আরব বসন্তের উত্তাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া। আরবের তরুণরা আরব বসন্তের সময়ই প্রথমবার প্রযুক্তিকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পায়। নিজ স্থান থেকে স্বৈরশাসক ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার স্বাধীনতা দিয়েছিল স্মার্টফোন। বিক্ষোভের আগুনে উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অনেক শাসকের মসনদ পুড়ে যায়। কেউ নিজেই পদত্যাগ করেন, আর কাউকে জোর করে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয়।
ফেইসবুক, ইউটিউব ও টুইটার সয়লাব হয়ে যায় গণউত্থানের বুলি ও ছবিতে। যে প্রযুক্তির সাহায্যে বিক্ষোভকারীরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল, কষ্টকর হলেও সত্যি যে, সেই প্রযুক্তিই এখন অনেক দেশের বিক্ষোভকারীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আরব বসন্ত পূর্ববর্তী ও অন্তর্বর্তী সময়েও সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর কোনো সেন্সরশিপ জারি করেনি শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু এখন আরব অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশেই সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপ জারি করা হয়েছে। বহু ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও গণতন্ত্রপন্থিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার জন্য। আরব বসন্তের ওই ডিজিটাল উত্থানে ‘হ্যাশট্যাগ প্রটেস্ট’ বেশ গুরুত্ব বহন করেছিল। ওয়ালস্ট্রিট থেকে শুরু করে হংকংয়ের আমব্রেলা মুভমেন্ট ও ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনেও আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তিমত্তা দেখতে পেয়েছি। মূলধারার গণমাধ্যম প্রায় অকার্যকর বা কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারেনি আন্দোলন প্রশ্নে।
স্মার্টফোনের উন্নত ভিডিও ব্যবস্থাপনার কারণে বিক্ষোভকারীরা সহজেই ফ্ল্যাশমব করে তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। আন্দোলনের মুহূর্তের আপডেট ছড়িয়ে পড়ছিল সর্বত্র, যা শাসকশ্রেণির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিউনিসিয়ার সাবেক অ্যাক্টিভিস্ট সামি বেন ঘারবিয়া এএফপিকে বলেন, ‘ব্লগ এবং সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আমাদের আন্দোলনের ট্রিগার ছিল না। কিন্তু আমাদের বিক্ষোভকে তারা সমর্থন করেছিল। ওই সময় যোগাযোগের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ছিল ভয়ানক হাতিয়ার।’ আরব বসন্তে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার দেখে শঙ্কিত শাসকগোষ্ঠীও ক্রমশ প্রস্তুতি নিচ্ছিল আঘাত হানার, যা আমরা ২০১৯ ও চলতি বছরে আলজেরিয়া, সুদান, ইরাক ও লেবাননের আন্দোলনের সময় দেখতে পাই। তথ্যযুদ্ধে স্মার্টফোনের ক্যামেরা হলো আন্দোলনকারী নাগরিকদের হাতিয়ার। তারা শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের প্রমাণ ধরে রাখতে শুরু করে স্মার্টফোন দিয়ে। শাসকের নাকের সামনে দিয়ে অবাধে তথ্য প্রকাশ হচ্ছিল, কিন্তু তাদের করার কিছু ছিল না। তবে একদল পর্যবেক্ষকের মতে, আরব বসন্তের সময়ে আন্দোলনে স্মার্টফোন ব্যবহার একদিকে যেমন ইতিবাচক ফল আনে, তেমনি আল কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের প্রচার ও প্রসারে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করতে শুরু করে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইএস তার মতাদর্শিকদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষিত করতে পারছে এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে।