স্কুলছাত্রী নীলা হত্যা

বাবা-মাসহ প্রধান আসামি মিজান গ্রেপ্তার

সাভারে দশম শ্রেণির ছাত্রী নীলা রায় (১৪) হত্যা মামলায় বাবা-মায়ের এক দিনের মাথায় প্রধান আসামি মিজানুর রহমান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাত ৮টার দিকে সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কিশোর গ্যাং লিডার সাকিব ও জয়কেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে মানিকগঞ্জের চারিগ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানের বাবা আবদুর রহমান (৬০) ও মা নাজমুন্নাহার সিদ্দিকাকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা মামলার দুই ও তিন নম্বর আসামি। পরে গতকাল  দুপুরে তাদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ভাইয়ের সামনে থেকে স্থানীয় অ্যাসেড স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী নীলা রায়কে তুলে নিয়ে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করে বখাটে মিজান।

এদিকে মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নীলার বাবা নারায়ণ রায়। এ সময় তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। অন্যদিকে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে গতকাল সকালে সাভারে পৃথক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম বলেন, মামলার প্রধান আসামি মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছুরি, তাদের দলনেতা সাকিব ও সহযোগী জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলার এজাহার নামীয় সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলো।

এ র‌্যাব-৪-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জমিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে মানিকগঞ্জ জেলার চারিগ্রাম থেকে মিজানের মা-বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটকের পর গতকাল সকালে সাভার মডেল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু মিজান নয়, সাভারের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় রয়েছে কিশোর গ্যাং সদস্যদের দৌরাত্ম্য। তার মধ্যে অন্তত ১০টি কিশোর গ্যাংয়ের শতাধিক সদস্য বর্তমানে সাভারের মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্কুল-কলেজ, শপিং মল, রেস্টুরেন্টসহ পাড়ার মোড়ে আড্ডা জমানো এ কিশোরদের সংগ্রহে রয়েছে মাদক ও অস্ত্র। তাদের বিষয়ে মুখ খুললেই নেমে আসে হামলা ও নির্যাতন। এদের দলনেতাগুলো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়ায় নানা অপকর্মের পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যায়নি স্থানীয় প্রশাসন। যে কারণেই স্কুলছাত্রী নীলাকে হত্যার পরও অভিযুক্তদের কেউ আটক হয়নি। ইতিমধ্যে কেউ কেউ কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিষয়ে মুখ খোলায় বেশ কয়েকজনকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গণমাধ্যমকর্মী কিংবা প্রশাসনকে তথ্য দিলে তাদেরও নীলার মতো পরিণতি হবে।

সাভার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূরে আলম সিদ্দিকী নিউটন বলেন, ‘কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের ব্যাপারে পুলিশকে নিয়মিত তথ্য দিয়েও সহযোগিতা তো পাইনি, উল্টো আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এরপর সন্ত্রাসীরা আমার অফিস ভাঙচুর করেছে। এছাড়া সন্ত্রাসী ও বখাটেদের সঙ্গে পুলিশেরও সখ্য রয়েছে, যে কারণে তাদের ব্যাপারে তথ্য দেওয়ার পর তা ফাঁস হওয়ায় বিপদে পড়েছেন তথ্যদাতারা। সাভার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ ও সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এবং আশপাশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিয়মিত দাপিয়ে বেড়ালেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

ঘাতক মিজানুরের খুঁটির জোর ছিল সাকিব ও শাকিল নামে দুই সহোদর। তাদের বাবা সিরাজুল ইসলাম শিরু পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং চাচা সাইদুল ইসলাম ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় কিশোর গ্যং সদস্যরা ছিল বেপরোয়া।

বাবার সংবাদ সম্মেলন : নীলা রায়ের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে বাবা নারায়ণ রায় বলেন, ‘আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে আর কোনো বাবার কোল খালি না হয়।’ গতকাল বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি সোনালী দাস ও সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়।