জোসেপ মারিয়া মিঙ্গুয়েয়া স্পেনের একজন ফুটবল এজেন্ট। বার্সেলোনার সঙ্গে তিনি যুক্ত সেই ১৯৭০ থেকে। এই সময়ে অনেক ফুটবলারকেই বার্সেলোনার কাছে উপস্থাপন করেছেন তিনি। তাদের মধ্যে দুজন জগদ্বিখ্যাত আর্জেন্টাইন আছেন। একজন ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর অপরজন লিওনেল মেসি। এ দুজন ছাড়াও স্প্যানিশ মিঙ্গুয়েয়া বার্সেলোনায় রিস্টো স্টইচকভ ও রোমারিওকেও এনেছিলেন। বাকিদের খুব সহজেই বার্সায় নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও ম্যারাডোনাকে আনা ছিল তার জন্য কঠিন ও ধৈর্যের এক পরীক্ষা। এই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য তাকে গুম ঘরে যেতে হয়েছে, আবার পিস্তলের মুখেও পড়তে হয়েছিল। তবে শেষ ভালো হলো ম্যারাডোনাকে বার্সেলোনায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন মিঙ্গুয়েয়া। কিন্তু আর্জেন্টিনা ঈশ্বরের ভাগ্যে যে বার্সেলোনা নয়, ছিল নাপোলি। বার্সায় হতাশার দুই মৌসুম কাটিয়ে ইতালির নাপোলিতেই পাড়ি জমিয়েছিলেন ম্যারাডোনা।
ম্যারাডোনার বার্সায় আসার প্রক্রিয়া শুরু হয় সেই ১৯৭৭ সালে। আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের হয়ে ততদিনে নাম করে ফেলেছেন ম্যারাডোনা। তাকে দেখতে সুদূর আর্জেন্টিনা উড়ে যান মিঙ্গুয়েয়া। প্রথম দিন ম্যারাডোনার খেলা দেখেই দক্ষ জহুরির মতো হীরা চিনে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে জাউমে রোসেলকে প্রস্তাব দেন তরুণ ডিয়েগোকে কিনতে। আর্জেন্টিনা জুনিয়র্স ক্লাব প্রেসিডেন্ট তখন অগুস্তো মোন্তাল কস্তা। মাত্র ১৬ বছর বয়সী ম্যারাডোনাকে বিক্রি করার সম্ভাবনা তৎক্ষণাৎ ফিরিয়ে দেন কস্তা। ওই সময় ম্যারাডোনার দাম ধরা হয়েছিল মাত্র ১ লাখ ডলার। টাকার জন্য নয়, মাত্র ১৬ বছরের একটি ছেলেকে বিদেশ বিভুঁইয়ে দিতে রাজি ছিল না আর্জেন্টিনা জুনিয়র্স ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
১৯৭৯ সালে চুক্তির আলোচনা আবার শুরু হয়। এক বছর পর দুই পক্ষই বনিবনায় প্রায় চলে আসে। একদিন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট হুলিও গ্রন্দোনা মিঙ্গুয়েয়াকে ডেকে পাঠান। গ্রন্দোনা জানান এই চুক্তি এখন সম্ভব নয়, সমস্যা আছে। সমস্যাটা কী? মিঙ্গুয়েয়া জানতে পারেন তাকে আসলে আর্জেন্টিনা আসতে হয়েছে অ্যাডমিরাল লাকোস্তের নিমন্ত্রণে। তিনি দেশটির তখনকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। বিষয়টি বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে মিঙ্গুয়েয়ার। পরে জানতে পারেন লাকোস্তে অনেককেই এমনভাবে ডেকে পাঠিয়েছেন কিন্তু তারা আর কখনো ফিরে আসেননি। ভয় পেতে থাকেন মিঙ্গুয়েয়া।
লাকোস্তের তত্ত্বাবধানেই আর্জেন্টিনা ১৯৭৮-এ সফল বিশ্বকাপ পরিচালনা করে। ওই আসরে ‘বয়সে ছোট’ বলে দলে নেওয়া হয়নি ম্যারাডোনাকে। পরের বিশ্বকাপের জন্য তাকে তৈরি করছিল আর্জেন্টিনা। তাই ওই সময়ে বিদেশে সেরা তরুণ ফুটবলারটিকে দিতে রাজি ছিল না আর্জেন্টিনা। মিঙ্গুয়েয়াকে ডেকে সে কথাই বলেন লাকোস্ত। তার সঙ্গে যেদিন মিটিং ঠিক ছিল সেদিন মিঙ্গুয়েয়াকে সৈন্যরা গাড়িতে করে একটা জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে বিশাল অন্ধকার টানেলের শেষে ছোট্ট ঘরে মিলিত হয় দুই পক্ষ। কিন্তু লাকোস্ত এক বাক্যে এই চুক্তি হবে না তা জানিয়ে দেন এভাবেÑ ‘শোনো, ডিয়েগোকে তোমরা এখন সই করাতে পারবে না। কারণ তোমাদের (স্পেন) ১৯৮২ বিশ্বকাপের জন্য তাকে আমাদের লাগবে। ব্যাস চলে যাও।’
এরপর অনেক দিন ম্যারাডোনার জন্য যোগাযোগ করার সাহস পাননি মিঙ্গুয়েয়া। অবশেষে আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের নতুন প্রেসিডেন্ট কমিশনার ডোমিঙ্গো তেসোনের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু হয়। এখানেও অভিজ্ঞতাটা ভীতিকর। ডোমিঙ্গোর সঙ্গে প্রথম দিন দেখা করতে গিয়েই বিরূপ পরিস্থিতি। টেবিলে নিজের এক কেজি ওজনের পিস্তল রেখে আলোচনায় বসলেন ডোমিঙ্গো। মিঙ্গোয়েয়াকে বললেন, ‘ভয় পেও না। বসার সময় এটা পকেটে রাখা কঠিন। তাই বের করলাম।’ কিন্তু ওই টেবিলে বন্দুক থাকা অবস্থাতেই অবশেষে ৪ জুন ১৯৮২ সালে চুক্তি সম্পন্ন হয়। রাজি হয়ে যায় আর্জেন্টিনা জুনিয়র্স ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তার কারণ টাকার অঙ্ক। ওই সময়ের বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি ৭২ লাখ ইউরোতে ম্যারাডোনা হয়ে যান বার্সেলোনার।
বার্সায় ম্যারাডোনাকে আনার পেছনে আরও একজন পরোক্ষ অবদান রাখেন। তিনি ক্লাবটির ওই সময়ের আর্জেন্টাইন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলা কাসাউস। ম্যারাডোনা দলবদলের বিশ্বরেকর্ড গড়া ফুটবলার হয়েও প্রথম বছর তার বাড়িতেই ছিলেন। কাসাউসকে ‘ফুটবলীয় পিতা’ মানতেন ম্যারাডোনা।
কিন্তু বার্সায় ম্যারাডোনার ভাগ্য ভালো ছিল না। প্রথম ম্যাচটিতে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে গোল করেছিলেন ঠিকই কিন্তু দল হারে ২-১-এ। হার দিয়ে শুরু করা ম্যারাডোনা প্রথম মৌসুম অসুস্থতাতেই কাটান। হেপাটাইটিস ধরা পড়ে তার। মৌসুমের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকেন। এই সময়ে বার্সার কোচ পরিবর্তন হয়ে দায়িত্ব পান সিজার মেনোত্তি। যিনি ১৯৭৮ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকেই দলে নেননি। কিন্তু এবার আর্জেন্টিনা কিংবদন্তিকে দলে রাখেন মেনোত্তি। ১৯৮৩’র মার্চে আবার মাঠে নামতে পারেন ম্যারাডোনা। কিন্তু ততক্ষণে বার্সা অনেক পিছিয়ে গেছে। তাই লা লিগায় চতুর্থ হয়ে শেষ করে বার্সা। যদিও ম্যারাডোনা ব্যক্তিগতভাবে ভালো করেছিলেন। ২০ ম্যাচে ১১ গোল ছিল তার।
পরের মৌসুমের জন্য নতুন উদ্যমে তৈরি হচ্ছিলেন ম্যারাডোনা ও বার্সেলোনা। কিন্তু এবারও বিপত্তি। লিগ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে গোড়ালির মারাত্মক ইনজুরিতে ম্যারাডোনা। ‘বিলবাওয়ের বুচার’ ছদ্মনাম পাওয়া আন্দোনি গোইকোতসা তখন ফাউল করেছিলেন। তাই আবারও অর্ধেক মৌসুম মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। ৮৫’র জানুয়ারিতে দলে ফিরে নিজের ছন্দেই খেলেন। কিন্তু ইনজুরির কারণে মিস হয় অনেক ম্যাচ। সেই মৌসুমে মাত্র ১৬ ম্যাচে করেছিলেন ১১ গোল।
ম্যারাডোনার বার্সায় সফল না হওয়ার ব্যাপারে তাকে ক্লাবটিতে আনা মিঙ্গুয়েয়া বলেন, ‘ম্যারাডোনা-মেসি দুজন একই রকম ফুটবলার। দুজনই নাম্বার ১০। আর্জেন্টিনায় এই পজিশনটা এমনিতেই গুরুত্বের। কিন্তু ব্যাপার হলো এখানে (বার্সা) আসার পর ম্যারাডোনার ভাগ্যটা খারাপ হয়ে যায়। সে অসুস্থতা ও ইনজুরিতে পড়ে একাকী সময় পার করে। তাই নিজেকে ঠিকভাবে মেলে ধরতে পারেনি। ম্যারাডোনা নিজেকে মেলে ধরতে পারে নাপোলিতে গিয়ে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে এই দুর্ভাগ্যে পড়তে হয়নি।’