অবশেষে সৌদিপ্রবাসীদের বিড়ম্বনার অবসান হতে যাচ্ছে। কয়েক দিনের টানাপড়েনের পর দেশটিতে যাওয়ার দরজা খুলছে। সৌদি ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি দিয়েছে দুই দেশ। এছাড়া যাদের আকামার (কর্মভিসা) মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তাদের মেয়াদ বাড়ানোরও ঘোষণা দিয়েছে সৌদি সরকার। এজন্য আগামী রবিবার থেকে সৌদি দূতাবাসের ভিসা অফিস খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওইদিন থেকেই আকামার মেয়াদ বৃদ্ধির কাজ শুরু করবে দেশটির দূতাবাস।
জানা গেছে, পূর্বনির্ধারিত ১ অক্টোবরের পরিবর্তে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিমান বাংলাদেশের বিশেষ ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে। একই সঙ্গে সৌদি এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও চলাচল করবে। আর এরই মধ্যে ২৫২ প্রবাসীকে নিয়ে গত মঙ্গলবার ভোররাতে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ঢাকা ত্যাগ করেছে। তবে সৌদিতে প্রবেশের আগে যাত্রার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার নেগেটিভ সনদ পাঠাতে হবে।
এদিকে টিকিট সংকট সামাল দিতে না পেরে সাউদিয়া এয়ারলাইনস গতকাল বুধবার ঢাকায় তাদের সব ধরনের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল ও প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন দেশে আটকেপড়া সৌদি প্রবাসীরা। তবে আকামার মেয়াদ বৃদ্ধিসহ নতুন সিদ্ধান্তগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সৌদি এয়ারলাইনস ফের তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারে বলে জানা গেছে।
প্রবাসীদের সৌদি ফেরা নিয়ে সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবাসীদের সৌদি যাওয়ার দরজা খুলে দিয়েছে দেশটির সরকার। এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছি। দুই দেশের মধ্যে গত দুদিন ধরে আলোচনা চলছিল। আমাদের রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছেন। আজও (গতকাল) আমরা সবাইকে নিয়ে মিটিং করেছি।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যাদের আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তাদের মেয়াদ বৃদ্ধি করবে সৌদি সরকার। আকামার মেয়াদ আরবি সফর মাসের শেষ দিন পর্যন্ত চলবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। তবে বেশিরভাগ প্রবাসীর আকামার মেয়াদ আছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। আগামী রবিবার থেকে দূতাবাসের ভিসা শাখা কাজ শুরু করবে। দুই দেশের বিমান চলাচল করারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবাসীদের সৌদি আরবে আসার পথ খোলা হয়েছে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। আশা করি প্রবাসীদের মনে আর কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। সৌদিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ব্যাপারে সৌদি সরকার খুবই আন্তরিক। ঢাকায় আটকাপড়া প্রবাসীদের বিষয়টি সৌদি সরকারকে অবহিত করার পরই তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই দেশের নিয়মিত ফ্লাইট চালু ও প্রবাসীদের আকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। তারা বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, করোনার কারণে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর এই প্রথম সৌদি আরবগামী একটি ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে। সৌদি সময় মঙ্গলবার রাত ৩টা ২০ মিনিটে দেশটির বিমানবন্দরে অবতরণ করে ফ্লাইটটি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২৫২ প্রবাসীকে নিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ওই ফ্লাইট। যাত্রা শুরুর আগে ওই ফ্লাইটের যাত্রী আতিকুর রহমান বলেন, ‘ছুটিতে এসে ১০ মাস ধরে আটকে ছিলাম। আমার ভিসার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে যাবে। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। রিটার্ন টিকিট নিয়ে এলেও বাংলাদেশে কিছু করতে পারিনি। পরে সৌদি আরবে থাকা বন্ধুদের মাধ্যমে সেখান থেকে টিকিট রি-ইস্যু করে নিয়েছি। করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট করে এত দ্রুত ফ্লাইট ধরা অনেক কষ্ট হয়েছে। তবুও অবশেষে যেতে পারছি।’
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, সৌদি ও বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট চলাচল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর বিমানের বিশেষ ফ্লাইট চলাচল শুরু করবে সৌদি আরবে। তাছাড়া সৌদি এয়ারও বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করবে। ১ অক্টোবর থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হবে বলে আশা করছি।
জানা যায়, গত কয়েক দিনের টানা বিক্ষোভের মুখে গতকাল সকাল থেকেই তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয় সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থিত সাউদিয়া এয়ারের বাণিজ্যিক অফিসটি। টিকিট সংকট সামাল দিতে না পেরে এবং কার্যালয়ের সামনে আটকেপড়া যাত্রীদের বিক্ষোভের মুখে এ সিদ্ধান্ত নেয় এয়ারলাইনসটি। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রবাসীরা। একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষোভ থেকে ঘোষণা আসে, তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাবি-দাওয়া নিয়ে যাবেন। ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ থেকে মন্ত্রণালয় দুটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। ঘোষণার সময় মাইক হাতে প্রবাসীদের এক প্রতিনিধি বলেন, আমাদের প্রতিনিধি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো সুরাহা আসেনি। আমরা আজ (গতকাল) প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে সবাই রওনা দেব। সেখানে যদি কোনো ফয়সালা না করা হয়, আমরা তাৎক্ষণিক সেখানেই অবস্থান নেব। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করব না।
কয়েকজন সৌদিপ্রবাসী জানিয়েছেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনেকের আকামার মেয়াদ শেষ হবে। দ্রুত সমাধান না হলে তারা ফকির হয়ে যাবেন। বগুড়ার ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি গত বছর ২৯ ডিসেম্বর ছুটিতে দেশে আসি। লকডাউনের কারণে যেতে পারিনি। আমার ভিসার মেয়াদ, আকামা ও কোম্পানির ছুটি শেষ হয়ে গেছে। গত এক মাস ধরে টিকিটের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কেউই টিকিট দিতে পারছে না।’ সাভার থেকে আসা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২৮ জানুয়ারি দেশে ফিরেছি। আমার সৌদির রিটার্ন টিকিট কাটা ছিল। তবে লকডাউনের কারণে যেতে পারিনি। এখন টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত টাকা চাচ্ছে এজেন্সিগুলো। এগুলো সমাধানের জন্যই আন্দোলনে নেমেছি।’
তবে পরে গতকাল রাতে তিনি টেলিফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সৌদি সরকারের আন্তরিকতার কারণে সৌদি যাওয়ার পথ খুলল। এজন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা জেনেছি সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্রদূত অনেক পরিশ্রম করেছেন। আমরা এখন অনেক খুশি।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা প্রবাসীকল্যাণ ভবনের বাইরে অবস্থান করেন। তাদের দাবি ছিল, ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করা। ওই সময় ভবনের ভেতরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলকে পাঠানো হয়। একই দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে বিক্ষোভ করেন প্রবাসীরা। প্রবাসীদের বিষয় নিয়ে গতকাল প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অনেকের সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ভিসা ও আকামা রয়েছে। কিন্তু যেতে পারছেন না। প্রবাসীদের দাবি ছিল তারা যদি এখন না যেতে পারেন তবে তাদের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে। আমরা সৌদি সরকারের কাছে মঙ্গলবার অনুরোধ করেছি, তিন মাস তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এবং যাতে এ সুবিধা বিনা খরচে পায়। সৌদি এয়ারলাইনস যতগুলো অনুমতি চেয়েছে সব অনুমতি দিয়েছি যাতে করে সহজে যেতে পারে। এছাড়া বিমান তৈরি আছে। ফ্লাইট চলাচল শুরুর অনুমতি দিয়েছে সৌদি সরকার। ওই বৈঠকে তিনি প্রবাসীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সৌদি সরকার আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে অত্যন্ত কড়া। যদি আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কাজ বা জটলা দেখানো হয় তবে এটি তারা বরদাশত করে না। তারা এখানকার বিষয়গুলো অবলোকন করছে। টেলিভিশন মিডিয়াতে যা দেখানো হচ্ছে সেটি স্টাডি করছে। আমাদের ভয় হলো, তারা যদি দেখে আন্দোলনকারীরা জটলা করছে, তবে হয়তো তাদের ভিসা বাতিল করে দেবে কিংবা কাজ বাতিল করে দেবে। এ বিষয়ে তারা খুব শক্ত। তারা যদি বাতিল করে তবে আমাদের কিছু করার নেই। প্রবাসীরাই তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগেও এ ধরনের ঘটনা হয়েছে। সাত বছর পর সৌদি আরব আবার লোক নেওয়া শুরু করেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ অবস্থায় আমাদের প্রতি তারা বিরূপ ধারণা পেলে প্রবাসীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল থেকে ফ্লাইট শুরু করেছে সাউদিয়া এয়ারলাইনস। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি ফ্লাইট রয়েছে এয়ারলাইনসটির। স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতি ফ্লাইটে সর্বোচ্চ ২৬০ জন যাত্রী নিতে পারবে তারা। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে। আটকেপড়া সৌদি প্রবাসীদের জেদ্দা ও রিয়াদ পাঠানোর জন্য বিমান চারটি স্পেশাল ফ্লাইট পরিচালনা করবে। ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ফ্লাইটগুলো চলবে। ওইসব ফ্লাইটে যেতে পারবেন যারা, করোনা তা-বের কারণে গত ১৬ ও ১৭ মার্চ ঢাকা থেকে সৌদি আরবে যেতে পারেননি। জেদ্দা ও রিয়াদের বিমানের রিটার্ন টিকিটধারী যাত্রীরা বিমানে বহন করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, টিকিটধারী যাত্রীদের ফ্লাইটে বুকিংয়ের বিমান সেলস অফিসে টিকিট, পাসপোর্ট, সৌদি আরব নির্ধারিত অ্যাপস, লিংক থেকে অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আজ (বৃহস্পতিবার) যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। নতুন ফ্লাইট অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে অন্য যাত্রীদের বুকিংয়ের জন্য অবহিত করা হবে। অন্য যাত্রীদের অযথা কাউন্টারে ভিড় না করতে অনুরোধ করছি। কভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক এবং নমুনা সংগ্রহের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সৌদি আরব পৌঁছতে হবে বিধায় সব যাত্রীকে ঢাকা থেকে কভিড পরীক্ষা করতে হবে এবং ঢাকা থেকেই যাত্রা করতে হবে। এছাড়া ১ অক্টোবর থেকে সৌদি আরবের তিনটি শহরে বিমানের সপ্তাহে আটটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হবে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ আশ^স্ত করেছে।
সাউদিয়া এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা বলেন, সাউদিয়া ও বিমান নিয়মিত প্রতিদিন ফ্লাইট চালালে আটকেপড়া প্রবাসীরা সহজেই সৌদি আরবে যেতে পারবেন। আটকেপড়া ২০ হাজার প্রবাসী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি যেতে চাইলে কমপক্ষে ৭০টি ফ্লাইটের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছি। তবে ফ্লাইট বাড়ানোর অনুমতি মিলেছে। গতকাল সৌদি এয়ারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি সমাধান হওয়ায় আগামীকাল (আজ) থেকে কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সৌদি আরব প্রবাসীদের ফেরার বিষয়ে নেওয়া নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো সম্পর্কে তার ফেইসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে তা নিশ্চিত করেছেন।