নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট

১০ বছর ধরে আয়কর দেন না ট্রাম্প

বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তবে আসন্ন নির্বাচনের আগে সমস্যাগুলো যেন আরও বেশি জেঁকে ধরেছে তাকে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস ট্রাম্পের আয়কর সংক্রান্ত এক তথ্য প্রকাশ করে নির্বাচনী প্রচারণার গতিই ঘুরিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদন মতে, গত ১৫ বছরের মধ্যে ১০ বছর ধরে ট্রাম্প কোনো আয়কর দিচ্ছেন না। অবশ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এমন দাবিকে অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের যে আয়কর বিবরণী প্রকাশ করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এযাবৎ প্রায় সব প্রেসিডেন্টই স্বচ্ছতার জন্য তাদের আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ট্রাম্প। ক্ষমতায় বসার পর তার আয়কর বিবরণী নিয়ে কম পানি ঘোলা হয়নি। একাধিকবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও কংগ্রেসে পর্যন্ত বিষয়টি উঠেছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই নিজের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উতরে যান ট্রাম্প। তবে নির্বাচনের আগে আর এবার তা হচ্ছে না। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বোমার পর ট্রাম্প আয়কর না দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও, নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণে তাকে আয়কর বিবরণী প্রকাশ করতেই হবে। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনটা হলে আরও ফেঁসে যেতে পারেন ট্রাম্প।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে পরপর দুই বছর তিনি মাত্র ৭৫০ ডলার করে আয়কর দিয়েছেন। ২০১৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার পরের বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালনের সময় এই পরিমাণ কর দিয়েছেন তিনি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি, তাদের কাছে সব নথিপত্র রয়েছে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প কর দেননি। আর ট্রাম্প এই খবরকে ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি আসলে আয়কর দিয়েছি। সেটা নিয়ে অডিট হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে অডিট হয়েই চলেছে।’ সব দোষ কর কর্র্তৃপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘কর কর্র্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে না। তারা আমার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে।’

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে প্রশাসনের কেউ তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বললেই হয় বরখাস্ত নতুবা বাধ্যতামূলক পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে অডিট কর্মকর্তাদের কী এমন শক্তি যে অডিটের নামে ট্রাম্পের আয়কর ফাইল বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখেন তারা। তবে এক্ষেত্রে আলোচনায় আছে তার জামাতা জেরার্ড কুশনার। বলা হচ্ছে, কুশনারের অডিট ফার্মই কায়দা করে ট্রাম্পের ফাইলকে বন্দি করে রেখেছে, যাতে শ্বশুরের আয়কর না দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ না পায়।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টও বলছে, ট্রাম্পের সঙ্গে ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের এক দশক ধরে বিরোধ চলছে। ট্রাম্প তার বিশাল ক্ষতি দেখিয়ে ৭ কোটি ২৯ লাখ ডলারের ট্যাক্স রিফান্ড দাবি করেছেন। বিরোধ সেটা নিয়েই। সংবাদপত্রটির দাবি, ট্রাম্প ও তার কোম্পানিগুলোর গত দুই দশকের আয়কর রিটার্নের তথ্য তাদের হাতে এসেছে। এই নথি খতিয়ে দেখে তাদের মনে হয়েছে, এ নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

ব্যবসায়ে ক্ষতি দেখিয়ে ট্যাক্স রিফান্ড চাইলেও বাস্তবে তিনি প্রচুর সম্পদের মালিক। তবে ট্রাম্পের দাবি, তার গল্ফ কোর্স ও হোটেলগুলো বছরের পর বছর কোটি কোটি ডলার ক্ষতি করছে। মিয়ামিতে তার সবচেয়ে বড় গল্ফ কোর্স রিসোর্ট ২০১৮ সালে ১৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার ক্ষতি করেছে বলে তার দাবি। তাছাড়া স্কটল্যান্ডে দুটি এবং আয়ারল্যান্ডে একটি গল্ফ রিসোর্টে ৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। আগামী চার বছরে তাকে ৩০ কোটি ডলার ঋণ ও অন্য পাওনা মেটাতে হবে। এমন হিসাব দেখিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই ট্যাক্স রিফান্ডের দাবি করে আসছেন ট্রাম্প।

২০১৭ সালে একবার তার আয়কর দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হলে আসে ট্রাম্প টাওয়ারের প্রশ্ন। ট্রাম্প টাওয়ারকে তিনি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করে আসছেন বহু বছর ধরেই। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি হোয়াইট হাউজে না থেকে বাস করছেন ট্রাম্প টাওয়ারে। ফলে ট্রাম্প টাওয়ারের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বাড়তি ডলার। তখন ট্রাম্প তার আইনজীবীদের দিয়ে ট্রাম্প টাওয়ারকে অলাভজনক দেখিয়ে আয়কর থেকে রেহাই পান।

ট্রাম্পের আয়কর কেলেঙ্কারির সঙ্গে এক ঝাঁক আইনজীবীও জড়িত। গত মাসের শুরুতে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প রিপাবলিকান সমর্থকদের দেওয়া নির্বাচনী প্রচারণা তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করছেন নিজের প্রয়োজনে। ওই নিজের প্রয়োজনের মধ্যে ছিল তার পক্ষে আদালতে লড়াইরত আইনজীবীদের পারিশ্রমিক। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যতগুলো আইনি মামলা চলমান রয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশই তার ব্যবসাসংক্রান্ত। আর এই ব্যবসাসংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ের অর্থও তিনি নিয়েছেন জনগণের পকেট থেকে।