সংক্রমণের প্রথম দিককার থেকেই করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যায় বিশ্বের তালিকার শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত দেশটির ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। মারা গেছে দুই লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি।
এদিকে ৩ নভেম্বর দেশটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জো বাইডেন।
যদিও নির্বাচনের ঠিক আগে সংক্রমণের সংখ্যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাড়ছে। প্রতিদিন এখন প্রায় ৮৯ হাজার মার্কিনি নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, করোনা ইস্যুর কারণে বাইডেনের কাছে ঘায়েল হতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মার্কিন বিশ্লেষকদের মধ্যে বড় কোনো দ্বিমত নেই যে, এবারের মার্কিন নির্বাচনে এক নম্বর ইস্যু - করোনাভাইরাস। তাদের অনেকেই বলছেন, এবার রেকর্ড আগাম ভোটের অন্যতম কারণ এই মহামারি।
বিধিনিষেধের কারণে মঙ্গলবার কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পারার উদ্বেগ থেকে আগাম ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। রেকর্ড ৯ কোটি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন যা ২০১৬ সালে দেওয়া মোট ভোটার উপস্থিতির ৬০ শতাংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে গত সাত মাস ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মহামারি সামাল দিতে যা করছেন বা বলছেন, ভোটের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব কী হচ্ছে?
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, করোনা মোকাবিলায় সরকারের পারফরমেন্স নিয়ে অনেক মানুষ তাদের মনোভাব ব্যালটের মাধ্যমে দেখাতে উন্মুখ হয়ে আছে।
ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং বিশ্লেষক জো গার্সটেনসন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনা মোকাবিলা যা করছেন অধিকাংশ মার্কিনি তাতে খুশি নন।’
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যা করছেন তা হলো প্রতিদিনের পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করে সেই মতো তিনি সাড়া দিচ্ছেন।’
দুদিন আগেও ওয়াশিংটনের রাস্তায় বিবিসির একজন সংবাদদাতা ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শোনেন।
কৃষ্ণাঙ্গ এক তরুণীর ভাষ্য, ‘যেভাবে তিনি (ট্রাম্প) পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন তা খুবই দুর্বল।’ অন্যদিকে মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ এক নারীর কথা, ‘প্রেসিডেন্ট চাইছেন সবাই যেন আতঙ্কিত না হয়ে পড়ুক। আমি সেটা পছন্দ করছি।’
আরেক শ্বেতাঙ্গ তরুণীর বক্তব্য, ‘অত্যন্ত ভালো কিছু তিনি করেননি, আবার যে খুব খারাপ কিছু করেছেন তাও আমি বলব না।’
সর্বশেষ জনমত জরিপও বলছে যে, প্রতি ১০ জন মার্কিন নাগরিকের সাতজনই মনে করছেন কভিড-১৯ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ‘ভুল বার্তা’ দিচ্ছেন। তবে রিপাবলিকান সমর্থকদের সিংহভাগই এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের পেছনেই রয়েছেন।
অধ্যাপক গার্সটেনসন বলেন, ‘শুধু যে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে মতামতে ভিন্নতা রয়েছে তাই নয়, এলাকা ভিত্তিতেও জনমত ভিন্ন। যে এলাকার মানুষ এই মহামারিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা ক্ষিপ্ত।’
যেমন, বছরের শুরুর দিকে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে জনমত জরিপে জো বাইডেন খুব সামান্য এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু গ্রীষ্মে ওই রাজ্যে কভিড-১৯ ভয়ংকর রূপ নেওয়ার পর বাইডেনের পক্ষে সমর্থন অনেক বেড়েছে। অ্যারিজোনায় করোনায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৫৯২০ জন।
উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে ২০১৬ সালের ভোটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামান্য ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবারও বছরের অধিকাংশ সময় জুড়ে ট্রাম্পের সমর্থনে তেমন কোনো ভাটা দেখা যায়নি। কিন্তু অক্টোবর মাসে হঠাৎ সংক্রমণ হুহু করে বাড়তে থাকায় জনমত ঘুরে গেছে। সর্বশেষ জনমত জরিপে উইসকনসিনে জো বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে সাত থেকে ১৭ পয়েন্ট এগিয়ে গেছেন।
এছাড়াও, যে অঙ্গরাজ্যটি ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানদের অন্যতম একটি ঘাঁটি সেই টেক্সাসেও ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পকে নিয়ে বিরূপ মনোভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। কারণ, দুই দফা সংক্রমণে টেক্সাস বিপর্যস্ত। করোনায় এই রাজ্যে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে।
টেক্সাসের চিত্রশিল্পী শেন রেইলি তার অঙ্গরাজ্যে করোনায় এত লোকের মৃত্যুতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘জীবনে প্রথমবারের মতো এবার তিনি দল বদলেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় রক্ষণশীলদের ভোট দিয়েছি। কিন্তু এই মহামারি মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা যা করছে তাতে জীবনে প্রথমবারের মতো আমি ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেব।’
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব ক্রোধের তেমন তোয়াক্কা করছেন না। দুদিন আগে শনিবার পেনসিলভানিয়ার নিউটন শহরে এক সভায় তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে মশকরা করে বলেন, ‘জো বাইডেন কি বলছেন আমি গতকাল তা দেখলাম। তার মুখে সেই একই বুলি - কভিড, কভিড আর কভিড। বলার মত তার কাছে আর কিছু নেই।’
ট্রাম্পের ওই প্রচারণা সভায় অনেকের মুখেই মাস্ক ছিল না। শনিবার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি একটি হিসাব প্রকাশ করেছে যে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রচারণা সভার কারণে অতিরিক্ত ৩০ হাজারেরও বেশি লোক কভিডে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে অতিরিক্ত ৭০০ জন।
অবশ্য অধ্যাপক গার্সটেনসন মনে করেন, বহু মানুষের ভোটের সিদ্ধান্তের পেছনে করোনা মহামারি একমাত্র বিবেচ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘খুব কম রিপাবলিকানই, বিশেষ করে যারা দলের ঘোরতর সমর্থক, তাদের দলীয় আনুগত্য ভঙ্গ করে জো বাইডেনকে ভোট দেবেন।’
তবে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে যদি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পট বদলে যায়, কভিড নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পারফরমেন্সকেই তার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হবে।