বাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনুন

দেশে গত কয়েক মাসে করোনার প্রভাবে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে সঞ্চয়ের শেষ অংশটুকু ব্যয় করে দিশেহারা। এমন সময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বাজারদরের ঊর্দ্ধগতি। প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া। দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে একটি প্রশ্ন আমরা পরিবার নিয়ে বাঁচব কী করে? বাজারে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে আলু। সঙ্গে ভোজ্য তেল, ডিম, আদা, রসুন; সবজির উচ্চ দামও মানুষকে ভোগাচ্ছে। করোনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারের দাম নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে অভিযান চালালে সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্য বিক্রি করলেও অভিযান শেষ হলেই আগের চড়া দামই অব্যাহত রাখছে।

গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘বাজারে ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার-ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সম্মতিতে আলুসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ, অভিযান, মন্ত্রীদের অনুরোধ কোনো কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। বাজারজুড়ে চলছে যেন অস্বাভাবিক দামের প্রতিযোগিতা! গত দুই মাসে বাজারদর অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ কিনতে হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকায়, পেঁয়াজ ১০০ টাকা, আলু ৫০-৬০ টাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন অভিযানে নামলে বিক্রেতারা সঠিক দামে পণ্য বিক্রি করেন। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পরপরই আবারও আগের অবস্থা ফিরে আসে। প্রশাসন-ব্যবসায়ীদের এই ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলার মাশুল গুনতে হচ্ছে ক্রেতাকে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দিনমজুরদের প্রতিদিন বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ বছর এই সময়ে আলুর দাম এমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর লকডাউন, দীর্ঘ সাধারণ ছুটি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা হারানো ইত্যাদি কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যসাহায্যের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি উদ্যোগে যেসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে, সে তালিকার অন্যতম উপাদান ছিল আলু। এভাবে প্রচুর পরিমাণ আলু বিতরণ হয়েছে। তা ছাড়া চলতি অর্থবছরে আলুর রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ডলার মূল্যের আলু। আর চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের আলু। অর্থাৎ, এ বছর বিপুল পরিমাণ আলু দেশের বাইরে চলে গেছে। আলু রপ্তানি এভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো সরকারের ২০ শতাংশ ভর্তুকি। এর কারণে আলু রপ্তানিকারকরা রপ্তানি বাড়াতে উৎসাহ পেয়েছেন। এছাড়া দেশে প্রচুর চাল মজুদ থাকা সত্ত্বেও এবং সরকারের পক্ষ থেকে মিল পর্যায়ে চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও ভোক্তারা প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চালে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বাড়তি দিতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি, ভারত গত সেপ্টেম্বর মাসে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দিলে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সরকারের বিভিন্ন তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও পেঁয়াজের উচ্চদাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া করোনার সময় পরিবহন চেইনে এক ধরনের বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে অনেক সবজি নষ্ট হওয়ায় বাজারে অনেক সবজির দাম চড়া হয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় যে কারণটি রয়েছে, সেটি হলো সিন্ডিকেটের কারসাজি। সময় ও সুযোগ বুঝে অতি মুনাফালোভী অসাধু একটি চক্র প্রায়ই বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে থাকে, এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। যোগসাজশের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করা হলে একদিকে ভোক্তাস্বার্থের হানি ঘটে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর পড়ে এর বিরূপ প্রভাব। ব্যবসায় মুনাফা অর্জন স্বতঃসিদ্ধ ও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু মুনাফা অর্জনের নামে নীতিজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বাজার নিয়ন্ত্রণে যে পরামর্শ দিয়েছেন, তা বিশেষ বিবেচনা করা জরুরি। তারা বলছেন যে, বাজারে চলমান অস্থিরতা নিরসনে প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ। শুধু জরিমানা বা অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে জরিমানার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে।

দেশে আইনের ক্ষমতাবলে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। ধানের দাম নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। আমদানিকৃত পণ্যের দাম ট্যারিফ কমিশনের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে। কিন্তু এসব মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকলেও নিত্যপণ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না কেন? এক্ষেত্রে দাম নিয়ন্ত্রণকারী কিছু প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতার কথা আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর কৃষি বিপণন আইন-২০১৮ সালে পাস হলেও এখনো কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিধিমালা করতে পারেনি। তাই প্রতিষ্ঠানটি কেবল পণ্যের দাম নির্ধারণ ও বাজারদরের হালনাগাদে কার্যক্রম গুটিয়ে রেখেছে। এছাড়া বাজার তদারকির আরেক প্রতিষ্ঠান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জনবলের সংকটের কারণে সারা দেশে জোরালোভাবে অভিযান চালাতে পারছে না। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা কাটিয়ে তোলাসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই।