দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবারই প্রথম পৃথিবী এক সন্ত্রস্ত পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সব নিশ্চয়তাকে অনিশ্চয়তায় রূপান্তরিত করেছে করোনাভাইরাস মহামারী। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের নির্বাচনকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত সব প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারী। তার পদক্ষেপে গোটা বিশ্বে অসন্তোষ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পদচারণা বিশ্বের অন্য সব নেতার চেয়ে বেশি। তবে ট্রাম্পকে যতই বিভেদ সৃষ্টিকারী বলা হোক না কেন, বিশ্বে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে পছন্দ করেন।
চার বছর আগে ডেমোক্র্যাট নেতা হিলারি ক্লিনটনকে অল্প মার্জিনে হারিয়ে ক্ষমতায় বসেন ট্রাম্প। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হওয়া অধিকাংশ জরিপেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। আমেরিকার বাইরে ট্রাম্পকে হাস্যরসাত্মক দৃষ্টিতে দেখানো হলেও নিজের দেশে তিনি কম জনপ্রিয় নন। ট্রাম্পের কথা বলাতে আলোচনায় আসে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের নাম। অভিনেতা রেগ্যান ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হন। ক্ষমতায় বসার পর তার আক্রমণাত্মক চরিত্রে ভীত হয়ে পড়েছিল আমেরিকাবাসী। কিন্তু তার আমলেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মাধ্যমে তিনি শীতল যুদ্ধের অবসান করেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদক জেরাল্ড এফ. সেইব রেগ্যান থেকে ট্রাম্পকে আমেরিকার রাজনৈতিক বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলো বৈশ্বিক আবহাওয়াকে অতটা প্রভাবিত করেনি। কিন্তু এবার তা নয়, কারণ এমন অনেক ঘটনা এখনো অমীমাংসিত রয়েছে যা ট্রাম্প ঘটিয়েছেন। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ট্রাম্পের জন্য। জলবায়ু সংকট, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মতো ঘটনার এখনো সুরাহা হয়নি। ট্রাম্প যদি আবারও ক্ষমতায় বসেন, তাহলে বিগত চার বছরের তুলনায় তিনি আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবেন এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব কিছুর মধ্যে আমেরিকার ক্ষতি হয়েছে বৈশ্বিক নেতৃত্বের জায়গা থেকে ছিটকে পড়ে।
ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় বসার পর সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ঝামেলা মেটাতে রেক্স টিলারসনকে তলব করেন ট্রাম্প। কূটনৈতিক অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে, রাশিয়ার মতো দেশও বলতে বাধ্য হয়, তারা জানেন না যুক্তরাষ্ট্রের কার (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) সঙ্গে তারা আলোচনা করবেন। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি যে নাজুক অবস্থায় পড়েছিল তার প্রমাণ ২০১৭ সালে হামবুর্গে জি-২০ সম্মেলনে সিরিয়ায় যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে। ট্রাম্প ক্রেমলিনের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির শিকার হন।
যুক্তরাষ্ট্র গত চার বছরে তার অনেক মিত্র হারিয়েছে। এখনো যে মিত্ররা তাকে ঘিরে আছে তারাও দোদুল্যমান। ২০১৭ সালে ভিয়েতনামে এপিইসি সম্মেলনে ট্রাম্প মিত্র নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি সবসময়ই আমেরিকাকে এগিয়ে রাখব। একই ভাবে এই রুমের সবাইকে বলব আপনারাও আপনাদের দেশকে এগিয়ে রাখবেন। আমরা আর ক্রমাগত বাণিজ্যিক সন্ত্রাস সহ্য করতে পারব না, আমরা তাদের (চীন) সহ্য করব না।’
উত্তর কোরিয়ার চেয়ারম্যান কিম জং উনের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে ব্যর্থ ট্রাম্প। কয়েক দফায় বৈঠক করে উভয় দেশের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের অবসানের চেষ্টা চালিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্পের কারণে সর্বশেষ বৈঠকও ভেস্তে যায় এবং লাভবান হয় উত্তর কোরিয়া।