মার্শালের বল এক টেস্টেই থামিয়ে দিয়েছিল লয়েডকে

ক্রিকেট ইতিহাসে অপরাজিত থাকা একমাত্র টেস্ট ওপেনার কে?

টিমোথি অ্যান্ড্রু লয়েড। তার মতো হতভাগা ব্যাটসম্যান দ্বিতীয়টি নেই। টেস্ট খেলার জন্য ২৭ বছর অপেক্ষা করেন। ১৯৮৪ সালে অপেক্ষার অবসান। আধাঘণ্টা উইকেটে ছিলেন। এরপর ম্যালকম মার্শালের বাউন্সারে সোজা হাসপাতালে। মারাও যেতে পারতেন। বরাত জোরে বেঁচেছিলেন। আজ তার ৬৪তম জন্মদিন। ১৯৫৬ সালের এই দিনে শ্রপশায়ারে জন্মেছিলেন লয়েড।

চুরাশির উইন্ডিজ কালজয়ী পেস বোলারদের নিয়ে দিগি¦জয়ে বেরিয়েছিল। মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল, জোয়েল গার্নাররা তখন ফর্মের চূড়ায়। ইংল্যান্ড সফরে রক্তপিপাসু হয়ে ওঠেন। প্রথম টেস্ট হয়েছিল এজবাস্টনে। যেখানে ওয়ারউইকশায়ারের ২৭ বছর বয়সী বামহাতি ওপেনার লয়েডের অভিষেক। টেস্ট খেলতে নামার আগে উইন্ডিজের বিরুদ্ধে তিন ওয়ানডেতে ভালো করেন, ‘একদিনের ম্যাচে আমি বেশ ভালো খেলি। আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।’ এজবাস্টনে টস জিতে আগে ব্যাটিং নিয়েছিল ইংল্যান্ড। ওপেনার গ্রায়েম ফাওলার ও ডেরেক র‌্যান্ডাল কোনো রান করতে পারেননি। শুরুতেই ২ উইকেট হারিয়ে ভুগতে থাকে ইংল্যান্ড। চার ওভার পরেই ব্যাট হাতে নামতে বাধ্য হন অধিনায়ক ডেভিড গাওয়ার। ওপেনার লয়েডকে নিয়ে তিনি ক্যারিবিয়ান পেসারদের গোলা সামলাতে থাকেন। ২০ রানের জুটিও গড়েন। এরপরই ঘটে ভয়ংকর সেই ঘটনা।

লয়েড তখন ১০ রানে। বল করছিলেন মার্শাল। দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা একটি বল হেলমেট এড়িয়ে লয়েডের কপালে লাগে। কী ঘটেছিল শুনুন তার মুখেই, ‘আমার ধারণা মতোই সে শর্ট পিস বল দিয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা বাম কাঁধের ওপর দিয়ে যাবে। নিচুও হয়েছিলাম। কিন্তু বলটা প্রত্যাশামতো বাউন্স করেনি। সোজা আমার কপালের ডান পাশে লাগে।’ উইকেটে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন লয়েড। ফিল হিউজ তবু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। লয়েড এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা এমন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দেন। তবে বেঁচে যান লয়েড। যদিও তার ডান চোখের ৩৫ শতাংশ জ্যোতি হারিয়ে ফেলেন।

জীবন সংশয় কাটিয়ে ফেরার পর লয়েড আর কোনো টেস্ট বা ওয়ানডে খেলেননি। তবে ওয়ারউকশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত নেতৃত্বও দেন। এরপর মধ্য নব্বইয়ে ডারমট রিভের বিখ্যাত দলের হয়েও খেলেছেন লয়েড। ৩১২ প্রথম শ্রেণি ম্যাচে ৩৪.২৮ গড়ে তার রান ১৭২১১। সেঞ্চুরি করেছেন ২৯টি। বলতেই হবে টাইগার পাতৌদির মতো এক চোখ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভালোই ব্যাট করেছেন। পরে ওয়ারউইকশায়ার ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন লয়েড।

একই দিনে, মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে জীবনের আলো-অন্ধকার দুইই দেখেছিলেন তিনি। ২৭ বছর অপেক্ষার পর খেলতে নেমেছিলেন টেস্ট। তবু এজবাস্টনের দিকে ফিরে তাকিয়ে আফসোস করেন না, ‘সেই ঘটনা না ঘটলে কী হতো তা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। টেস্ট ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য আমি ক্যারিবিয়ান পেসারদের দোষ দিই না। ওটা ছিল খেলারই অংশ। হাসপাতালে ক্লাইভ লয়েড আমাকে দেখতে এসেছিল। পরে মার্শাল এসে আমার স্বাস্থ্যের খোঁজ নেয়। যে উইন্ডিজ দলটার বিপক্ষে আমরা খেলেছিলাম, তার প্রতিটা ক্রিকেটার- হোল্ডিং, গার্নার, হেইন্স, ভিভ, গোমস, ডুজনন্ড সবাই মানুষ হিসেবেও অসাধারণ।’

লয়েড তবু জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন এই ভেবে যে তার অবস্থা ফিল হিউজের মতো হয়নি। তিনি তবুও সেকেন্ড চান্স পেয়েছিলেন। ক্রিকেট বিধাতা ফিল হিউজকে দ্বিতীয় সুযোগ দেননি। এই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর শেফিল্ড শিল্ডের এক ম্যাচে প্রতিপক্ষ ফাস্ট বোলারের বলের আঘাতে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।