যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের কথিত ডিজেল চুরির এক ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও চাকরি ফিরে পাচ্ছেন না তিন কর্মকর্তা। বছরের পর বছর ‘সাময়িক বরখাস্তের খড়গ’ ঝুলিয়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তাদের। অথচ বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন খোদ অফিস কর্র্তৃক অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ভুক্তভোগী তিন কর্মকর্তাকে প্রতিপক্ষ ফাঁসিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন যমুনা অয়েল কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রধান স্থাপনা চট্টগ্রাম টার্মিনাল অফিসের বাল্ক শাখা থেকে কোম্পানির চুক্তিবদ্ধ এমটি রায়দা জাহাজে ডিজেল বোঝাই করা হয়। এরপর ওই জাহাজ খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে খুলনার দৌলতপুরে অবস্থানকালে ওই জাহাজের ডিজেল কালোবাজারে বিক্রি হয়েছে জানিয়ে একই বছরের ৭ নভেম্বর খুলনার দিঘলিয়া থানায় একটি মামলা করে র্যাব-৬। মামলার এজাহারে ‘এমটি রায়দা’ জাহাজ থেকে ৮৫০০ লিটার ডিজেল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ করা হয়। এতে যমুনা ওয়েলের চট্টগ্রাম টার্মিনালে কর্মরত তিন কর্মকর্তা নুরুদ্দিন আহম্মেদ আল মাসুদ, সমীর কুমার পাল ও প্রিয়তোষ নন্দী এবং রায়দা জাহাজের স্টাফ ও খুলনার স্থানীয় কিছু তেল ব্যবসায়ীসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। মামলার পর আসামি তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এমটি রায়দা জাহাজে ডিজেল বোঝাইকালীন সমীর কুমার পাল ও প্রিয়তোষ নন্দী অফিসেই উপস্থিত ছিলেন না। এই জাহাজ বোঝাই কাজের দায়িত্বে ছিলেন অন্য দুই কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক ও মো. গোলাম কিবরিয়া। ডিজেল চুরির অভিযোগ তদন্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওইসব কমিটির জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সাময়িক বরখাস্ত তিন কর্মকর্তা নুরুদ্দিন আহম্মেদ আল মাসুদ, সমীর কুমার পাল ও প্রিয়তোষ নন্দীর বিরুদ্ধে খুলনার ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুলনার আদালতও তাদের নির্দোষ হিসেবে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়। কথিত তেল চুরির ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা হয়েছে দুই বছর আগে। কিন্তু এরপরও ওই তিন কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়টি এখনো ঝুলিয়ে রেখেছে কর্র্তৃপক্ষ। এছাড়া খুলনার কথিত ওই চুরির ঘটনায় তেলের মজুদ ঘাটতি বা আর্থিক ক্ষতি হয়নি বলে কোম্পানির হিসাব শাখাও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। তারপরও রহস্যজনক কারণে বছরের পর বছর ধরে ওই কর্মকর্তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল না করে বসিয়ে বসিয়ে বেতনভাতা দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ওই তিন কর্মকর্তার বেতনভাতা হিসাবে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে যমুনা অয়েল কোম্পানির। বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেওয়ায় একদিকে যেমন কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক ও মানসিকভাবে হয়রানির মধ্যে থাকছেন ভুক্তভোগী তিন কর্মকর্তা।
সম্প্রতি যমুনা ওয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সমীর কুমার পাল চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন জানিয়ে একটি লিখিত দরখাস্ত জমা দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, মামলার পর তৎকালীন কর্র্তৃপক্ষ তাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়নি। এছাড়া সম্পূর্ণ একতরফাভাবে তার বক্তব্য না শুনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
আবেদনে সমীর কুমার পাল আরও বলেন, এমটি রায়দা জাহাজ থেকে তেল বিক্রি সংক্রান্ত মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে। কারণ ওই জাহাজে তেল বোঝাইকালে (রাত ১০টা থেকে সকাল সাড়ে ৬টা) তিনি অফিসে উপস্থিতই ছিলেন না। ওই জাহাজে তেল বোঝাই কাজে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট অফিস রেকর্ড রয়েছে। অফিস রেকর্ডের তথ্যানুযায়ী, জাহাজে তেল বোঝাইকালে দায়িত্বে ছিলেন গোলাম কিবরিয়া ও আবদুর রাজ্জাক। তেলের চালানপত্র তারাই তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তাদের কিছুই হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. শামছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসির কাছে এ ধরনের কোনো অনিষ্পত্তিকর বিষয় উপস্থাপন করা হয়নি। এটি যমুনা অয়েল কোম্পানির নিজস্ব বিষয়, তারাই ভালো বলতে পারবে।’ যমুনা অয়েল কোম্পানির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মাসুদ করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’ যদিও তার এমন বক্তব্যে ভিন্নমত পোষণ করেছেন কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা।
তারা জানান, ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দুর্নীতি বা অপরাধ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রমাণিত হলে শুধু বরখাস্ত করে না রেখে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে।
সচিবের এমন নির্দেশনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিজিএম মাসুদ করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। এমন কোনো নির্দেশনার কথা মনে পড়ছে না।’
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিজিএম মাসুদ করিম ২০১২ সালে দুদকের করা বিটুমিন সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় প্রায় দেড় মাস জেল খাটেন। এছাড়া কোম্পানির এফডিআর কেলেঙ্কারি, বদলি বাণিজ্য ও তেল চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে তার নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, মামলার এজাহারে আবদুর রাজ্জাক ও গোলাম কিবরিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত না করে কৌশলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অন্য তিন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। যারা তেল বোঝাই কার্যক্রমে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। শুধু তাই নয়, খুলনার দিঘলিয়া থানায় যেদিন (৭ নভেম্বর) মামলা হয় তার পরদিন চট্টগ্রাম অফিস থেকে তাদের তড়িঘড়ি করে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি ইস্যু করা হয়। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিস কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যদিও কথিত তেল চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা না থাকায় ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে মামলা থেকে অব্যাহতি পান সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই তিন কর্মকর্তা।
যমুনা অয়েল কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জাহাজে তেল বোঝাইকালে যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্র্তৃপক্ষ। অফিস কর্র্তৃক অভিযুক্ত হলেও এখনো চাকরি করে যাচ্ছেন তারা। এটি কর্র্তৃপক্ষের দ্বৈতনীতি, অবিচার ও অনিয়মের বহিঃপ্রকাশ।