ইমান ও ইসলাম মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এই নেয়ামত আমরা লাভ করেছি রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনি না এলে আমরা ইমানের আলো এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ পেতাম না। কুফরের অন্ধকার ও শিরকের কদর্যতায় ডুবে থাকতাম। বর্বর আচরণ, নির্মম অত্যাচার ও সীমাহীন নির্যাতন সয়ে সয়ে হেদায়াতের আলোক পৌঁছে দিয়ে নবীজি আমাদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। কাজেই রাসুল (সা.)-কে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা এবং তার ভালোবাসার অধিকার রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও ইমানি দায়িত্ব। মুসলমান হিসেবে ও উম্মত হিসেবে আমাদের প্রতি তার এমন কিছু অধিকার রয়েছে, যা ঠিকভাবে আদায় না করলে প্রকৃত মুসলমান হওয়া অসম্ভব।
নবুয়তের প্রতি ইমান
তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। তারপর আর কেউ কোনো নামেই নবী ও রাসুল হিসেবে আসবেন না। তিনি পবিত্র চরিত্রের অধিকারী নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ। তার মাধ্যমে আগের সব কিতাব ও শরিয়ত রহিত হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী সব কিতাব ও শরিয়ত এবং নবী ও রাসুলকে সত্য বলে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু অনুসরণ করি কেবলই কোরআনি নির্দেশনা ও শেষনবী মোহাম্মদ (সা.)-কে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুল এবং যে জ্যোতি আমি অবতরণ করেছি তার ওপর ইমান আনয়ন করো।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত : ৮)
আনুগত্য
নবীজির নবুয়ত ও রিসালতের প্রতি বিশ্বাসের অনিবার্য দাবি হলো, তার প্রতিটি কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বার্তা হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা। সেই সঙ্গে প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মাথা পেতে মেনে নেওয়া। সুতরাং কেউ যদি বলে আমি বিশ্বাস করি তিনি শেষ নবী ও শ্রেষ্ঠ রাসুল। তবে পরকাল নিয়ে তার এই কথাটা যুক্তিতে ধরছে না বা যুক্তিবিরোধী বলে বিশ্বাস করছি না কিংবা মানতে কষ্ট হচ্ছে অথবা তার অমুক আদেশ বা নিষেধটা এ সময়ে প্রাসঙ্গিক নয় বলে গ্রহণ বা বর্জন করতে পারব না– তাহলে এটা হবে স্পষ্টত কুফুর ও বিরোধিতা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘রাসুল তোমাদের যা আদেশ করেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত হও।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৭)
কোরআন বারবার জোর দিয়ে বলেছে, রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদার! আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা অভিভাবক তাদের। তারপর যদি কোনো বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ো, তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ফিরে এসো, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো। (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৯)
কথা-কাজে অনুসরণ
তিনি আমাদের বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবনের সব কাজে-কর্মে ও বর্জনে তার জীবনাদর্শই আমাদের পাথেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসুল (সা.)-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)
প্রতিটি মুসলিমের জন্য তার আদর্শই পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তার অনুসরণ-ই আল্লাহপ্রেম, ক্ষমা ও মুক্তি লাভের একমাত্র পথ। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, এতে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন আর তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ তো পরম ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)
নবীজির প্রতি ভালোবাসা
তার প্রতি ও তার পরিবার-পরিজন এবং সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের নিকট নবী তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্ঠতর এবং তার স্ত্রীরা তাদের মাতা।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৬)
এক দিন ওমর (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘ওমর! যার হাতে আমার জীবন তার কসম, অবশ্যই আমাকে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে। তখন ওমর বললেন, আল্লাহর শপথ, আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়। তখন রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ ওমর, এখন ঠিক আছে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৫)
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসবে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় আমাকে ভালোবাসবে এবং আমার ভালোবাসায় আমার বাড়ির মানুষদের ভালোবাসবে। (তিরমিজি, হাদিস : ৬৬৪)
যথাযথ মর্যাদা
কোরআন ও হাদিসে তার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করা। এর বাইরে নিজের থেকে কোনো কিছু বাড়িয়ে বলা ঠিক নয়। নবীদের প্রতি অবিশ্বাস যেমন মানুষকে ধ্বংস করে; তেমনি ভক্তিতে সীমালঙ্ঘনও মানুষকে বিভ্রান্ত করে। পবিত্র কোরআন-হাদিস থেকে আমরা এমনটা জানতে পারি।
রাসুল (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, ‘খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনে মারিয়ামের ব্যাপারে যেভাবে প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা সেভাবে বাড়িয়ে আমার প্রশংসা করবে না। আমি আল্লাহর কেবল বান্দা। অতএব তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তার রাসুল। (বুখারি, হাদিস : ১২৭১)
দরুদ পাঠ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীজির প্রতি সালাত-দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনরা! তোমরাও তার প্রতি সালাত-দরুদ পাঠ করো এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম দাও।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৬)
আল্লাহর সালাত পাঠ হলো নবীজির প্রতি রহমত বর্ষণ করা। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, বিনিময়ে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহম করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৪)
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘বড় কৃপণ হলো সে, যে আমার নাম শুনল অথচ আমার প্রতি দরুদ পাঠ করল না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৬)
তার শিক্ষাদর্শ অক্ষুণ্য রাখা
সব মুসলমানই এটা বিশ্বাস করেন যে, মহানবী (সা.)-এর দিকনির্দেশনার ব্যতিক্রম করে কেউ-ই নেকি ও বরকত লাভ করতে পারবে না। তার আদর্শের ব্যতিক্রম করাই বিপদ ও ধ্বংসের কারণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব যারা তার আদর্শের ব্যতিক্রম করে, তারা যেন সতর্ক হয়, তাদের ওপর বিপর্যয় আপতিত হবে অথবা কোনো কঠিন শাস্তি তাদের ওপর নেমে আসবে। (সুরা নুর, আয়াত : ৬৩)
নবীজির অধিকারগুলো হৃদয়-নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে আদায় করতে হবে। তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার আদর্শ এখনো যে পৃথিবীর সব প্রান্তে সমানভাবে প্রার্থিত– এ বিষয়টি প্রসন্নচিত্তে মেনে নিয়ে সে মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে হবে।