আজ শুক্রবার। চলতি হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসের ১২তম দিবস। দিনটি মুসলমানদের কাছে পবিত্রতাময় এক দিন, মানব ইতিহাসের উজ্জ্বলতম এক অধ্যায়ের স্মারক। এ দিনেই সাইয়্যেদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরায় আগমন করেন, আবার এদিনই তিনি তার ওপর অর্পিত রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে প্রভুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন এবং আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে গমন করেন। সে হিসেবে এক দিকে এ দিনে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভাগমন বিশ্ববাসীকে পুলকিত করে, অন্যদিকে এ দিনে তার বিদায় মুসলিম বিশ্বকে শোকাহত করে।
রবিউল আউয়াল অর্থ প্রথম বসন্ত। বসন্তের আগমনে যেমন গাছের পুরনো পাতা ঝরে গিয়ে নতুন পাতার মাধ্যমে গাছ নতুন করে সজীবতা লাভ করে, অনুরূপ বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনে অতীতের পয়গম্বরদের শরিয়ত রহিত হয়ে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইসলাম নামক শরিয়ত সঞ্জীবিত ও পূর্ণতা লাভ করে। সামাজিক ও ঐতিহ্যগত কারণে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম উম্মাহর জন্য ঘটনা-দুর্ঘটনার স্মৃতির সঙ্গে বিজড়িত এ মাস। রবিউল আউয়াল জগদ্বাসীর কাছে, বিশেষত মুসলিম উম্মাহর কাছে নববী আদর্শের তথা আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের পয়গাম নিয়ে আসে। এ পয়গাম বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা ভূখ-ের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সর্বজনীন।
নবী করিম (সা.)-এর আগমন ঘটেছিল এমন এক সময়ে, যখন পুরো আরবজাতি হত্যা, রাহাজানি, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা- সবকিছু মিলিয়ে অন্ধকার যুগে বসবাস করছিল। ঠিক সে সময়ে বিশ্ববাসীর মুক্তির দূত হিসেবে আগমন করেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। মারামারি, হানাহানির এই পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা রাসুলে করিম (সা.)-কে পাঠিয়েছেন বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সারা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ সুরা আম্বিয়া: ১০৭
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন এবং ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। মাত্র ২৩ বছরের কর্মসাধনায় তিনি সমাজ ও দেশের এমন পরিবর্তন সাধন করেন, যা মানব ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সমাজে মনুষ্যত্ব নির্মাণের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে এক অনন্য সমাজ সংস্কারক, সফল রাষ্ট্রপ্রধান, প্রথম সংবিধান প্রণেতা, শ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানবতার মুক্তির জন্য আজীবন কঠোর সংগ্রামকারী। প্রভৃতি সব দিক দিয়ে তিনি সবার জন্য অনুসরণীয়। বর্তমান বিশ্বে যারা রাসুল (সা.)-এর রেখে যাওয়া আদর্শ ও শিক্ষা অনুযায়ী বিভিন্ন গবেষণা কাজ করেছেন অথবা জীবনকে পরিচালিত করেছেন তারা সবাই সফল হয়েছেন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বশান্তির আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজে দ্বীন তথা জীবন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। সুতরাং জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা দেওয়ার পর নতুন করে কোনো জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আজ মুসলমানসহ মানবজাতি রাসুলের জীবনাদর্শ থেকে বিমুখ হয়ে নতুন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিশ্ব অশান্তির দাবানলে জ্বলছে।
অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে বলতে হয়, এবারের রবিউল আউয়াল মাস এমন এক সময়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, যখন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব পরিস্থিতি উত্তাল। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র আঁকা, প্রচার ও এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে মুসলিম দেশগুলোতে তীব্র ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে।
অথচ ইতিহাস সাক্ষী, যারা আল্লাহর নবীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের স্মরণ ও আলোচনাকেও যুগে যুগে সমুন্নত রেখেছেন। যেমন, সম্মানিত সাহাবিরা মুসলিম উম্মাহর জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়া যুগে যুগে নবী প্রেমিক মনীষীরা মানবজাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। অপরদিকে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ ও বিষোদগারকারীরা ইতিহাসে অভিশপ্ত। অতীতে নবী করিম (সা.)-এর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের ফলে বহু শক্তি সভ্যতা ও রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে। আধুনিক যুগেও আদর্শিকভাবে পরাজিত কিছু শক্তি সভ্যতার সব নিয়ম অমান্য করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে, ইসলামের নবীকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করে, কার্টুন আঁকে; ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে। নবীকে নিয়ে বাজে মন্তব্য ও বিষোদগার করে। এরা কোনো মূলধারার ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়। কারণ, অন্যান্য ধর্মের মনীষীরা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা নবী করিম (সা.) সম্পর্কে এত সুখ্যাতি ও উন্নত মন্তব্য করেছেন, যা কোনো অংশেই মুসলিম মনীষীদের চেয়ে কম হবে না। বিশ্বসাহিত্য মহানবী (সা.)-এর প্রশংসায় ভরা।
পশ্চিমে এসব প্রশংসা বাণী বড় বড় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। মাইকেল এইচ হার্ট তার দি হান্ড্রেড গ্রন্থে ইতিহাসের সেরা ১০০ মনীষীর মধ্যে প্রথম নামটি লিখেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। এখানে ইসলামের জনপ্রিয়তা দিন দিন এর অগ্রসরতা দেখে ঈর্ষাকাতর কোনো অসুস্থ মানসিকতার ব্যক্তি তাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য ও ব্যঙ্গ করতেই পারে। তবে, এর দায় এই ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা এর সমর্থক রাষ্ট্রকে নিতে হবে। দিনে দিনে এসব মানবতাবিরোধী ও সভ্যতা বিদ্বেষী মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই অভিশপ্ত ও বিলুপ্ত হতে বাধ্য।
আমরা জানি, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সদা চিন্তাশীল, কোমল, শান্ত ও ভদ্র চরিত্রের অধিকারী। রূঢ় স্বভাবের ও হীন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন না। ব্যক্তিগত বা পার্থিব স্বার্থে আঘাত হলে রাগ করতেন না। কিন্তু আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে প্রতিবিধান না করা পর্যন্ত ক্রোধ থামাতেন না এবং ক্ষান্ত হতেন না। নিকট অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই, ফায়দা হাসিলের জন্য কোনো নেতা বা ব্যক্তিবিশেষ রাসুলের অবমাননাকে পুঁজি করে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের সেই হীন উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি, উল্টো ইতিহাসে তারা ধিকৃত হয়েছেন। খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ওইসব লোকের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননা করে নয় বরং তার আদর্শ ও নীতি অনুযায়ী পথ চলার। কারণ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তার দেখানো আদর্শ আলোকোজ্জ্বল বর্তিকা হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে।
রবিউল আউয়াল মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভালোবাসা। রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ইমানের অঙ্গ। হাদিস শরিফে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে আমাকে তার বাবা-মা, ছেলে-সন্তান ও সব মানুষ থেকে অধিক ভালো না বাসবে।’ -মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ১১/২০০
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলমানদেরও অনেকেই নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও সুন্নত সম্পর্কে উদাসীন। অথচ, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে সিরাত চর্চা করা, তার সুন্নতের অনুসরণ করা ও তার জীবনাদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ, নবী মুহাম্মদ (সা.) ২৩ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে মানবজাতির কাছে উপহার দিয়ে গেছেন পবিত্র ইসলাম ধর্ম। এ ধর্ম একটি পরিপূর্ণ ও চিরন্তন ধর্ম হিসেবে কোনো বিশেষ জাতি বা গোত্রের জন্য সীমিত নয়। এই আদর্শগুলো ধারণ করে যেকোনো ব্যক্তি উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। আর এটা কে না জানে, যেকোনো পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের জন্য উন্নত চরিত্রের মানুষের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক