মোহাম্মদ ভাইদের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন মুশতাক

ওয়াজির মোহাম্মদ, রইস মোহাম্মদ, হানিফ মোহাম্মদ, সাদিক মোহাম্মদ ও মুশতাক মোহাম্মদ। পাঁচ ভাইয়ের সবাই পাকিস্তান ক্রিকেটকে বিভিন্ন ভাবে রাঙিয়েছেন। চারজনের জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতা আছে। একমাত্র রইসের জাতীয় দলে পা রাখা হয়নি। ভাইদের মধ্যে ঈশ্বর-প্রদত্ত প্রতিভা সবচেয়ে বেশি ছিল হানিফের। ক্রিকেটে ‘লিটল মাস্টার’ শুরুতে তাকেই বলা হতো। এরপর মুশতাক। টেস্টে এক সময়ের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি দুই দশক। স্কুল ক্রিকেটার হিসেবে শুরু করেছিলেন ১৯৫৯ সালে। ৫৭ টেস্ট ও ১০ ওয়ানডে খেলে থেমেছেন ১৯৭৯ সালে। নামের পাশে ৩৬৪৩ টেস্ট রান ও ৭৯ উইকেট জ্বলজ্বল করছে।

মুশতাক মোহাম্মদ প্রথম পাকিস্তানি ক্রিকেটার হিসেবে ফার্স্ট ক্লাসে ২৫ হাজার রান করার কীর্তি গড়েছেন। এই পর্যায়ের ক্রিকেটে রান ও উইকেটে সব ভাইদের টপকে গেছেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর ৪১ দিন বয়সে ফার্স্ট ক্লাসে অভিষেক তার। দেশে খেলতেন করাচি, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের হয়ে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ইংলিশ কাউন্টি নর্দাম্পটনশায়ারে। প্রতি মৌসুমে এক হাজার রান করেছেন। প্রায় তিন যুগের ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারে খেলেছেন ৫০২ ম্যাচ। ৭২ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৩১ হাজার ৯১ রান। যার অর্ধেকই এসেছে নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে। আর লেগ স্পিনে উইকেট নিয়েছেন এক হাজার থেকে ৬৪টি কম (৯৩৬টি)। 

ওয়াজির ও হানিফ মোহাম্মদের পর একই পরিবারের তৃতীয় ভাই হিসেবে ১৯৫৯ সালের ২৬ মার্চ আন্তর্জাতিকে অভিষেক মুশতাকের। মাত্র ১৫ বছর ১২৪ দিন বয়সে বড় পর্যায়ে নেমে তখনকার সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হন। অবশ্য তার সঠিক বয়স নিয়ে দ্বিমত ছিল। নিজের ষষ্ঠ টেস্টে ভারতের বিপক্ষে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় ১০১ রান করেন মুশতাক। ওই সময় তার বয়স ১৭ বছর ৭৮ দিন উল্লেখ করা ছিল। আর তাতেই সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানও হয়ে যান। যেই রেকর্ড টিকে ছিল ৪০ বছর। ২০০১ সালে বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোতে ১৭ বছর ৬১ দিনে সেঞ্চুরি করে রেকর্ডটি ভেঙে দেন।

টেস্টে মুশতাকের ১০ সেঞ্চুরির দ্বিতীয়টি তিন বছর পর ১৯৬২-তে। আর তৃতীয়টি করতে লেগেছিল আরও ৯ বছর। পাকিস্তানকে মোট ১৯ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুশতাক। তার নেতৃত্বেই ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে উইন্ডিজকে তাদের মাঠে হারানোর বিরল কীর্তি গড়ে পাকিস্তান। ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে ১৮ বছর পর ভারতের মাটিতে পাকিস্তানের প্রথম সিরিজ জয়ে (২-০) নেতৃত্ব দেন তিনি।

রিভার্স সুইপ শটের জনক বলা হয় মুশতাককে। অবশ্য হানিফ মোহাম্মদও এই শট খেলতেন কদাচিৎ। ১৯৭০ দশকের শেষদিকে ক্যারি প্যাকার ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজ খেলেছেন মুশতাক। অবসরের পর পাকিস্তান দলের কোচও ছিলেন। তার কোচিংয়েই ১৯৯৯’র বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে পাকিস্তান।

মাত্র ২০ বছর বয়সে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ বিসর্জন দিতে হয়েছিল মুশতাককে। ১৯৬৩ সালে নর্দাম্পটনশায়ার তাকে পাঁচ বছরের চুক্তির প্রস্তাব করে। কিন্তু কলপাক চুক্তির মতো ওই চুক্তিতে ওই সময়ে পাকিস্তানের কোনো দল বা জাতীয় দলের হয়েও খেলতে পারবেন না তিনি। পাঁচ বছর এ চুক্তিতে খেলে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানে ফিরে আসেন মুশতাক। সেই অভিজ্ঞতার কথা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সেই সময়টাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। কারণ আমি ভাবছিলাম এত বছর দেশের ক্রিকেটের বাইরে থাকলেও হয়তো আমাকে ভুলেই যাবে সবাই। কিন্তু অন্যান্য সুবিধার কথা বিবেচনা করে আমি সিদ্ধান্তটা নেই। এখন বলব তা ভুল ছিল না। কারণ, ওই পাঁচ বছরে আমি অনেক কিছু শিখেছি। কোন পরিবেশে কীভাবে ব্যাট করব, ভেজা উইকেট কিংবা কভারহীন উইকেটে কীভাবে ব্যাট করা উচিত ওই সময়ই শিখেছি।’

ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে ভাইদের অবদানের কথা সব সময় বলেন মুশতাক মোহাম্মদ, ‘হানিফ ভাই যখন তার সেরা সময়ে তখন আমার বয়স ১৫। তার নাম তখন সবার মুখে মুখে, আধুনিক সময়ে ইমরান খানের নাম যেমন। যে কারণে আমাদের সময় দেওয়া হানিফ ভাইয়ের পক্ষে কঠিন ছিল। সেক্ষেত্রে ওয়াজির ভাই ও রইস ভাইয়ের কথা বলব। কারণ এ দুজন সব সময়ই আমাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। তারা তরুণদের উৎসাহ দেওয়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহিত ছিলেন। বিশেষ করে আমাকে নিয়ে রইস ও ওয়াজির ভাই বেশি সময় কাটিয়েছেন। তাই আমার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে প্রথমে রইস ভাইয়ের অবদানের কথা স্মরণ করব। এরপর হানিফ ও ওয়াজির ভাই।