মাইকোব্যাকটেরিয়াম
টিউবারকিউলোসিস নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে যক্ষ্মা হয়ে থাকে। দীর্ঘস্থায়ী, সংক্রামক ও প্রাচীন এই রোগটি যেকোনো বয়সে যে কারোরই হতে পারে। তবে যক্ষ্মারোগীর কাছাকাছি থাকেন এমন ব্যক্তি, যেমন পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, নার্স বা সেবা-শুশ্রƒষাকারীর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, মাদকাসক্তি, বার্ধক্য, অপুষ্টি ইত্যাদি যক্ষ্মার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে। যাদের রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা কম, যেমন এইডস রোগী, দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড বা ইমিউনোথেরাপি ওষুধসেবীরাও যক্ষ্মার ঝুঁকিতে রয়েছেন। নতুন রোগীদের ২.২ শতাংশ ও পুরাতন রোগীদের ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যায় মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্স বা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মারোগী। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মায় প্রচলিত বিভিন্ন ওষুধই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
কীভাবে আক্রান্ত হয় রোগী : শতকরা ৮৫ ভাগ যক্ষ্মা ফুসফুসেই হয়ে থাকে। তবে যক্ষ্মা হয় না, শরীরে এরকম অঙ্গ খুব কমই রয়েছে। ফুসফুসের আবরণী, লসিকাগ্রন্থি, মস্তিষ্ক ও এর আবরণী, অন্ত্র, হাড় এমনকি ত্বকেও হতে পারে যক্ষ্মা। যক্ষ্মার জীবাণু আসলে আমাদের চারদিকেই রয়েছে। চারপাশের পরিবেশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যক্ষ্মার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া। বিশেষত শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে ছড়ায় বলে সহজে যক্ষ্মার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় জীবাণু শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তখন এর উপসর্গ বোঝা যায় না এবং রোগও ছড়ায় না। পরবর্তী কোনো এক সময় উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে সুপ্ত যক্ষ্মা সক্রিয় যক্ষ্মায় রূপ নিতে পারে।
লক্ষণ: তিন সপ্তাহের অধিক সময় ধরে কাশি- শুকনো কিংবা কফযুক্ত, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, বুকে ব্যথা, ওজন হ্রাস, অবসাদ, অরুচি, সন্ধ্যায় বা রাতে হালকা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর (৯৯-১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) কিংবা রাতে ঘাম হলে অবশ্যই যক্ষ্মা সন্দেহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। লসিকাগ্রন্থির স্ফীতি, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, পেটব্যথা, বুকে বা পেটে পানি জমা, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে পড়া ইত্যাদিও যক্ষ্মার ভিন্ন কিছু উপসর্গ- এরকম ক্ষেত্রে যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুস থেকে অন্যান্য বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসা : চিকিৎসায় যক্ষ্মা সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়। দুই ধরনের ক্যাটাগরিতে যক্ষ্মার চিকিৎসা প্রদান করা হয়। একটি ক্যাটাগরিতে ছয় মাস ধরে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। অপর ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে আট-নয় মাস ধরে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। যক্ষ্মা প্রতিরোধে জন্মের পরপরই প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। হাঁচি, কাশি ও কফের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। তাই রাস্তাঘাটে হাঁচি-কাশি এলে মুখে রুমাল চাপা দেওয়া উচিত এবং যত্রতত্র কফ-থুথু ফেলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীকে যথাযথ পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। শ্লেষ্মায় জীবাণুবাহী যক্ষ্মার ক্ষেত্রে রোগীকে অন্তত দুই সপ্তাহ আলাদা রাখতে হবে এবং রোগীর মুখে সবসময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। চিকিৎসা চলাকালীন রোগীকে নিয়মিত ফলোআপে রাখা জরুরি। সাধারণত চিকিৎসার দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে জ্বর কমে যায়, খাবারে রুচি আসে এবং ওজনও বাড়তে থাকে। এ ধরনের উন্নতি দিয়ে বোঝা যায় যে রোগী চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন। যক্ষ্মার ওষুধে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে, যেমন জন্ডিস, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা, পায়ে শিরশির করা ও অবশতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।