জন্মদ্বিশতবর্ষ

বাঙালির অক্ষয়কুমার

অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-৮৬) সম্পর্কে আমরা ততটা জানি না, যতটা জানি বিদ্যাসাগর সম্পর্কে। তিনি বিদ্যাসাগরের সমবয়স্ক, একই বছরে তাদের জন্ম। একই মাত্রায় দরিদ্র ছিলেন এবং ছিলেন তিনি বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযাত্রী। তবে তিনি অতটা প্রবল নন। তার কাজ তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান; কিন্তু একই ধারায় কাজ করতেন তারা দুজনই; বিশেষ করে ইহজাগতিকতার, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ও নারীশিক্ষার প্রশ্নে ছিলেন একই রকম স্পষ্ট ও দৃঢ়। কেবল ইহজাগতিক নন, অক্ষয়কুমার অনেকটা বস্তুবাদী; বিদ্যাসাগরের মতোই। মানুষের জীবনে প্রার্থনার মূল্য সম্বন্ধে তার অত্যন্ত স্বাভাবিক ও পরিষ্কার সমীকরণটি তার দৃষ্টিভঙ্গিটি তুলে ধরে। সহজভাবে তিনি দেখাচ্ছেন যে পরিশ্রম করলে শস্য পাওয়া যায়, পরিশ্রমের সঙ্গে প্রার্থনা যোগ করলেও ফল সেই শস্যই, তার বেশি কিছু নয়। তাহলে প্রার্থনার মূল্যটা কী? মূল্য তো শূন্য। শস্যের এই উপমাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। অক্ষয়কুমার কৃষক ও কৃষি বিষয়ে সচেতন ছিলেন; জমিদারের উৎপীড়ন, নীলচাষিদের দুর্দশাএসব বিষয়ে লিখেছেন এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরকে অতিক্রম করে গেছেন তিনি। তার সময়েই বেকারত্ব দেখা দিয়েছিল। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে তিনি লিখেছেন, ‘যেমন একটি শব দৃষ্ট করিলে শত শত শকুনি তদুপরি আক্রমণ করে, সেইরূপ কোনো স্থানে একটি পদশূন্য হইলে ভূরি ভূরি ব্যক্তি তদর্থে লালায়িত হইয়া প্রাণপণে চেষ্টা করে।’ (‘হিন্দু স্ত্রীদিগের দুঃখ মোচনীয় সংবাদ’)

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা তিনি একটানা বারো বছর সম্পাদনা করেছেন। এটি ছিল সেকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মাসিক পত্রিকা। পত্রিকার মালিক ছিল ব্রাহ্মসমাজ, যার প্রধান ছিলেন রামমোহনের পথানুসারী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের বাবা। অক্ষয়কুমার একটি বই লিখেছিলেন, নাম ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’। সেটি পাঠে দেবেন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি কোথায়, আর তিনি কোথায়। আমি খুঁজিতেছি ঈশ্বরের সহিত আমার কী সম্বন্ধ; আর তিনি খুঁজিতেছেন, বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির কী সম্বন্ধ; আকাশ-পাতাল তফাৎ।’ তফাৎটা শেষ পর্যন্ত দুঃসহ হয়ে পড়েছিল; দেবেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল, ‘কতগুলান নাস্তিক গ্রন্থাধ্যক্ষ হইয়াছে, ইহাদিগকে এপদ বইতে বহিষ্কৃত না করিয়া দিলে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের সুবিধা নাই।’

মাতৃভাষার অনুশীলন না হলে দেশে শিক্ষাবিস্তারের যে উপায় নেই, এ বিষয়ে অক্ষয়কুমারের বক্তব্য বিদ্যাসাগরের বক্তব্যের মতোই সুস্পষ্ট। শিক্ষাভিন্ন যে উন্নতি অসম্ভব, এ বিষয়েও দুই বন্ধুর মতো অভিন্ন। অক্ষয়কুমার দেখাচ্ছেন যে, মাতৃভাষার উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক দুটি। ‘প্রথম প্রতিবন্ধক শিক্ষিত বঙ্গবাসীগণ কর্তৃক সমধিক ইংরাজি ভাষার চর্চা ও আলোচনা; এবং বঙ্গভাষানুশীলনে অবহেলা এবং তাহার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন।’ দ্বিতীয় প্রতিবন্ধক, ‘বাঙালিদিগের স্বাধীনতা শূন্যতা।’ ইংরেজের শাসন যখন মধ্যগগনে, তার অবসানের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী যখন নিশ্চিত, সেই সময়ে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যাংশে, অক্ষয়কুমার দত্ত লিখছেন‘আমরা দেখিতে পাইতেছি যাহার যেরূপ মনের অবস্থা তাহার ভাষাও সেইরূপ হইয়া থাকে।...বর্তমান সময়ে বঙ্গবাসীরা সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন নহেন। সত্য বটে সুসভ্য স্বাধীনতাপ্রিয় ইংরাজ জাতি আমাদের রাজা, কিন্তু তাহারা আমাদিগকে সকল প্রকার স্বাধীন অধিকারে অধিকারী করেন নাই। সম্প্রতি আবার তাহারা প্রেস অ্যাক্ট আইন বিধিবদ্ধ করিয়া আমাদিগের স্বাধীন আলোচনার পক্ষে বিশেষ ব্যাঘাত উপস্থিত করিয়াছেন।...যে জাতির ভাষা উন্নত সে জাতি অন্য সকল বিষয়েই উন্নত হইয়া থাকে।’ (‘বঙ্গভাষার উন্নতির প্রতিবন্ধক’)

কিন্তু সন্দেহ কী যে বিদ্যাসাগরের পাশে তিনি ম্লান হয়ে যান খ্যাতিতে। কারণগুলো স্পষ্ট। প্রথমত, গদ্যে তিনি আবেগ আনেননি, যেমনটা প্রথমে বিদ্যাসাগর এনেছিলেন এবং পরে ব্যাপকতর হারে এনেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ব্রাহ্মধর্ম ও যুক্তিবাদের পথে তিনি রামমোহনের উত্তরসূরি, কিন্তু রামমোহনের পরবর্তী যেহেতু এবং যেহেতু নিশ্চিতরূপেই মধ্যবিত্ত, বলা যায়, নিম্নমধ্যবিত্ত, তাই মৃদু তার কণ্ঠস্বর, অভাব সেখানে প্রথম প্রকাশের অভিনবত্বের ও উচ্চবিত্তের প্রবলতার। তার কালে বুদ্ধিজীবীদের কর্মক্ষেত্র সংকীর্ণত হয়েছে এবং রামমোহনের কালের বিকাশোন্মুখ স্বাধীনতারও ঘটে গেছে অসদ্ভাব। দ্বিতীয়ত, সামাজিক বিষয়ে অক্ষয়কুমার তেমনভাবে লেখেননি যেমনভাবে লিখলে বিদ্যাসাগরসুলভ বিতর্ক কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রসুলভ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারতেন। ভদ্রলোকদের মধ্যেও ভদ্রলোক তিনি, প্রবলভাবে কথা বলেন না, লিপ্ত হন না হাস্য-পরিহাসে; কণ্ঠ তাই হারিয়ে যায় নৈঃশব্দ্যে, অথবা হট্টগোলে।

তৃতীয়ত, তিনি কোনো প্রতিষ্ঠান রেখে যেতে পারেননি পেছনে, যা তাকে বিশেষভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে রাখবে; কোনো পত্রিকা বার করেননি, যদিও অন্যের পত্রিকায় কাজ করেছেন; কোনো বিদ্যালয়ও গড়ে তোলেননি, যদিও অন্যের বিদ্যালয়েতত্ত্ববোধিনী বিদ্যালয়েশিক্ষকতা করেছেন। সর্বোপরি, সামাজিক প্রতিষ্ঠায় কিছু ঘাটতি ছিল তার; তিনি যে ইংরেজের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে কেবল ইংরেজির সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিলেন, সেই ঘটনা উঁচু করতে পারেনি তাকে। পারার কথাও নয়। বস্তুত সেকালে সামাজিক মর্যাদা লাভের ব্যাপারে ইংরেজের সঙ্গে ওঠাবসার কোনো বিকল্প ছিল না। অক্ষয়কুমারকে মধ্যবিত্ত বলাও বোধ করি সংগত নয়, তিনি সেই শ্রেণির প্রতিনিধি, যাকে বলে নিম্নমধ্যবিত্ত। গদ্যে এই শ্রেণির আগমনধ্বনি তিনি। তার না ছিল চটি জুতো, না ছিল ঈওঊ পদবি। না তিনি সংস্কৃত কলেজের লোক, না ডেপুটিগিরির।

অগ্রসর চিন্তা ও চেতনার মানুষ ছিলেন অক্ষয়কুমার। বেদ-বেদান্ত উপনিষদ নিয়ে তর্কে তার কোনো উৎসাহ ছিল না, যে ধর্মবাদিতা উত্তর জীবনে বঙ্গিমচন্দ্রকে আচ্ছন্ন করেছিল, তা তার কাছে প্রশ্রয় পায়নি। সত্য বটে তিনিও ‘ধর্মনীতি’ নামে বই লিখেছেন, কিন্তু সে-বইয়ের বিষয়বস্তু জাগতিক ও সাংসারিক, আধ্যাত্মিক নয়। ধর্মের তত্ত্ব তাকে আকর্ষণ করল না, যেমন করল বঙ্কিমকে; অক্ষয়কুমার বই লিখলেন ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ নামেউপাসনার চেয়ে উপাসক বড় হয়ে উঠল তার কাছে। তার সম্পর্কে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই উক্তিটি স্মরণীয়, যেটি পড়লে কেবল অক্ষয়কুমারকে নয়, অক্ষয়কুমার ও দেবেন্দ্রনাথ উভয়কেই জানা যায় একত্রে : ‘আমি কোথায়, তিনি কোথায়। আমি খুঁজিতেছি ঈশ্বরের সহিত আমার কী সম্বন্ধ; আর তিনি খুঁজিতেছেন বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির কী সম্বন্ধ। আকাশ-পাতাল প্রভেদ।’

তা ঠিকই, বিস্তর ব্যবধান দুজনের। ঈশ্বরপ্রেমের সঙ্গী, হয়তো-বা পরিপূরক হিসেবে দেবেন্দ্রনাথের অভ্যাস ছিল মৃদু সুরা পানের; অক্ষয়কুমার না পান করলেন ধর্মের সুরা না বোতলের। লোকে তখন উন্মাদনা চাইত, এখনো যেমন চায়, অক্ষয়কুমার ব্যর্থ হয়েছেন সেটি সরবরাহে। বললে মোটেই অন্যায় হবে না যে, অক্ষয়কুমার মানুষের জীবনে ধর্মের হুকুমদখল মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ধর্মের স্থলে যুক্তিকে বসাচ্ছিলেন। কিন্তু ধর্মবাদিতায় সমাচ্ছন্ন সংস্কৃতিতে যুক্তি কি বিকল্প হতে পারে ধর্মের? যুক্তি কি আহার্য জোটাবে বুভুক্ষু হৃদয়ের? পারবে কি আশ্বাস দিতে ইহলৌকিক ব্যর্থতার পারলৌকিক ক্ষতিপূরণের? সন্তুষ্ট করতে পারবে কি পরাধীন দেশের জাতীয়তাবাদী অভিমানকে? পারবে কি সৃষ্টি করতে স্বাধীনতার বিভ্রম? পারবে না। আর সেখানেই তো ‘দুর্বলতা’ অক্ষয়কুমারের গদ্যরচনার। যুক্তির পক্ষে সম্ভব নয় উত্তেজিত হওয়া, যুক্তি বিকল্প নয় বিশ্বাসেরতখন ছিল না, এখনো হয়নি। শুরু করেছিলেন পদ্য দিয়েই; পদ্য ছেড়ে গদ্যে এসেছেন, অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল সেই আগমন, আর যা-ই হোক কবি হতে পারতেন না যুক্তিবাদী অক্ষয়কুমার। তার গদ্যে কাব্য নেই। প্রমথনাথ বিশী যথার্থই বলেছেন, ‘অক্ষয়কুমারের স্টাইল এক প্রকার গদ্য পয়ার, তার শক্তি একান্ত সীমাবদ্ধ, কিন্তু সীমার মধ্যে তা শক্তিমান।’ গদ্য তার অনুত্তেজিত যুক্তিবাদিতার পক্ষে স্বাভাবিক বাহন; অমিত্রাক্ষর তার লেখার কথা নয়, লেখার কথা আবেগপ্রবণদের; লেখার কথা কবিতায় মাইকেলের এবং গদ্যে বিদ্যাসাগরের। গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক রচনা রেখে গেছেন অক্ষয়কুমার। ‘চারুপাঠ’ লিখেছেন তিনি শিশুদের জন্য। তবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তত্ত্ববোধিনীর সম্পাদক হিসেবে (১৮৪৩-১৮৫৪) লেখা তার সমাজবিষয়ক প্রবন্ধাবলী। তত্ত্ববোধিনী অবশ্য বঙ্গদর্শন নয়, এই ব্রাহ্ম পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী বঙ্কিমের প্রবলতা দুষ্প্রাপ্য। তত্ত্ববোধিনীতে অক্ষয়কুমার ‘কলিকাতার বর্তমান অবস্থা’ নিয়ে লিখেছেন, পাশাপাশি লিখেছেন, ‘পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদিগের দুরবস্থা’ নিয়ে। প্রজাদিগের দুঃখ দেখে লিখেছেন তিনি ‘হায়! কোনো প্রজাদের নিজ শরীরও স্বায়ত্ত নহে, তাহারা গলদঘর্ম কলেবরে সমস্ত দিবস ভূস্বামীর কর্ম করিবার, উচিত বেতনের চতুর্থাংশও প্রাপ্ত হয় নাই। অক্ষয়কুমারের সুহৃদ ও সহকর্মী বিদ্যাসাগর এমনভাবে ব্যাপারটা অনুভব করতেন কি না জানার উপায় নেই। নীলদর্পণ রচনা সম্বন্ধে বঙ্কিমের আপত্তি ছিল; রামমোহন ও দ্বারকানাথ নীল চাষ পছন্দ করতেন; অক্ষয়কুমার কিন্তু ঠিকই বলে দিয়েছেন ‘নীলকরদিগের কার্যের আদ্যোপান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে স্পষ্ট প্রতীত হয় যে, কেবল প্রজাপীড়ন করিয়া স্বকার্য করাই তাহাদের সংকল্প।...কি প্রকারে দুর্নিবার প্রতিবন্ধন মোচন হইয়া এ দেশের পরিত্রাণ সাধন হইবে তাহা জগদীশ্বর জানেন।’ এই যে ‘কেবল জগদীশ্বর জানেন’ বলা, এর মধ্যকার হতাশাটা মোটেই অস্পষ্ট নয়। বাস্তবিকই তিনি জানতেন না পথ আদৌ আছে কি না। অন্যদিকে তিনি আবার আবাল্য কলকাতাবাসী, কৃষক তার চেতনায় হানা দেয় বটে কিন্তু কৃষক যে তার অভিজ্ঞতা ও সৃজনী কল্পনার বিষয়বস্তু হবে তা আর হয়ে ওঠে না। দূরত্ব একটা থেকেই যায়অবস্থানগত কারণে।

অক্ষয়কুমারের পিউরিটানদের গুণ ছিল; ছিল ইহজাগতিকতার বোধ, সঞ্চয়ে আস্থা, সংযম, যুক্তিবাদিতা। কিন্তু পিউরিটানিজম তো ব্যক্তিগত অর্জনের ব্যাপার নয়, এটি একটি সমষ্টিবদ্ধ আন্দোলন, যার বিকাশ জাতীয় পরাধীনতার বন্দিদশায় কখনো সম্ভবপর নয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি পিউরিটান ছিলেন বলতে গিয়ে যোগ করতে হয় এই সংশোধনী যে, যথার্থ পিউরিটানের যুদ্ধমনস্কতা কিন্তু তার ছিল না, তিনি সব সময়েই সমন্বয়বাদী। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। অনেককে তিনি প্রভাবিত করতে পারলেন না, এমনকি নিজে যে অনেক দূরে এগোবেন, তাও সম্ভব হলো না। কর্মরতও রইলেন না তিনি দীর্ঘকাল। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে দুরারোগ্য শিরপীড়ায় আক্রান্ত হন তিনি এবং তারপর আমৃত্যু ভোগেন এই রোগে। অসুস্থ সমাজে সুস্থ থাকা যে কত কঠিন, এই বোধ করি তারই নিদর্শন।

অক্ষয়কুমার অনেক দূর এগিয়েছেন, কিন্তু তবু ধর্ম যে তার পিছু ছাড়েনি সেটাও সত্য এবং সেখানে তিনি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে থাকতে পারেননি। অক্ষয়কুমার একসময়ে ভেবেছিলেন খ্রিস্টান হয়ে যাবেন; খ্রিস্টান হননি ঠিকই, কিন্তু ব্রাহ্ম হয়েছিলেন। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর তত্ত্ববোধিনী সভা ও পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বটে, কিন্তু ব্রাহ্ম হবেন এমনটা কখনোই ভাবেননি। ধর্মের ব্যাপারে বিদ্যাসাগর উদাসীনই রয়ে গেছেন। অক্ষয়কুমার এ রকম কথা বলেছেন যে, ‘যেসব প্রচলিত ধর্মের সহিত জগতের নিয়মশৃঙ্খলার ঐক্য নাই, তাহা সংশোধন করা কর্তব্য’। (‘বিদ্যা ও ধর্মের পরস্পর সম্বন্ধ বিচার’) কিন্তু ধর্ম বিষয়ে উদাসীন হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শুধু তাই নয়, পরাধীনতার দরুন মাতৃভাষার জায়গায় ইংরেজি ভাষার চর্চার ক্ষতিকর প্রবাহ লক্ষ করে তিনি আশঙ্কা করেছেন যে, ওই তোড়ে মানুষ হয়তো বিধর্মী হয়ে পড়বে। অক্ষয়কুমার লিখেছেন, ‘আমরা পরের অত্যাচার সহ্য করিতেছি এবং খ্রিষ্টীয় ধর্মের যেরূপ প্রাদুর্ভাব হইতেছে, তাহাতে শঙ্কা হয় কি জানি পরের ধর্ম বা এ দেশের জাতীয় ধর্ম হয়।’ (‘বঙ্গদেশে শিক্ষার বর্তমান অবস্থান’)

অক্ষয়কুমারের আরেক অনিবার্য সীমা এই যে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের কথাই শুধু ভেবেছেন, মুসলমানরা তার চিন্তায় আসেনি। তার প্রবন্ধের স্বাভাবিক নাম, ‘হিন্দু স্ত্রীদিগের বিদ্যাশিক্ষা’ এবং ‘হিন্দু স্ত্রীদিগের দুঃখ মোচনীয় সংবাদ’। এর আগে কলকাতার বিদ্যোৎসাহী মানুষরা নিজেদের উদ্যোগে যে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটির নাম তারা রেখেছিলেন হিন্দু কলেজ; ‘জাতীয় মেলা’ নামে যার শুরু তার পরিণতি ঘটেছে ‘হিন্দু মেলা’তে। অত্যন্ত প্রগতিশীল ছিল যে পত্রিকা তার নামকরণেও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্ব প্রকাশ পায়নি; সেটির নাম ছিল ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’। এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। যে দৃষ্টিভঙ্গি সাম্প্রদায়িক-বিভাজনকে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ধারণায় ইংরেজরা জোরেশোরে হাওয়া দিয়েছে এবং বিরোধের ওই বোধ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত করে দেশবাসীকে ভয়ংকর বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভাষা বলছিল পরিচয়টা হওয়া চাই ভাষাভিত্তিক, ধর্ম এসে ভাষার কাঁধে চেপে বসল। অক্ষয়কুমার দত্ত ধর্মের পক্ষে ছিলেন না, ছিলেন ভাষার পক্ষে। বলাই বাহুল্য যে, বাঙালি বাঙালি হয়েছে সেটা ভাষার কারণে, ধর্মের কারণে নয়। অক্ষয়কুমারের কাছে বাংলাভাষীদের ঋণ অপরিমেয়।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়