আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেই অনেকে আশঙ্কা করছেন এবারের নির্বাচনটি বিতর্কিত হতে পারে। ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য ও আচরণে এমন আভাসও মিলেছে। অতীতে চোখ রাখলে দেখা যায়, দেশটিতে বিতর্কিত নির্বাচন নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি
নির্বাচনের জের ধরে
১৮০০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসে চতুর্থ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেবারই প্রথম নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দেয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত মার্কিন সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী আনা হয়। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে থমাস জেফারসন ছিলেন ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান দলের এবং জন অ্যাডামস ছিলেন ফেডারেলিস্ট পার্টি থেকে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে এক উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দ্বাদশ সংশোধনীর আগে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, ইলেকটোরাল কলেজের সদস্যরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দুটি করে ভোট দিতে পারতেন। তাদের ভোটে যে প্রার্থী এগিয়ে থাকতেন, তিনিই হতেন প্রেসিডেন্ট। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি হতেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৮০০ সালের মার্কিন নির্বাচনের ইলেকটোরাল ভোটে জন অ্যাডামস ৬৫ ভোট পান আর ৭৩ ভোট পেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে যান থমাস জেফারসন। তাই নিয়ম অনুযায়ী, জেফারসনেরই প্রেসিডেন্ট হওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা বাধে তখনই যখন দেখা যায়, জেফারসনের সমানসংখ্যক ৭৩টি ভোট পেয়ে বসে আছেন রিপাবলিকান-ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী অ্যারন বার। সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পাওয়ায় অ্যারন বারও প্রেসিডেন্ট পদের দাবিদার ছিলেন। ফলে বিষয়টির সমাধানের জন্য হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে যাওয়া হয়। এবার দৃশ্যপটে হাজির হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ট্রেজারি সেক্রেটারি ও ফেডারেলিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার হ্যামিলটন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের কাউকেই তিনি পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনজনের মধ্যে থমাস জেফারসনকেই তিনি যোগ্য মনে করেছিলেন। ফলে থমাস জেফারসনের পক্ষে ফেডারেলিস্টদের সমর্থন আদায়ের জন্য তিনি একটি চিঠি ইস্যু করেছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘অ্যারন বার নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই ভালোবাসে না।’ আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত থমাস জেফারসনকেই প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ছয় দিন পর নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেফারসনের নাম উচ্চারিত হয়।
ওই নির্বাচন নিয়ে ইয়েল বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক জোয়ান ফ্রিম্যান লিখেছিলেন, ১৮০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এতটা অমঙ্গলজনক, জঘন্য ও সংকটময় ছিল যে জাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের ভোট প্রক্রিয়ায় মৌলিক সাংবিধানিক ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। পরে ১৮০৬ সালে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আলাদা ভোটদানের ব্যবস্থা করা হয়।
সেবারের নির্বাচনী জের ধরে মার্কিন সংবিধান সংশোধন করা হলেও তিন বছর পর আরও এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সূত্রপাত হয়। থমাস জেফারসন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী অ্যারন বারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট না হতে পারার দুঃখ তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না। পক্ষে না থাকায় আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের ওপর তিনি খুব ক্ষিপ্ত ছিলেন। এই ক্ষোভ থেকেই ১৮০৪ সালের ১১ জুলাই তিনি হ্যামিলটনের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এক মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। এই লড়াইয়ে অ্যারন বারের গুলিতে প্রাণ হারান আলেকজান্ডার হ্যামিলটন।
১৮২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
মার্কিন ইতিহাসে এই নির্বাচনটিকে অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তত দিনে আমেরিকার ফেডারেলিস্ট পার্টির বিলুপ্তি ঘটেছে। তাই নির্বাচনে অংশ নেওয়া চার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর প্রত্যেকেই ছিলেন ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান পার্টির।
এই নির্বাচনে ১৮১২ সালের যুদ্ধের নায়ক অ্যান্ড্রু জ্যাকসন সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পেয়েছিলেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩৯ হাজার। এ ছাড়া ইলেকটোরাল ভোটেও জ্যাকসন সর্বোচ্চ ৯৯টি ভোট পেয়েছিলেন। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কুইন্সি অ্যাডামস ৮৪টি, ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম ক্রফোর্ড ৪১টি ও হাউজ স্পিকার হেনরি ক্লে ৩৭টি ইলেকটোরাল ভোট পান। ফলে কোনো প্রার্থীই পর্যাপ্ত সংখ্যক ইলেকটোরাল ভোট পেতে সক্ষম হননি। আবারও ফলাফল নির্ধারণের জন্য হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের শরণাপন্ন হতে হয়।
এক মাস ধরে দর-কষাকষির পর ক্লের সমর্থকরা জন কুইন্সি অ্যাডামসের পক্ষে ভোট দেন। ফলে তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে কেন্টাকিতে সাধারণ মানুষের একটি ভোটও পাননি কুইন্সি। কিন্তু দেখা যায়, ক্লের বদৌলতে কেন্টাকির ইলেকটোরাল ভোটও পেয়ে গেছেন কুইন্সি। প্রেসিডেন্ট পদে অভিষেকের পর কুইন্সি যখন হেনরি ক্লেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন, তখন ক্রুদ্ধ অ্যান্ড্রু জ্যাকসন এটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত দর-কষাকষির নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করে সিনেট থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৮২৮ সালের পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।
নিজের প্রতিজ্ঞায় অবিচল অ্যান্ড্রু জ্যাকসন চার বছর পর ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হয়ে ন্যাশনাল রিপাবলিকান পার্টি থেকে দাঁড়ানো জন কুইন্সি অ্যাডামসকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৮৬০ সালে দ্বিধাবিভক্ত জাতি
১৮৬০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেবল বিতর্কিতই বলা যাবে না, এটি মার্কিন জাতিকে দ্বিধাবিভক্তও করে ফেলেছিল। এ সময় রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। তিনি দাসপ্রথার বিরোধী ছিলেন। ফলে দাসপ্রথার পক্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ রাজ্যের ব্যালটে তার নামই ছিল না।
এদিকে, ডেমোক্রেটিক পার্টি সিনেটর স্টিফেন ডগলাসকে তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করে। দুই বছর আগে ১৮৫৮ সালে এই ডগলাসের কাছেই ইলিনয়ের সিনেট নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। নিজেদের প্রার্থী নিয়েও দ্বিধাবিভক্ত ছিল ডেমোক্রেটিক শিবির। ডগলাসকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোর শাখা ভাইস প্রেসিডেন্ট জন ব্রেকেনরিজকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এ অবস্থায় ডগলাস ও ব্রেকেনরিজ দুজনই নিজেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রকৃত প্রার্থী বলে দাবি করতে থাকেন।
এই নির্বাচনে লিঙ্কন শতকরা ৪০ ভাগ পপুলার ভোট পান। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া ও অরেগন অঙ্গরাজ্যসহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ ইলেকটোরাল ভোট তিনি জয় করেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের ১৮০টি ইলেকটোরাল ভোটের বিপরীতে স্টিফেন ডগলাস মাত্র ১২টি পেয়েছিলেন। এই নির্বাচনে পপুলার ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ইলেকটোরাল ভোটে ব্রেকেনরিজের চেয়েও পিছিয়ে পড়েছিলেন ডগলাস। নির্বাচনে পপুলার ভোটে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও ৭২টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছিলেন ব্রেকেনরিজ।
নির্বাচনে লিঙ্কন জয়ী হওয়ার সপ্তাহখানেক পরেই সাউথ ক্যারোলাইনা রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার জন্য ভোট দেয়। দক্ষিণাঞ্চলের আরও ছয়টি রাজ্য সাউথ ক্যারোলাইনাকে অনুসরণ করে। ১৮৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা আলাদা ‘কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা’ গঠন করে এবং জেফারসন ডেভিসকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। এ অবস্থা শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
১৮৭৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
১৮৭৬ সালের নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী ও ওহাইওর গভর্নর রাদারফোর্ড বি হেইস। এই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করা হয়েছিল নিউ ইয়র্কের গভর্নর স্যামুয়েল টিলডেনকে। নির্বাচনি প্রচারণায় উভয় পার্টি একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। তবে নির্বাচনে টিলডেন জয়লাভ করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।
অ্যারি হুগেনবুম তার ‘রাদারফোর্ড বি হেইস : ওয়ারিয়র অ্যান্ড প্রেসিডেন্ট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নির্বাচনের রাতে হেইস যখন ঘুমুতে যান, তখনো পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ভোটে তার পরাজয় ঘটবে।’
ভোটের গণনায় প্রত্যাশিত চিত্রই ফুটে ওঠে। দেখা যায়, টিলডেন পপুলার ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ইলেকটোরাল ভোটেও তিনি রাদারফোর্ড বি হেইসের চেয়ে অনেক ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু সমস্যাটি ছিল টিলডেন ১৮৪টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তার আরও একটি ভোটের প্রয়োজন ছিল। এদিকে সাউথ ক্যারোলাইনা, অরেগন, ফ্লোরিডা ও লুইসিয়ানার আরও ২০টি ইলেকটোরাল ভোট গণনা তখনো বাকি ছিল। ফলে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, খুব সহজেই প্রয়োজনীয় আর একটি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন টিলডেন। সে সময় ১৬৫টি ইলেকটোরাল ভোট পাওয়া হেইসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল না।
এদিকে, এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কে বিজয়ী হচ্ছেন তা স্পষ্ট করা যায়নি। ফ্লোরিডায় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে কে বিজয়ী হয়েছে তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডেমোক্রেটিকদের ব্যালটে রিপাবলিকানদের প্রতীক দিয়ে ছাপানো হয়েছিল, যাতে অশিক্ষিত ভোটারদের প্রভাবিত করা যায়। উভয় পার্টিই ভোট জালিয়াতিতে জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
এ অবস্থায় দুই পার্টির মধ্যস্থতায় নির্বাচনী ফল ঘোষণার জন্য ১৫ জনের একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনে সাতজন ছিলেন ডেমোক্রেটিক সমর্থক, সাতজন ছিলেন রিপাবলিকান সমর্থক ও বাকি একজন ছিলেন নিরপেক্ষ। জানা যায়, নিরপেক্ষ হিসেবে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ডেভিড ডেভিসের কারসাজিতেই সর্বশেষ সাউথ ক্যারোলাইনা, অরেগন, ফ্লোরিডা ও লুইসিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সবগুলো তথা ২০টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান হেইস। মাত্র একটি ইলেকটোরাল ভোট পেতে ব্যর্থ হয়ে পপুলার ভোটে এগিয়ে থেকেও হেইসের কাছে পরাজিত হন টিলডেন।
কারাগার থেকে প্রচারণা
সেবারের নির্বাচন ছিল দুই পত্রিকা প্রকাশকের মধ্যে। নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ওয়ারেন জি হার্ডিং ডেমোক্রেটিক দল মনোনীত প্রার্থী জেমস কক্সকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। নির্বাচনে ৬০ শতাংশ পপুলার ভোটসহ ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৭টি রাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট তিনি পেয়েছিলেন। নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জেমস কক্স হারলেও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন তৃতীয় আরেকজন প্রার্থী ইউজেন ডেবস। তিনি আমেরিকার সোশ্যালিস্ট পার্টি থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
শুধু ১৯২০ সালের নির্বাচনই নয়, এর আগে ১৯০০, ১৯০৪, ১৯০৮ ও ১৯১২ সালের নির্বাচনেও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন ইউজেন ডেবস। ১৯১২ সালের নির্বাচনে ৬ শতাংশ পপুলার ভোট তথা ৯ লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি।
১৯২০ সালের নির্বাচনে পঞ্চমবারের মতো অংশ নেন ইউজেন ডেবস। সে বছর তার নির্বাচনী প্রচারণার হেডকোয়ার্টার ছিল জেলখানা। কারণ ডেবস তখন জেলখানায় বন্দি ছিলেন। ১৮৯৪ সালে রেললাইন অবরোধ ছাড়াও ১৯১৮ সালে যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য দিয়ে তিনি মার্কিন সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয় এবং বিচারে তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। তার মুক্তির দাবিতে সমর্থকরা আন্দোলন শুরু করলে ১৯১৯ সালের মে দিবসে তা দাঙ্গায় পরিণত হয়। এ অবস্থায় ডেবসকে আটলান্টার ফেডারেল কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এই কারাগার থেকেই পরের বছর নির্বাচনে অংশ নেন তিনি এবং সেখান থেকেই নির্বাচনী প্রচারণার দিকনির্দেশনা চালান। ১৯২০ সালের নির্বাচনেও তিনি ৯ লাখের বেশি পপুলার ভোট পেয়েছিলেন। তবে, নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী ওয়ারেন জি হার্ডিংয়ের ধারেকাছেও ছিলেন না তিনি। পরের বছরের ক্রিসমাসে নিজ ক্ষমতাবলে ডেবসের সাজা মওকুফ করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি হার্ডিং।
২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
আমেরিকার বিতর্কীত নির্বাচনের মধ্যে ২০০০ সালের নির্বাচনকে অনেকেই উদাহরণ হিসেবে টানেন। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবেও এটিকে উল্লেখ করা হয়। ভোট গণনা নিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র বিবাদের সূচনা হয় সেবার।
দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এতটা কম আর কখনো ছিল না। নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে এক মাস ধরে চলছিল অনেক নাটকীয় ঘটনা। সেবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন আল গোর। আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। কিন্তু নভেম্বরের ৭ তারিখে ভোটের দিন পর্যন্ত এই নির্বাচনে কে জিতবে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। কারণ জনমত জরিপে দুজনের ব্যবধান ছিল খুবই কম।
২০০০ সালে ফ্লোরিডার ইলেকটোরাল কলেজ ভোট ছিল ২৫টি। তাই সেবার নির্বাচনে অন্য সব রাজ্যের ফলে যখন দুই প্রার্থীর ব্যবধান খুবই কম, তখন ফ্লোরিডাতেই এই নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল। নির্বাচনের দিন রাত আটটার সময় বড় কয়েকটি টিভি নেটওয়ার্ক ঘোষণা করে বসে, ফ্লোরিডায় জিতেছেন আল গোর। তার মানে তিনিই প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তারপরই আল গোরের কাছে ফোন আসতে লাগল তার ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের কাছ থেকে। ক্যাম্পেইন ম্যানেজার বলছিলেন, এই ফলাফল বারবার পাল্টে যাচ্ছে। এবার টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো উল্টো ফল ঘোষণা করতে লাগল। তারা বলল, ফ্লোরিডায় ৩০০ ভোট বেশি পেয়ে আসলে জিতেছেন জর্জ ডব্লিউ বুশ।
বিবাদ চলতে থাকায় ফ্লোরিডার আদালতে শুরু হয় কয়েক সপ্তাহ ব্যাপী এক আইনি লড়াই। পুরো দেশ এবং পুরো বিশ্ব তখন অপেক্ষা করছে- কে হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। ফ্লোরিডার বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় ভোট পুনর্গণনা। রিপাবলিকানরা চাইছিল ভোট পুনর্গণনার কাজটি যেন থামানো যায়। ভোটের ফলাফল শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আদালত ভোটের প্রথম ফলকেই সঠিক বলে রায় দিল। অর্থাৎ ফ্লোরিডায় জর্জ ডব্লিউ বুশই জিতেছেন।