করোনাভাইরাস মহামারীর অভিঘাতে দেশের আর্থসামাজিক নানা বিপর্যয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতের বিপর্যয়কে বিশেষভাবে আমলে নেওয়া জরুরি। কিন্তু অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকলেও শিক্ষা খাত নিয়ে নীতিনির্ধারকদের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। করোনার সংক্রমণ শুরুর পর গত ১৮ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে। কয়েক দফা বাড়িয়ে ইতিমধ্যেই আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি শিক্ষাবর্ষের প্রায় পুরোটাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকল। তবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অনলাইনে কিছু ক্লাস-পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু থাকলেও সন্দেহ নেই যে, প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অকিঞ্চিৎকর।
এমন বাস্তবতার মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও শিক্ষকরা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন টিউশন ফি আর বেতনভাতা নিয়ে। একদিকে স্কুল-কলেজ প্রায় বন্ধ এবং অভিভাবকদের সংখ্যাগরিষ্ঠই করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফলে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিসহ নানারকম ফি ও ভাতা দিতে গিয়ে তারা বিপর্যস্ত। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি ও অন্যান্য ভাতা না দিলে শিক্ষকদের বেশিরভাগেরই বেতন অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা। এ উভয় সংকট থেকে উত্তরণের তাহলে উপায় কী? এ নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবক বনাম শিক্ষক-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীরব দ্বন্দ্ব গত কয়েক মাসে মানববন্ধন আর সভা-সমাবেশেও গড়িয়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা টিউশন ফিসহ অন্যান্য ভাতা মওকুফ চান আর শিক্ষকরা বেতন চান।
অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার মাসখানেক আগে এ বিষয়ে মুখ খুলল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। গত বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মাউশি জানিয়েছে করোনাকালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন স্কুল-কলেজ) শুধু নির্ধারিত টিউশন ফি আদায় করতে পারবে। এর বাইরে অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি আদায় করতে পারবে না। এসব ফি আদায় করা হয়ে থাকলে, তা ফেরত দিতে হবে অথবা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। একইভাবে অন্য কোনো ফি যদি ব্যয় না হয়ে থাকে, তাহলে তাও ফেরত দিতে হবে অথবা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
মাউশির এ ঘোষণা সাধুবাদযোগ্য বটে কিন্তু এ পদক্ষেপ উদ্ভূত সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত কি না সেই বিবেচনা করাটাও জরুরি। মাউশির বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো অভিভাবক চরম আর্থিক সংকটে পড়েন, তাহলে তার সন্তানের টিউশন ফির বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় নেবে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনরায় আগের মতো সব ধরনের যৌক্তিক ফি আদায় করা যাবে। এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ করা জরুরি সেটা হলো সরকারি স্কুলের এবং বেসরকারি স্কুলগুলোর শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাই সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন বা বেতনের একটা অংশ পেয়ে থাকেন। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি স্কুল-কলেজে এমপিওভুক্ত নয় এমন শিক্ষকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং নানা ধরনের কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বিদ্যালয়গুলোর প্রায় পুরোটাই টিউশন ফির ওপর নির্ভর করে চলে। তাই টিউশন বা শিক্ষা ফি নিয়ে স্কুলগুলোও চাপে আছে এবং ইতিমধ্যেই বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংগত কারণেই বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের এ প্রশ্ন যৌক্তিক যে তাদের বেতন তাহলে কোথা থেকে আসবে?
প্রশ্ন হলো সরকার যদি মনে করে যে, স্কুল-কলেজগুলো স্বাভাবিক সময়ে যথেষ্ট ফি আদায় করে থাকে এবং সেগুলো বেশ লাভজনক প্রতিষ্ঠান, ফলে তারা এখন লাভের টাকা বা সঞ্চয় থেকে শিক্ষকদের বেতন দেবে; তাহলে এই প্রশ্নও উঠতে পারে যে সরকার তাহলে শিক্ষাদানের বিনিময়ে উচ্চ বেতনভাতার বিষয়ে এতদিন নীরব ছিল কেন? আর যদি তা না হয়, তাহলে এ প্রশ্নই সামনে আসবে যে, সরকার কেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে না? এটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই যে, অভূতপূর্ব এ বৈশি^ক মহামারীর কালে দেশের শিক্ষা খাত আর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাবর্ষ রক্ষায় সরকারের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা বা উদ্যোগ যেমন দেখা যায়নি, তেমনি শিক্ষা খাতের সংকট নিরসনকল্পে সরকারের কোনো আর্থিক প্রণোদনাও পাওয়া যায়নি। এমনকি করোনাকালে চলতি অর্থবছরের বাজেটেও বিশেষ গুরুত্ব পায়নি শিক্ষা খাত। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অথচ শিক্ষাবিদদের দীর্ঘদিনের দাবি বাজেটে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হোক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব না দিয়ে কি উন্নত জাতি কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব?