সত্যজিৎ রায়ের নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

১৫ নভেম্বর কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার পদচারণা ছিল সমুজ্জ্বল। সত্যজিৎ রায়ের মানসপুত্র হিসেবে পরিচিত বর্ষীয়ান এই অভিনেতাকে নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

পুলু, কেমন আছিস, ভালো?

বড় তাড়াতাড়ি নিভে যাচ্ছে এই কলমের আলো।

মাঘ কুয়াশার চেয়েও ঝাপসা হচ্ছে অক্ষর,

কোথা দিয়ে কেটে গেল রে এতগুলো বছর?

যেন রেলের চাকায় বেঁধেছিল কেউ দিনঘড়িটার কাঁটা,

অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি তোর ঠিকানাটা!

এই দেখ! পরিচয়টাই দেয়া হয়নি কথায় কথায়!

চিনতে পারছিস? রোল ফরটি-সিক্স, অপূর্ব কুমার রায়।

পৃথ্বীরাজ চৌধুরীর লেখা ‘ইতি অপু’ কবিতার অংশবিশেষ। কবিতাটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আবৃত্তি করেছিলেন।

অপূর্ব কুমার রায়, সংক্ষেপে অপু। দুর্গার ভাই, মা-বাবার আদরের ছেলে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণে ইতিহাসের এক অনন্য সৃষ্টি পথের পাঁচালীর অন্যতম চরিত্র। এক নামে অপুকে সবাই চেনে। বড় বড় চোখে প্রথম রেলগাড়ি দেখে বিস্মিত হওয়া সেই অপু যখন বড় হয়, অপু ট্রিলজির শেষ সিনেমা অপুর সংসারে অপুর চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অপু বলতেই আমরা কেবল সৌমিত্রকেই চিনি। কোনো বাড়তি সম্ভাষণ নয়, শুধু অপু উচ্চারণেই একসঙ্গে সৌমিত্র ও সত্যজিতের নাম চলে আসে। সত্যিই বড় তাড়াতাড়ি আলো নিভে গেল। সেই রেলের চাকায় বেঁধে রাখা দিনঘড়িটার কাঁটাও আজ বন্ধ হলো। কবিতার অপুর মাঘ কুয়াশার চেয়েও অক্ষরগুলো যেমন ঝাপসা হচ্ছিল, তেমনি আজ বাস্তবের অপুর জীবনের নাম মুছে গেল জীবনের অধ্যায় থেকে। তবে সত্যিই কি মুছে গেল? অপুর যে জীবনে সৌমিত্র ছিলেন, সত্যজিতের মতো সৃষ্টিশীল মানুষের ছায়াতলে যিনি জীবনের অনেকটুকু সময় কাটালেন, তাকে কি সত্যিই কখনো মুছে ফেলা যাবে?

অভিনয়ের শুরু

চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দার সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। জীবদ্দশায় ছিলেন সফল মঞ্চাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, কবি। কাজ করেছেন ‘এক্ষণ’ নামে সাহিত্য ও সংস্কৃতি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হিসেবে। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্ম নেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা। সৌমিত্রর পরিবারের আদিবাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় শিলাইদহের কাছে কয়া নামে একটি গ্রামে। তার পিতামহের সময় থেকে তারা কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন। কৃষ্ণনগরেই ছিল তার স্কুলের প্রাথমিক লেখাপড়া। পরে কাজের সুবাদে বাবা কলকাতায় চলে এলে পরবর্তী সময়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করেন কলকাতাতেই। অভিনয়ের প্রতি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আগ্রহ জন্মে ছোটবেলা থেকেই। ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরে বেশ উন্নতমানের নাট্যচর্চা হতো। তার বাবা সেখানে শৌখিন নাট্যদলে নাটক করতেন, বাড়িতেও কবিতা আবৃত্তি এবং নাটকের একটা আবহ ছিল। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘শৈশবকালে আমরাও বাড়িতে তক্তপোষ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে, বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা খাটিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে ছোট ছোট নাটিকায় অভিনয় করতাম। বাড়ির বড়রাও প্রচুর উৎসাহ দিতেন। ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ার সময় থেকেই আমার নাটকের নেশা প্রচুর বেড়ে গিয়েছিল।’ পেশাদার রঙ্গমঞ্চে তার নাট্যজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে কলকাতার স্টার থিয়েটারে ‘তাপসী’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে।

স্কুলের মঞ্চে প্রথম অভিনয় করেছিলেন ‘স্লিপিং প্রিন্সেস’ নামে একটি ইংরেজি নাটকে। এ নাটকে অভিনয়ের জন্য পদক ও মেডেলও পেয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে লাগল। সৌমিত্র তখন কলেজে বাংলায় অনার্স করছেন। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সঙ্গে যোগাযোগ হলে তখন থেকেই অভিনয়কে জীবনের মূল লক্ষ্য করার স্বপ্ন দেখেন। তার অভিনয় সৌমিত্রকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। সৌমিত্রর ভাষায়, ‘বিএ ফাইনাল ক্লাসে পড়ার সময়ই আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম আমি অভিনয় করব, আর কিছু করব না।’

পরবর্তী জীবনে অভিনেতা, নাট্যকার, আবৃত্তিশিল্পী ও কবি হয়ে উঠলেও চিত্রশিল্পী পরিচয় নিয়ে বরাবরই কিছুটা শঙ্কিত ছিলেন সৌমিত্র। ছবি আঁকা ছাড়াও নিজের চেহারা নিয়েও বেশ হীনমন্যতায় ভুগতেন তিনি। ছোটবেলায় দীর্ঘ ৬৩ দিন টাইফয়েডে ভুগে হাঁটতে ভুলে গিয়েছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর নতুন করে হাঁটা শিখতে হয়েছিল। ‘আমাকে লোকে নেবে তো? সংকোচ ও রুগ্ণ দেহ নিয়ে কীভাবে আমি এই পথ পাড়ি দেব?’ এই ভীতি, শঙ্কা ও প্রশ্ন অপুর সংসার-এ আবির্ভাব পর্যন্ত তাকে তাড়া করেছে। এই হীনমন্যতাই তার কাজের রাস্তাকে আরও লম্বা করেছে। তবে একবার অপু হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর আর পিছু ফিরে তাকাননি।

অপু হয়ে ওঠা

‘পথের পাঁচালী’র পর সত্যজিৎ রায় যখন সিনেমা নিয়ে একের পর এক কাজ করে চলেছেন, সৌমিত্র তখন মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন। অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অপরাজিত’ নিয়ে কাজ করা শেষ হলেও ‘অপুর সংসার’ নিয়ে কাজ করবেন এমন কিছু ভাবেননি। ১৯৫৮ সালে ‘পরশ পাথর’ আর ‘জলসাঘর’ সিনেমা দুটো মুক্তি পেলে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেন অপু ট্রিলজির শেষ সিনেমাটি নিয়ে কাজ করবেন। অপরাজিত সিনেমার শ্যুটিং শুরু হওয়ার আগে সৌমিত্রের সঙ্গে সত্যজিতের পরিচয় হয় এই সিনেমার সেটেই একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। মূলত এই পরিচয়ের পরেই সিদ্ধান্ত হয় অপুর সংসার নির্মাণের। তখন চারদিকে অপরাজিত’র অপু চরিত্রের জন্য অভিনেতা খোঁজা হচ্ছিল। তেমন কাউকেই সত্যজিতের মনে ধরছিল না। শহরে পড়তে আসা, কিশোর অপুর জন্য কোনো মুখই তার মনমতো না হওয়ায় কাজও শুরু হচ্ছিল না। সত্যজিৎ বরাবর যে কোনো চরিত্রের জন্য নতুন মুখকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। খোঁজ চলতে লাগল। সত্যজিৎ রায়ের সহকারী নিত্যানন্দ দত্ত সৌমিত্রের একজন বন্ধুর বন্ধু ছিলেন। বন্ধুর সূত্র ধরে তিনি একদিন কফি হাউজ থেকে সৌমিত্রকে নিয়ে এলেন সত্যজিতের কাছে লেক এভিনিউতে। তাকে দেখেই সত্যজিৎ বলে উঠেছিলেন, ‘ওহে! আপনি যে বড় লম্বা হয়ে গেলেন!’ কিশোর অপুর জন্য সৌমিত্র কিছুটা লম্বা হয়ে যাওয়ায় সে যাত্রায় আর অপু হতে পারেননি সৌমিত্র। কাস্টিং না হলেও সত্যজিৎ রায় শ্যুটিং দেখার জন্য ‘পরশ পাথর’ ও ‘জলসা ঘর’-এর সেটে ডাকেন সৌমিত্রকে। ‘জলসা ঘর’-এর সেটে শ্যুটিং দেখতে দেখতে সৌমিত্র’র কাজের সময় হয়ে গেলে সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে যান তিনি। এ সময় তিনি সৌমিত্রকে বললেন, ‘এসো, তোমাকে ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।’ পরিচয় করানোর সময় সত্যজিৎ রায় ছবি বিশ্বাসকে বলেন, ‘ছবি দা, এই হচ্ছে আমার অপুর সংসারের অপু!’ তখনই সৌমিত্র জানতে পারেন সত্যজিৎ তাকে বিখ্যাত অপুর চরিত্রে বেছে নিয়েছেন। সেই প্রথম অপু হয়ে চলচ্চিত্রে আসা যুবক সৌমিত্র এরপর দর্শকদের উপহার দিয়েছেন অসংখ্য সিনেমা। দুই বাংলার দর্শকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন খুব কাছের একজন মানুষ।

সত্যজিৎ ও সৌমিত্র

চারুলতা সিনেমার সেটে কাজ চলছে। চারুলতাকে অমল চিঠি লিখবে। সত্যজিৎ রায় গম্ভীর গলায় সৌমিত্রকে বললেন, ‘তোমার এই হাতের লেখায় হবে না। সেই সময়ের হাতের লেখার মতো করে চিঠি লিখতে হবে।’ এরপর সত্যজিৎ হাতে ধরে ক্যালিগ্রাফি শিখিয়েছিলেন সৌমিত্রকে। সেই ক্যালিগ্রাফি রপ্ত করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে সৌমিত্রর হাতের লেখাই বদলে যায়। কাজের প্রতি এমনই নিষ্ঠা ছিল সৌমিত্রর। গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি সবকিছু শুরু থেকেই অসাধারণ থাকলেও চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে তাকে আরও কষ্ট করতে হয়েছে। ‘অপুর সংসার’-এর সময় সত্যজিৎ তাকে বলতেন, ‘ওর গলার আওয়াজ বড্ড পাতলা।’ এই কথায় সৌমিত্র নিজেকে এতটাই ভেঙেচুরে গড়েছিলেন যে হয়ে উঠেছিলেন দক্ষ আবৃত্তিকার। গলার আওয়াজ নিয়ে নানা চর্চা, বিভিন্ন দিকে তার শ্রম তাকে কেবলমাত্র একজন অভিনেতা নয়, একজন শিল্পী হয়ে ওঠার দিকে নিয়ে যায়। অন্য কারও সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই নিজের চ্যালেঞ্জ ছিল তার। অন্যরকম কিছু হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ।

‘এক্ষণ’ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সত্যজিতের বাড়িতে যাওয়া-আসা বেড়ে যায় সৌমিত্রের। সত্যজিতই এক্ষণ-এর নামকরণ করে তার কভার এঁকে দেন। চরিত্রের প্রতিটি দৃশ্যের প্রতি বাড়তি নজর রাখতেন সৌমিত্র। সত্যজিৎ তাকে কোনো চিত্রনাট্য দিলে তার ওপর তিনি নিজেও আলাদাভাবে কাজ করতেন। সংলাপগুলোকে স্ক্যান করে ফেলতেন। হয়তো চা খাওয়ার কোনো দৃশ্য আছে। কোন সময়ে চায়ে চুমুক দেবেন, জুতার ফিতে বাঁধতে বাঁধতে শার্টের কোন হাতা আগে গোটাবেন, সেটাও ফুটনোটে লিখে রাখতেন। ডাবিংয়ের সময় ওয়ান টেকে শট ওকে করে ফেলেছেন অনেকবার। এমন ডেডিকেশন কাজের প্রতি সত্যিই আর পাওয়া যায় না।

সৌমিত্র ও সত্যজিৎ একে অপরের ওপর ভীষণ ভরসা করতেন। সৌমিত্রর একটি ছবি সব সময় সত্যজিতের কাছে থাকত। যখনই যে চরিত্রে তাকে ভাবতেন, মেকআপের জন্য ওই ছবির ওপরই আঁকাআঁকি শুরু করে দিতেন। বিশেষ ধরনের মেকআপের জন্য, যেমন ‘অশনি সংকেত’-এ সৌমিত্রকে একদম নিজের সামনে মডেলের মতো বসিয়ে ছবি এঁকেছিলেন সত্যজিৎ। তার এই স্নেহ, নির্ভরতা, ভরসা শতগুণে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সৌমিত্র নিজেও।

চলচ্চিত্র জীবন

‘অপুর সংসার’-এ কাজ শেষ হলে সত্যজিৎ রায় সৌমিত্রকে বলেছিলেন, ‘আমার এ ছবিতে তোমার কাজ যা হয়েছে, তাতে লোকজন তোমায় কাজ দেবে। তবুও যদি কাজ না পাও, আর কিছু না হোক, তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে তো কাজ করতেই পারো।’ পরিচালক আর অভিনেতার এমন নির্ভরতায় তাদের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। সত্যজিতের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হয়নি। একের পর এক কাজ করতে করতে সৌমিত্রর ছবিসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২৫০। ‘অপুর সংসার’-এর পরের বছরই মুক্তি পায় সৌমিত্রর পরের সিনেমা ‘দেবী’। এরপরের তালিকায় ছিল ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘তিন কন্যা’, ‘ঝিন্দের বন্দী’ এবং ‘পুনশ্চ’। চলচ্চিত্রে অভিনয় জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই কাজ করেছেন সত্যজিৎ-মৃণাল-তপনের সঙ্গে। অসিত সেনের পরিচালনায় ‘স্বয়ম্বর’ এবং ‘স্বরলিপি’-তে কাজের পর ১৯৬২ সালে সত্যজিতের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘অভিযান’। অপূর্ব-অমূল্যর সারল্য ভাবমূর্তি ভেঙে ফেলে তখন তিনি অভিযানের নরসিংহ। ‘অতল জলের আহ্বান’, ‘বেনারসি’র মধ্যেই ম্ুিক্ত পেল ‘সাত পাকে বাঁধা।’ এরপর ‘চারুলতা’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘প্রতিনিধি’, ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’, ‘কাচকাটা হিরে’, ‘আকাশকুসুম’-এর পাশাপাশি সৌমিত্র কাজ করেন ‘মণিহার’, ‘একটুকু বাসা’, ‘বাঘিনী’, ‘পরিণীতা’, ‘প্রথম কদম ফুল’ এবং ‘তিন ভুবনের পারে’।

সত্যজিৎ রায়ের ২৭টি ছবির ১৪টিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। দুই মহারথীর যুগলবন্দির সপ্তম ছবি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। সে বছরই অপর্ণা সেনের বিপরীতে ‘বাক্স বদল’-এ সৌমিত্রর অভিনয় দর্শক মনে ভীষণভাবে দাগ কেটে যায়। ‘মাল্যদান’, ‘খুঁজে বেড়াই’, ‘স্ত্রী’র সৌমিত্র সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ধরা দেন ‘বসন্ত বিলাপ’-এ। ‘অশনি সংকেত’-এর পণ্ডিতমশাই হয়েও কখনো ‘মহানায়ক’ বিশেষণে বিশেষিত হতে চাননি তিনি। তিনি বরং হীরকরাজ্যের উদয়ন পণ্ডিত। এর পাশাপাশি আবার ‘আতঙ্ক’র মাস্টারমশাইও। যেখানে চোখ বন্ধ রাখার জন্য দুষ্কৃতির চোখ রাঙানি দেখেছেন সেখানেই আবার ক্ষিদ্দা হয়ে কোনিকে ‘ফাইট’ করার মন্ত্র জুগিয়েছেন। ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’র অংশ হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ছকের বাইরে এসেছেন। সত্যজিৎ-মৃণাল-তপন তিন মহীরুহের ছবিতে তিনি স্বমহিমায় উপস্থিত ছিলেন। একদিকে তিনি যেমন ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপ, অন্যদিকে আবার ‘গণদেবতা’র দেবু পণ্ডিত, ‘প্রতিনিধি’র অমল, ‘ঝিন্দের বন্দী’র ময়ূরবাহন।

কর্মজীবনে সৌমিত্র অভিনয় করেছেন কয়েক প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে। তাকে ভেবেই ‘অসুখ’ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের ‘হেমলক সোসাইটি’, গৌতম ঘোষের ‘দেখা’, সুজয় ঘোষের ‘অহল্যা’, অতনু ঘোষের ‘ময়ূরাক্ষী’, নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘বেলাশেষে’ এবং ‘পোস্ত’-সবখানেই তার উপস্থিতি চলচ্চিত্রের শোভা বাড়িয়েছে। ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এ তিনি শুধু অভিনয় করলেও ফেলুদার বাকি সব গল্প পড়ার সময়েও ফেলুভক্তের চোখে ফেলুদা হিসেবে ভেসে ওঠেন সৌমিত্রই। বাংলা ছেড়ে মুম্বাইতে তিনি কখনোই কাজ করতে চাননি। তবে স্বল্প হলেও বলিউডে তার কিছু কাজ আছে। ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেনাপাওনা’ অবলম্বনে টেলিফিল্ম ‘নিরুপমা’য় রামস্ন্দুর মিত্র এবং ২০০২ সালে যোগেন চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘হিন্দুস্তানি সিপাহী’ ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্ত্রীর পত্র’ অনুসরণে ‘স্ত্রী কা পত্র’ পরিচালনা করেছিলেন সৌমিত্র।

২০০৪ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন সৌমিত্র। অভিনয় জীবনের ৫ দশক পেরিয়ে ২০০৬ সালে ‘পদক্ষেপ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে সম্মানিত হন। ২০১২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান। তার কয়েক বছর পরে ফরাসি সরকারের দেওয়া সম্মান ‘লেজিয়ঁ দ্য অনর’ এবং ‘কম্যান্দর দ্য লার্দ্র দে আর্ত্ এ দে লের্ত্র’ অর্জন করেন। সিনেমায় পথচলা দীর্ঘদিনের হলেও মাঝে মাঝেই ফিরে যেতেন অভিনয়ের প্রথম ভালোবাসা প্রিয় মঞ্চে। বাংলার নাট্যজগৎকে নিজের প্রযোজনায় ‘নাম জীবন’, ‘রাজকুমার’, ‘ফেরা’, ‘নীলকণ্ঠ’, ‘ঘটকবিদায়’, ‘ন্যায়মূর্তি’, ‘টিকটিকি’ এবং সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘রাজা লিয়ার’সহ অনেক অভিনয় উপহার দিয়েছেন তিনি।

অপুর চলে যাওয়া

নিজের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলতেন সৌমিত্র। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে প্রশ্ন রেখেছিলেন নিজের কাছে, ‘এই যে এত কিছু করলে। এসব কেন? তুমি পাশ দিয়ে গেলে ওই যে ছেলেগুলো আজও চিৎকার করে, দ্যাখ-দ্যাখ, স-উ-মি-ত্র! স-উ-মি-ত্র যাচ্ছে! তার জন্য তো নয়। এটা নিশ্চয়ই লক্ষ্য ছিল না? আমি তো চেয়েছিলাম, আমি হেঁটে গেলে লোকে বলবে, ওই যে যাচ্ছে! ওর মতো অভিনয় কেউ করতে পারে না। আদারওয়াইজ এই জীবনের কী মানে? মানুষের কী উপকার করতে পারলাম? তখন নিজেকে বোঝাই, অভিনয়ের মাধ্যমে যেটুকু আনন্দ বিতরণ করতে পেরেছি, সেটাও তো এক অর্থে মানুষের সেবা। সেটাও তো একটা উপকার।’

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে ঘরবন্দি অবস্থায় সৌমিত্র লিখেছিলেন, ‘আরও অনেক মানুষের মতো আমিও সম্পূর্ণ গৃহবন্দি। কোনো অনুষ্ঠান নেই, সমস্ত শ্যুটিং থেমে গিয়েছে, রঙ্গমঞ্চও বন্ধ এমন কর্মহীন দশা আমার পক্ষে নিতান্তই অসহনীয়। মনটা এমনই অস্থির যে লেখালিখিতেও মন দিতে পারছি না। কবিতা রচনাও তো যে মনোযোগটুকু দাবি করে, সেটাও যেন আচমকা হারিয়ে গিয়েছে। চতুর্দিকের পরিস্থিতি দেখে মনটাই খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে। ছবি আঁকছি কখনো-সখনো। সে কাজটায় অসুবিধা হচ্ছে না, কারণ আমি তো আর প্রথামাফিক শিল্পী নই, কাগজে বা ক্যানভাসে রং-তুলি নিয়ে নিজের মতো করে খেলা করি। সেই খেলাটুকু থেকে গিয়েছে। আর, পড়ছি বই।’ কে জানত এই মহামারীতে নিজের বায়োপিক নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে শ্যুটিং করতে গিয়েই তিনি এভাবে আক্রান্ত হবেন, চলে যাবেন না ফেরার দেশে।

সৌমিত্র হয়তো উত্তম কুমারের মতো মহানায়ক হয়ে ওঠেননি, আবার কমার্শিয়াল সিনেমায় দাপিয়ে কাজ করেছেন এমনও নয়। তবু ‘বেলাশেষে’ তিনি একজনই, তিনি কেবল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।