চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বাড়িতে আগুন দিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বিচার পাননি নিহতদের স্বজনরা।
আগুনে পুড়িয়ে মারার ওই মামলার বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে ২০১৯ সালের ২৩ জুন উচ্চ আদালত থেকে আসা নির্দেশের পরও পেরিয়ে গেছে আরও ১৬টি মাস। উল্টো শোকের পাথর বুকে চেপে মামলার ব্যয়বহন করতে করতে নিহতদের স্বজনরা এখন প্রায় নিঃস্ব।
এদিকে বীভৎস ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছে এলাকাবাসী।
২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের শীলপাড়ার তেজেন্দ্র লাল শীলের বাড়িতে বাইরে থেকে ঘরে তালা লাগিয়ে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে নারী-শিশুসহ একই পরিবারের ১১ জনকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় করা মামলায় তৃতীয় অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সাধনপুর গ্রামের ওই বর্বর ঘটনায় নিহতরা হলেন– তেজেন্দ্র লাল শীল (৭০), তার স্ত্রী বকুল শীল (৬০), ছেলে অনিল শীল (৪০), অনিলের স্ত্রী স্মৃতি শীল (৩২), অনিলের তিন সন্তান রুমি শীল (১২), সোনিয়া শীল (৭) ও চার দিন বয়সী কার্তিক শীল, তেজেন্দ্র শীলের ভাইয়ের মেয়ে বাবুটি শীল (২৫), প্রসাদি শীল (১৭), অ্যানি শীল (৭) এবং কক্সবাজার থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয় দেবেন্দ্র শীল (৭২)।
সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পাওয়া নিহত তেজেন্দ্র শীলের ছেলে বিমল শীল পরে বাদী হয়ে মামলা করেন। এরপর ১৭ বছর মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রপক্ষ যথাসময়ে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় আলোচিত এ মামলাটি বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। যদিও হাইকোর্ট এ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য গত বছর ২৩ জুন জর্জ কোর্টকে ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে সেই আদেশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলে দাবি করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এই মামলায় ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মামলার বাদী বিমল কান্তি শীল, তার ভাই নির্মল শীল, চাচা শচীন্দ্র শীল, বিজয় ধর, যাদব ধর, দুলাল চক্রবর্তী, মনমোহন শীল এবং সাধনপুরের সাবেক চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ চৌধুরীসহ সর্বশেষ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষ্যপ্রদান করেন। বাদবাকি সাক্ষীদের মধ্যে কেউ কেউ নিরাপত্তার স্বার্থে আর কেউবা সরকারিভাবে যথাযথ যোগাযোগ না করায় সাক্ষী দিতে হাজির হতে অনীহা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, সাক্ষী হাজির করতে না পারায় এবং প্রায় আট মাস ধরে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের পদ খালি থাকায় বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। মামলাটি চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এ আদালতের বিচারক মুন্সী আবদুল মজিদ ফেব্রম্নয়ারিতে বদলি হওয়ার পর পদটি শূন্য আছে। অন্য একজন বিচারক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পিপি লোকমান হোসেন চৌধুরী জানান, ২৪ ফেব্রম্নয়ারি এ মামলার সর্বশেষ শুনানির দিন একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর ১১ মার্চ ও ৮ এপ্রিল বিচারক না থাকায় শুনানি হয়নি। তারপর মহামারীর লকডাউনের জন্য আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলে ২৭ আগস্ট অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাবিদুর রহমান মামলার ১০ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য সমন জারির আদেশ দেন। কিন্তু সর্বশেষ ৩ নভেম্বরসহ পরপর তিনটি শুনানির নির্ধারিত দিনেও সাক্ষী না আসায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। এই ১০ সাক্ষীর মধ্যে বাঁশখালীর ঘটনাস্থলের স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ সদস্য ও মামলা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাদী বিমল শীল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। কোনো সহযোগিতাও পাচ্ছি না। সরকার যদি মামলা পরিচালনার ভার নিত তাহলে বেঁচে যেতাম।
এক রাতে বাবা-মাসহ ১১ জনকে হারানো বিমল আরও বলেন, বছর ঘুরলে শুধু পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, এটুকুই। কেউ আর খবরও নেয় না। মা-বাবা হারালাম। আর অবশিষ্ট কিছুই নেই।