বা গেছে, তা ঠিক হবে না। তাই বাবা-মায়ের উচিত ঝুঁকির মাত্রাগুলোকে ভালোভাবে পরীক্ষা করা, যাতে সামান্য ব্যথা জীবননাশের মতো বড় ক্ষতির আশঙ্কায় পরিণত না হয়।