করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে হ্যান্ডসেটভিত্তিক আর্থিক সেবার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ লাখ। এ সময় লেনদেন বেড়েছে ৩২ হাজার ৬৩ দশমিক ৪১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে এমএফএস অপারেটরদের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯ কোটি ৪৮ লাখ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৮৮ লাখ। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেন হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৪ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা, যা এপ্রিল-জুন সময়ের চেয়ে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ওই প্রান্তিকে লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪৬১ দশমিক ৮ কোটি টাকা।
এমএফএস অপারেটররা বলছেন, ব্যাংকভিত্তিক লেনদেনের পরিবর্তে মোবাইল আর্থিক সেবা সুবিধাজনক হওয়ার কারণে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পরে জনসাধারণের মধ্যে এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেনে আগ্রহ বেড়ে যায়। তারা আরও জানিয়েছেন, করোনা বিস্তার শুরুর পর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেতনভাতা প্রদান ও অনলাইনে কেনাকাটা বৃদ্ধি এমএফএসে গ্রাহক সংখ্যা বাড়তে সহায়তা করেছে। এ সেবার ব্যবহার বৃদ্ধিতে এমএফএস গ্রাহকদের জন্য আরও সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৭ অক্টোবর এমএফএস গ্রাহকদের জন্য আন্তঃব্যাংক লেনদেন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা থাকলেও প্রযুক্তিগত জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারে জানিয়েছিল, যেসব ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেন পরীক্ষামূলকভাবে সম্পন্ন হয়েছে, এখন কেবল তারাই এই সেবা দিতে পারবে। বাকিদের আগামী বছরের মার্চের মধ্যে অবশ্যই এই সেবা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয় ওই সার্কুলারে।
ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এই সেবা চালুর জন্য প্রস্তুত ছিল। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান চারটি হলো ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ইউক্যাশ, ইসলামী ব্যাংকের এমক্যাশ ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ই-ওয়ালেট। এই মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে টাকা পাঠানোর সেবা গতকাল থেকে চালুর কথা ছিল। এর বাইরে পূবালী ব্যাংকের হিসাব থেকে এই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার হিসাবধারীদের সঙ্গে লেনদেন করার জন্যও ব্যাংকটি প্রস্তুত ছিল। আন্তঃব্যাংক লেনদেন সেবা চালুর জন্য এখনো নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ এমএফএস হিসাব খোলার পদ্ধতি সহজ করেছে। গ্রাহকের সুবিধার্থে বিভিন্ন জায়গায় পেমেন্ট পয়েন্ট বাড়ানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। নগদে পেমেন্ট প্রক্রিয়া জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে। আর এটি আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া ডিজিটাইজ করতে সহায়তা করছে। আর্থিক সেবা ডিজিটাইজেশনে সরকারকে সহায়তা করছে নগদ। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে এমএফএসে লেনদেনর পরিমাণ আরও বাড়বে। নগদে প্রথম ১ হাজার টাকা ক্যাশ আউটে চার্জ না নেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের সেটেলমেন্ট চার্জ শূন্য করার মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নগদ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের লেনদেন খরচ কমিয়ে ৬ টাকায় নিয়ে এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় মৎস্য, ডেইরি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারের নেওয়া উদ্যোগে সহায়তা করতেই এ ব্যবস্থা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক লেনদেন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ লিমিটেড জানিয়েছে, ঈদুল আজহার সময় অর্থ স্থানান্তর, মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং রেমিট্যান্স প্রাপ্তিসহ নিয়মিত লেনদেন আরও বেড়েছে। এছাড়া বেতনভাতা, বোনাস ও সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বণ্টনও জুলাইয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সহায়তা করেছে। আগস্টে বিকালে আর্থিক লেনদেন কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরে আবার বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এমএফএসে সক্রিয় গ্রাহক সংখ্য ১ দশমিক ৬৯ কোটি বা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৩ কোটিতে। এ সংখ্যা জুনে ছিল ২৫ দশমিক ৬১ কোটি। গত প্রান্তিকে এমএফএস আমানতের পরিমাণ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের চেয়ে বেড়েছে ২০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৪ হাাজার ৭২৩ দশমিক ৩৪ কোটি টাকা। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে যা ছিল ১২ হাজার ১৯৯ দশমিক ৭১ কোটি টাকা। ব্যক্তিপর্যায়ে লেনদেন ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়ে ঠেকেছে ১৪ হাজার ৮৫৭ দশমিক ৮ কোটি টাকায়। জুনে যা ছিল ১৩ হাজার ১৩০ দশমিক ৩ কোটি টাকা।