টিকার ঘোষণা নিয়ে রাজনীতি

করোনাভাইরাস মহামারী দিন দিন আরও ভয়ংকর হচ্ছে। অথচ এ ভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ প্রতিরোধে এখনো কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। এখনো অনুমোদন পায়নি কোনো টিকাও। তবে টিকা তৈরির দৌড়ে আছে বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বিশ্বে এখন করোনার ১৮০টি টিকা নিয়ে কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্য চীন, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে তাদের তৈরি টিকার কার্যকারিতার পরিসংখ্যান। আসলে টিকা তৈরি করা ও বাজারজাত নিয়ে এখন তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে ওই দেশগুলোর মধ্যে। কার আগে কে টিকা বাজারে নিয়ে আসবে, কে কোন দেশের টিকা কিনবে, তা নিয়ে কূটনীতির চূড়ান্ত খেলা চলছে।

বিশ্বজুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যখন শুরু হয়েছে তখন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও বায়োএনটেক দাবি করেছে, তাদের তৈরি করোনা টিকা ৯০ শতাংশ কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বহুজাতিক কোম্পানি মডার্নার দাবি, তাদের তৈরি টিকা ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকর। রাশিয়া দাবি করছে, তাদের তৈরি সব টিকাই সফল। বিশ্বের প্রথম স্বীকৃতি পাওয়া টিকা স্পুৎনিক-ভি’র কার্যকারিতা ৯৫ ভাগ। গতকাল অক্সফোর্ড দাবি করেছে তাদের টিকা বয়স্কদের ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর।

তবে অনেকে বলছেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সঙ্গে যেহেতু বিশাল সম্মান ও মর্যাদা জড়িত আছে, তাই শক্তিধর দেশগুলো নিশ্চিতভাবেই ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চাইবে। পাশাপাশি যে কোম্পানি আগে ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারবে, সে-ই করোনাভাইরাসের এ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা লুটতে পারার সামর্থ্য রাখবে।

যেমন সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নীতিনির্ধারক র‌্যাচেল সিলভারম্যানের মতে, টিকার প্রথম ব্যাচ দরিদ্র দেশগুলোতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ শুরুর সব টিকাই অগ্রিম ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় বিক্রি হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডোজ টিকা কিনে নিয়েছে ধনী দেশগুলো।

এ অবস্থায় অনুমোদিত যেকোনো করোনা টিকার সামঞ্জস্যপূর্ণ বিতরণ নিশ্চিতে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্স গঠন করেছে। এ সংস্থার অধীনে বিশ্বের সরকারগুলো, বিজ্ঞানীরা, সিভিল সোসাইটি এবং বেসরকারি খাত রয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতিবিদরা যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বেঁধে দেওয়া উঁচু দরই মেনে নিতে হবে। তখন করোনা ভ্যাকসিন শুধু গুটিকয়েক অভিজাত ও মধ্যবিত্ত ব্যক্তিরাই ভোগ করবে, নিম্নবিত্তদের আর ভ্যাকসিনের মুখ দেখতে হবে না।

গরিব দেশগুলো যদি কোনোমতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেও সক্ষম হয়, তবুও টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি অনিশ্চিত। আর এর কারণ অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। যেমন ফাইজারের আরএনএভিত্তিক টিকা যে অবস্থায় সংরক্ষণ করতে হয় সেই সুবিধা অনেক দরিদ্র দেশেরই নেই। ফাইজারের টিকা অবশ্যই মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে, তা না হলে টিকা নষ্ট হয়ে যাবে। দরিদ্র দেশগুলোর অধিকাংশ হাসপাতালেই টিকা সংরক্ষণে যে সুবিধা আছে তা মাত্র মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার।

তবে রাজনীতির ফায়দা লোটার জন্য যদি করোনা ভ্যাকসিনকে নির্দিষ্ট স্থানের মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয় কিংবা পুঁজিবাদের নির্মমতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা হয়, তাহলে তা হবে চরম অমানবিক ঘটনা। ভূ-রাজনীতিতে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের ক্ষেত্রে সেই শত্রুতা টেনে আনা মোটেও সুখকর নয়।