চলতি অর্থবছরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর আওতয় বরাদ্দ রয়েছে ৪৮৪ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে মোট বরাদ্দে মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু প্রকল্পের পূর্তকাজে চলছে অনিয়ম। এসব মানহীন কাজ নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়াতে প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশব্যাপী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে শর্টসার্কিট ও প্রাণহানি ঘটছে। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান খারাপ হলে পিডিদের দায় নিতে হবে।
সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের মাসিক এডিপি পর্যালোচনা সভায় এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া। সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপিতে এ মন্ত্রণালয়ের অধীন মোট ৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওই সব প্রকল্পের অনুকূলে মোট ৪৮৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের জাতীয় অগ্রগতি ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। কিন্তু এ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ, যা জাতীয় অগ্রগতির তুলনায় অনেক কম। এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ তাত বোর্ড, বাংলাদেশ রেশম বোর্ড, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চলমান প্রকল্পের অনুকূলে কোনো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
সভায় বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম সরজমিন পরিদর্শনকালে প্রকল্পের পূর্ত নির্মাণকাজের নিম্নমান পরিলক্ষিত হয়েছে, যা অত্যন্ত অসন্তোষজনক। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় মূলধনি যন্ত্রপাতি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বর্ণিত স্পেসিফিকেশন ও কান্ট্রি অব অরিজিন অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কান্ট্রি অব অরিজিন এবং পোর্ট অব এন্ট্রি নিশ্চিত করতে হবে। যন্ত্রপাতি কোথা থেকে তৈরি এবং ব্র্যান্ডের নামের টিকাও যাচাই করতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় আসবাব ক্রয়ের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রকল্প পরিচালক ও দপ্তর বা সংস্থার প্রধানদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। প্রয়োজন হলে কার্যাদেশ প্রদানের আগেই মন্ত্রণালয় এবং দপ্তর সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠনপূর্বক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সভায় বলা হয়, প্রস্তাবিত সংশোধিত ডিপিপিতে অনেক ক্ষেত্রেই মূল অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে।পূর্ত নির্মাণকাজে ব্যয় প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে অনেক অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় কোনো অবস্থাতেই বৃদ্ধি করা যাবে না। প্রয়োজন হলে অনুমোদিত প্রকল্পের কোনো অঙ্গের ব্যয় বা অর্থ সাশ্রয় করে তা অন্য অঙ্গে ব্যয় করতে হবে। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপির বাইরে কোনো কাজ না করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। অনুমোদিত ডিপিপির বাইরে কোনো কাজ করা হলে তার জন্য প্রকল্প পরিচালক নিজে দায়ী থাকবেন বলেও সভায় হুঁশিয়ার করা হয়।
সভার কার্যপত্রে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামÑ যেমন কেব্ল, বৈদ্যুতিক সকেট, প্লাগ ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্পের নির্মিত ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুণগত মান সম্পন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেব্ল, সকেট ও প্লাগ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ভবনের টাইলস ও অন্যান্য ফিটিংয়ের কাজের বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, করোনার কারণে প্রকল্পের কাজের গতি কমে গিয়েছিল। এখন তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মানও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কোনো অনিয়ম ও ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভবনের টাইলস ও অন্যান্য ফিটিংসের কাজের বিষয়টি প্রকল্প পরিচালকরা নিবিড় তদারকি করবেন। এসব কাজের ভিডিওচিত্র ও স্থিরচিত্র মাসিক এপিপি পর্যালোচনা সভা ও স্টিয়ারিং কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। কোনো প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হলে তার দায়িত্বভার হস্তান্তরের আগে সব কার্যাবলি সম্পর্কিত বিস্তারিত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দপ্তর সংস্থার প্রধানের কাছে দাখিল
করবেন। প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি মন্ত্রণালয়ে জমা করতে হবে। প্রকল্প পরিচালক এবং দপ্তর বা সংস্থা এখন নিয়মিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করবে। প্রকল্প পরিচালক প্রতি মাসে অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিন প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করবেন। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের পরিদর্শন প্রতিবেদন সংস্থাপ্রধানের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। কোনো প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বৃদ্ধি অত্যাবশ্যক হলে তা জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে।