স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমপক্ষে ৭৫ জন কোটিপতি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিল ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ কর্মকর্তাকে সম্পদ বিবরণীর নোটিস দেওয়ার পাশাপাশি তাদের স্ত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে।
দুদক সচিব দিলওয়ার বখত বলেন, ‘আমরা ৭৫ জনের তালিকা তৈরি করে অনুসন্ধান করছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যের তালিকাভুক্ত ৭৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরও অবৈধ সম্পদ উৎস ও অর্থ লোপাটের তথ্য পাওয়া যাবে। তা ছাড়া কমিশনের গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান। নতুন যাদের নাম আসবে পর্যায়ক্রমে তাদেরও অনুসন্ধানের তালিকায় আনা হবে।’ সচিব আরও বলেন, ‘দুদক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির খাতগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিকারে বেশ কিছু সুপারিশ করে। সেই অনুযায়ী কাজ করলে এ খাতে দুর্নীতি কমানো যেত।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের নামে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ আছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বদলি ছাড়া তেমন কোনো কিছু করার থাকে না। দুদক আইনি ব্যবস্থা নিলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
দুদকের পরিচালক আব্দুল আউয়াল কর্র্তৃক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটির পরিচালকের কাছে অনুসন্ধানের জন্য ৭৫ জনের তালিকা পাঠান। এতে বিষয় লেখা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্র্তৃক সহকারী প্রোগ্রামার মো. রুহুল আমিনসহ মোট ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগটির বিষয়ে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কমিশন কর্র্তৃক সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই কোটিপতি বলে আমরা প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি। গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর কয়েক কর্মকর্তা ও তাদের স্ত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতিমধ্যে নোটিস দেওয়া হয়েছে।’
দুদক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে, তারা হচ্ছেন পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ফারুক হাসান, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলাম, সাজেদুল করিম, উচ্চমান সহকারী মো. তৈয়বুর রহমান, মো. সাইফুল ইসলাম, পরিচালক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী ফয়জুর রহমান, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হক, স্টেনোটাইপিস্ট কাম কম্পিউটার অপারেটর আজমল খান, পরিচালক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আব্দুল কুদ্দুস, পরিচালক সিলেট কার্যালয়ের প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আব্দুল কুদ্দুস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোস আহমেদ, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নেছার আহমেদ চৌধুরী, পরিচালক খুলনা কার্যালয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেন, অফিস সহকারী মাসুম, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন, পরিচালক খুলনা কার্যালয়ের প্রধান সহকারী রাহাত খান, উচ্চমান সহকারী মো. জুয়েল, পরিচালক রংপুর কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমান, সহকারী স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক রাজশাহী কার্যালয়ের প্রধান সহকারী হেলাল উদ্দিন ও মাসুদ খান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন, অধ্যাপক ডা. আব্দুর রশীদসহ ২৮ জন।
অপর একটি তালিকায় ৪৭ জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রামার মো. রুহুল আমিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবীর চৌধুরী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাজ্জাদ মুন্সী, হুমায়ুন চৌধুরী, জালাল উদ্দিন, প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএ) মো. শাহজাহান ফকির, আবু সোহেল, উচ্চমান সহকারী শফিকুল ইসলাম, এডুকেশন শাখার ক্যাশিয়ার মুজিবর রহমান ও খায়রুল আলম, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. হারুন অর রশীদ, অফিস সহকারী মো. হানিফ, মাসুদ করিম, আলাউদ্দিন, অফিস সহকারী এসসিডিসি মো. ইকবাল হোসেন, অফিস সহকারী (ইপিআই) মুজিবুল হক মুন্সী, তোফায়েল আহমেদ, অফিস সহকারী (ডব্লিউএইও শাখা) কামরুল ইসলাম, সহকারী (কমিউনিটি ক্লিনিক) আনোয়ার হোসেন, স্টেনোটাইপিস্ট সুনীল বাবু, স্টোর ম্যানেজার (ইপিআই) হেলাল তরফদার, ড্রাইভার মো. শাহজাহান ও আব্দুল মালেক (ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার), মুগদা জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাফি, রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রধান সহকারী মো. ফজলুল হক, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক ইমদাদুল হক, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আলিমুল ইসলাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সচিব আনোয়ার হোসেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাশেদ মিয়া, খুলনা শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহমুদুজ্জামান, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক সিদ্দিকী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের স্টোর কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, সিনিয়র স্টোর কিপার মো. রফিকুল ইসলাম, কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. টিটু, স্টোর কিপার মো. সাফায়েত হোসেন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ল্যাব সহকারী আব্দুল হালিম, ল্যাব সহকারী সুব্রত কুমার দাস, গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওবায়দুল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সচিব জালাল মোল্লা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হিসাবরক্ষক মো. মারুফ হোসেন, রাজশাহীর বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, রাজশাহীর সিভিল সার্জন অফিসের হিসাবরক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন ও গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর কিপার মো. নাজিম উদ্দিন, অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার উপসহকারী পরিসংখ্যানবিদ মো. রাজিউদ্দিন, কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আকরাম মিয়া।
দুদকের নথি থেকে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনডিসি বিভাগের অফিস সহকারী ইকবাল হোসেন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি নেন। পরে ওই প্রকল্প রাজস্ব খাতে স্থানান্তর হয়। তার নামে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট ও গাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিদপ্তরের পরিচালক প্রশাসনের পিএ আবু সোহেল বরিশাল সদর হাসপাতালে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে চাকরি নেন। নানা কৌশলে অধিদপ্তরে বদলি হয়ে এসে পদোন্নতি পেয়ে এখন তিনিও প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
উচ্চমান সহকারী শরিফুল ইসলামের বাড়ি নাটোরে। তার বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ চুরির অভিযোগ বহু পুরনো। ওষুধ চোরাই সিন্ডিকেটের হোতা শরিফুল। রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিস থেকে ওষুধ চুরির সময় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন তার ছোট ভাই মকবুল হোসেন। ওই সময় তিনি জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুলের চোরাই ওষুধ সিন্ডিকেটের বিবরণ দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য কুখ্যাতি পাওয়া আবজাল হোসেনের খালাতো ভাই খায়রুলের ঢাকায় ৬টি বাড়ি আছে বলে অভিযোগে বলা হয়। খায়রুল মূলত টেন্ডার ও প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ার তদবিরের সঙ্গে জড়িত। তিনি বড় বড় ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে কাজ করেন এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেন।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী রাজশাহীর বিভাগীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ব্যুরো চিফ থাকার সময় ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। সাবেক একজন মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় থাকায় তিনি অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। একইভাবে উপসহকারী পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রাজিউদ্দিন সাবেক একজন মহাপরিচালকের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বিদেশ প্রশিক্ষণের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগে বলা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাশেদ মিয়া ঢামেকের পরিচালকের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে টেন্ডার ও সরবরাহ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল সম্পদের মালিক হন।
কর্মচারী ছাড়াও দুদকের একাধিক পরিচালক ও সাবেক মহাপরিচালকও আছেন দুদকের অনুসন্ধান তালিকায়।