করোনাভাইরাসের মধ্যেই গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভোট গণনা চলছে। রোহিঙ্গাদের ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত করায় ইতিমধ্যে এ নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অবহিত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইট ওয়াচ। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনেও দেশটির বর্তমান স্টেট কাউন্সিলর অং সাং সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনডিএ) বড় ব্যবধানে জয়লাভ করতে যাচ্ছে। তবে সরকারে সু চি থাকুক বা না থাকুক; রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তারা এ-ও বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট সু চিকে জয়লাভে আরও সহায়তা করবে। যদিও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আশা প্রকাশ করেছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ আরও প্রশস্ত হবে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সু চিকে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে সহায়ক হবে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। তবে তিনি নির্বাচিত হোন বা না হোন; প্রত্যাবাসন বিষয়ে সু চি আমাদের কোনো সহায়তা করতে পারবেন না। এ সমস্যা আন্তর্জাতিকভাবেই সমাধান করতে হবে।’
এদিকে নির্বাচনের মধ্যেই গত শনিবার নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) গুলিতে এক বাংলাদেশি জেলে নিহত হয়েছেন। মোহাম্মদ ইসলাম (৩৫) নামে ওই ব্যক্তি ওইদিন রাত ১১টায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সদস্য নজির আহমদ বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যায় তিন জেলে কাঠের নৌকা নিয়ে নাফ নদীতে মাছ ধরতে যান। কিছুক্ষণ পর মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় মোহাম্মদ ইসলামের পেটে গুলি লাগে। পরে অন্য জেলেরা তাকে উদ্ধার করে টেকনাফ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে রাত ১১টার দিকে মারা যান ইসলাম।’
সাড়ে পাঁচ কোটি জনগণের মধ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখের কিছু বেশি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ১৭১টি জাতীয়, রাজ্য ও আঞ্চলিক আসনে ৯০টি দলের ৫ হাজার ৬৪৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটগ্রহণের জন্য সারা দেশে ৫০ হাজার ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। দেশটির উচ্চকক্ষে আসন সংখ্যা ২২৪টি এবং নিম্ন কক্ষে আসন রয়েছে ৪৪০টি। গত ২০১৫ সালের নির্বাচনে দেশটির বর্তমান স্টেট কাউন্সিলর অং সাং সু চি (৭৫) বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। ২০১১ সালে ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর সেটিই ছিল প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে সু চি বিজয়লাভ করলেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতা চালাতে হয়েছিল। এবারও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচনে করছে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনডিএ)।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে আরাকান রাজ্যের বিতর্কিত এলাকাসমূহকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভোটগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়। ওই এলাকায় মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বসবাস করে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস বলছে, এ নির্বাচন প্রকাশ্য ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। নিরাপত্তার কারণেই আরাকান অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আশা প্রকাশ করেছেন, মিয়ানমারের নির্বাচন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী নিরাপদ ও মর্যাদা সহকারে মিয়ানমারে ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত হবে।’
দেশটিতে সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থা চালু হলেও সেনাবাহিনী এখনো সেখানে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রক। পার্লামেন্টের মোট সদস্যের চার ভাগের এক ভাগ আসন তাদের জন্য নির্ধারিত। এ নিয়ে সেনাবাহিনী ও সু চি সরকারের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। কয়েক দিন আগে দেশটির জেনারেল গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, প্রশাসন ‘অপ্রত্যাশিত ভুল’ করেছে। সেনাবাহিনীর এমন ক্ষমতায় ক্ষুব্ধ দেশটির বিরোধী দলসহ সাধারণ নাগরিকদের বড় একটি অংশ। দেশটির কাচিন স্টেট পিপলস পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান বলেছেন, সেনা শাসনের অবসান ঘটলেও এ অঞ্চলের পরিবর্তন আনতে তারা (সু চি) ব্যর্থ হয়েছে। সেনাবাহিনী ক্ষমতার কেন্দ্রে। পাঁচ বছর কম সময় নয়। অথচ এনডিএল কিছুই করতে পারেনি।
সু চির বিরোধী দলখ্যাত ইউএসডিপি এ নির্বাচনে বেশ জোরেশোরে প্রচার চালিয়েছে। ২০১০ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একতরফা নির্বাচনে জয়ী হওয়া এই দলটি সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত। তারা মিয়ানমারে বাঙালি মুসলমান আছে এবং এনডিএল এদের আশ্রয় দিয়েছে বলে জোর প্রচার চালিয়েছে। মিয়ানমারে সাধারণত রোহিঙ্গাদের বোঝাতে ‘বাঙালি মুসলমান’ এ শব্দ যুগল ব্যবহার করা হয়। যদিও নির্বাচনে ইউএসডিপির বিজয়ের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মিয়ানমারের নেত্রী সু চি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছিলেন। ২০০৩ সালে তাকে গৃহবন্দি করে দেশটির সামরিক সরকার। এরপর সাত বছর পর ২০১০ সালে তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয় সুইডিশ নোবেল কমিটি। ২০১১ সালে সামরিক সরকার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়ার পর ২০১৫ সালে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। নির্বাচনে সু চির দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে সামরিক সরকারের সঙ্গে আপস করেই তাকে ক্ষমতায় বসতে হয়। সু চি ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশ-বিদেশে তার বন্দনা করা হয়। কিন্তু সেই ধারা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি।
সু চি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা সংকট তীব্র হতে শুরু করে। ২০১৬ সালে দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালায়। তখন অনেক রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর পুরো রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন শুরু করে সেনাবাহিনী। এ সময় তারা ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে। সরকার মানবিক বিবেচনায় তাদের কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্প স্থাপন করে আশ্রয় দেয়। সেই সময়ে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সারা বিশ্ব থেকে নিন্দার ঝড় উঠলেও আমলে নেয়নি সু চি প্রশাসন। প্রতিবাদে অনেক সংস্থা ও সংগঠন সু চিকে দেওয়া সম্মাননা তুলে নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমার সরকার ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে।