প্রতিবন্ধীর মর্যাদা ও অধিকার

অন্য দশজন মানুষের মতো প্রতিবন্ধীরাও সমাজের সম্মানিত নাগরিক। তাদের অক্ষমতা লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, সহানুভূতি দেখানো এবং কোমল আচরণ করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য। তাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও রসিকতা করা কঠিন অপরাধ। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন রাসুল (সা.)।

একমাত্র আল্লাহতায়ালাই পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মানুষের ভেতর এই অনুভূতি জাগ্রত করতেই পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা স্বাভাবিকের পাশাপাশি ব্যতিক্রমও সৃষ্টি করেছেন। স্বাভাবিক মানুষগুলো যেন শিক্ষাগ্রহণ করে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। আর আল্লাহ যাদের প্রতিবন্ধী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাদের জন্য বিনিময়ে রেখেছেন তার সন্তুষ্টি, দয়া, ক্ষমা এবং জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত। নবী (সা.) বলেন, “আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি যার দুই প্রিয় বস্তু (দুই চোখ) নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধরে এবং নেকির আশা করে, তাহলে আমি তার জন্য এর বিনিময়ে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হই না’।” (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০১)

প্রতিবন্ধীর মর্যাদা

আল্লাহর কাছে প্রতিবন্ধীর মর্যাদা অনেক বেশি। প্রতিবন্ধীর প্রতি ভ্রƒক্ষেপ করতে দেরি করার কারণে স্বয়ং রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে আল্লাহতায়ালা মৃদু তিরস্কারের সুরে কথা বলেছেন। একদিন রাসুল (সা.) কুরাইশ নেতাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা.) এসে রাসুল (সা.)-কে কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করেন। রাসুল (সা.) অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কুরাইশ নেতাদের সামনে এভাবে চলে আসা তিনি অপছন্দ করেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা.) দৃষ্টিহীন হওয়ায় তা আঁচ করতে পারেননি। কিছুক্ষণ পরই এ বিষয়ে আয়াত নাজিল হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি ভ্রু কুঞ্চিত করেছেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি এসেছেন।’ (সুরা আবাসা, আয়াত : ১-২)

এ ঘটনার পর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের সঙ্গে দেখা হলে নবী করিম (সা.) বলতেন, ‘তাকে স্বাগতম, যার ব্যাপারে আমার রব আমাকে তিরস্কার করেছেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি, খ- ১৯, পৃষ্ঠা ১৮৪)

বিধিবিধানে ছাড়

অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য শরিয়তের বিধিবিধান পালনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক ফরজ বিধান তাদের সাধ্যের ওপর নির্ভর করবে। তাই নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো প্রতিবন্ধীদের জন্য পালন করা আবশ্যক নয়। মানসিক ভারসাম্যহীন হলে তো কোনো বিধানই তার জন্য প্রযোজ্য নয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে অর্থাৎ, বিধিবিধান প্রয়োগ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়, নাবালেগ যতক্ষণ না সে বালেগ হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সে জ্ঞান ফিরে পায় বা সুস্থ হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০৪১)

উপহাসে নিষেধাজ্ঞা

প্রতিবন্ধীর প্রতি সহায়তার হাত না বাড়িয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া, কষ্ট দেওয়া এবং উপহাস করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন রাসুল (সা.)। তিনি বলেন, ‘যে অন্ধকে পথ ভুলিয়ে দেয় সে অভিশপ্ত।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৮৭৫)

তাদের ‘অন্ধ’ ‘বধির’ ইত্যাদি অপমানসূচক মন্দ নামে ডাকাও সম্পূর্ণ নিষেধ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা একে অন্যকে দোষারোপ কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না, ইমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট, আর যারা তওবা করে না তারাই জালিম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)

তাদের অবদান

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিবন্ধীদের অসাধারণ প্রতিভার দৃষ্টান্ত কম নয়। ইসলামের ইতিহাসেও এরকম উদাহরণ অনেক। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন সময় রাসুল (সা.)-এর অনুপস্থিতিতে তিনি সর্বমোট ১৪ বার মদিনায় রাসুল (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধে তিনি ইসলামের ঝাণ্ডা বহন করেন এবং শহীদ হন।

এছাড়াও পঙ্গু সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবালকে রাসুল (সা.) ইয়েমেনের গভর্নর হিসেবে প্রেরণ করেন। পারস্যে প্রেরিত মহানবী (সা.) এর দূত রিবয়ি বিন আমির খোঁড়া ছিলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাদাতা প্রখ্যাত তাবেয়ি মুহাম্মদ বিন সিরিন বধির ছিলেন। বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ সুনানে তিরমিজির প্রণেতা ইমাম তিরমিজি অন্ধ ছিলেন।

সোনালি যুগের সেবা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করে মুসলিম খলিফারাও প্রতিবন্ধীদের যতœ নেন। তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকার পূরণ করেন। সর্বপ্রথম দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.) সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করেন। সমাজের অসহায়, প্রতিবন্ধী লোকদের নাম এতে যুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ ভাতার ব্যবস্থা করেন তিনি।

খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ সব প্রদেশে প্রতিবন্ধীদের তালিকা তৈরির ফরমান জারি করেন। প্রতি দুজন প্রতিবন্ধীর দেখভালের জন্য একজন খাদেম নিযুক্ত করেন। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ প্রতিবন্ধীদের জন্য সর্বপ্রথম বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সেবাকেন্দ্র চালু করেন।

পরকালে

অঙ্গবৈকল্য ও প্রতিবন্ধিত্ব পৃথিবীতে আল্লাহর শক্তিমত্তার নিদর্শন। পরকালে কোনো ব্যক্তি প্রতিবন্ধী থাকবে না। সাহাবি আমর ইবনে জামুহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হই, তাহলে জান্নাতে আমি কি সুস্থ ও স্বাভাবিক পায়ে হাঁটতে পারব? তার পা পঙ্গু ছিল। রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ।

ওহুদের যুদ্ধে তিনি, তার এক ভাইয়ের ছেলে ও তাদের একজন দাস শহীদ হন। তার মৃতদেহের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুল (সা.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি যেন তোমাকে জান্নাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক পায়ে হাঁটতে দেখছি।...’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৫৫৩)

মুসলিম সমাজব্যবস্থায় প্রতিবন্ধীর দায়িত্ব নেওয়া ফরজে কেফায়া। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব পালন না করে এবং কোনো নাগরিকই তাদের সেবায় এগিয়ে না আসে, তাহলে সমাজের প্রতিটি মুসলমান গোনাহগার হবে। তাই আজকের অঙ্গীকার হোক প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা সাধ্যমতো কাজ করব। নিজের সুস্থতার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হবো এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়া করব।