স্থানীয় মানুষজন এ চরকে ঠেঙ্গারচর, জালিয়ারচর ইত্যাদি নামে ডাকলেও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘ভাসানচর’ নামটিই এখন এই চরের পরিচিত নাম। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন শুরু করা হলে রোহিঙ্গারা মৃত্যুভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করে। বাংলাদেশ সেসব পালিয়ে আসা অসহায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কক্সবাজারে জায়গা দিয়ে বিশ্বে সুনাম অর্জন করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংখ্যা, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগপর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটা অংশকে ভাসানচরে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় এক লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়ের জন্য ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে ‘আশ্রয়ণ-৩’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার, যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। বাঁধ ও জেটি নির্মাণের জন্য পরে প্রকল্প ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে হলেও, রোহিঙ্গাদের এখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাসানচরে যাওয়ার জন্য রাজি করানো যায়নি। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের দিক থেকে ভাসানচর কক্সবাজারের চেয়ে বেশি উপযুক্ত জায়গা।
অবস্থান ও দূরত্ব : বছর বিশেক আগে নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যসব চরের মতোই মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ৮ কিমি দৈর্ঘ্যরে ও ৪.৫ কিমি প্রস্থের এ চরটি জেগে ওঠে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভাসানচর বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত চরঈশ্বর ইউনিয়নে অবস্থিত। এটি নোয়াখালী সদর থেকে প্রায় ৮০ কিমি, হাতিয়া সদর উপজেলা থেকে ২৫ কিমি এবং পার্শ্ববর্তী সন্দ্বীপ উপজেলার পশ্চিম প্রান্ত থেকে ৫ কিমি দূরে অবস্থিত। চট্টগ্রাম বোট ক্লাব থেকে যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো। হাতিয়া থেকে ট্রলারে করে গেলেও প্রায় তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
ভাসানচর যাত্রা : চট্টগ্রামের বোট ক্লাব থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে আমাদের যাত্রা শুরু হয় প্রায় সকাল ১০টার দিকে। মিনিট বিশেক পরেই নদী ও সাগরের মোহনা পেরিয়ে নৌবাহিনীর বহরটি ঢুকে যায় বঙ্গোপসাগরে। আশপাশে তখন অথৈ পানি। বছরের নভেম্বর-জানুয়ারি সময়ে সাগর শান্ত থাকায় নির্বিঘেœ আমাদের যাত্রা এগোতে থাকে। তবে জানা যায় সাগর উত্তালের অন্যান্য সময়ে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ টের পাওয়া যায়। আমাদের ভাসানচরে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। ভাসানচরে পৌঁছেই চোখে পড়ে নৌবাহিনীর ‘ফরোয়ার্ড বেইস ভাসানচর’ লেখা সাইনবোর্ড যার পেছন জুড়ে আছে সবুজের সমারোহ। পার্শ্ববর্তী এলাকা হাতিয়া, সন্দ্বীপ, সুবর্ণচর থেকে স্থানীয় মানুষরা সাধারণত ট্রলারে করে ভাসানচরে আসে। আমাদের যাত্রা থেকে এবং অন্যদের থেকে জেনে বোঝা যায় ভাসানচরে যাওয়ার পথ যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সমুদ্র শান্ত থাকলে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যায়।
ভাসানচরের রোহিঙ্গা আবাসন : রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য এখানে ১২০টি ক্লাস্টার বা গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে যাতে সব মিলিয়ে থাকবে ১ হাজার ৪৪০টি শেডহাউজ। প্রত্যেকটি শেডে সামনে-পেছনে ৮টি করে আছে মোট ১৬টি করে রুম। প্রত্যেক রুমে ডাবল বাঙ্কারের ব্যবস্থা থাকায় একেক রুমে মোট চারজন করে থাকতে পারবে। কোনো পরিবারে চারের অধিক সদস্য হলে তারা আরেকটি রুম পাবে। রান্নার জন্য শেডের পাশে প্রত্যেক পরিবারের জন্য একটি করে চুলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে তিনটি করে টয়লেট এবং দুটি গোসলখানা। কক্সবাজারে যেখানে প্রতি ২০ জনে একটি করে টয়লেট, সেই তুলনায় এখানে প্রতি ১১ জনে একটি করে টয়লেটে। ১২০টি ক্লাস্টারে একটি করে মোট ১২০টি পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে তারা গৃহস্থালির কাজ করতে পারবে। ভাসানচরকে ঘিরে আছে বিশাল দৈর্ঘ্যরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা যা মাত্র ১০ মিনিটেই বৃষ্টি এলে জলাবদ্ধতা দূর করে ফেলে। দেশের যেকোনো শহরের তুলনায় এখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অনেক ভালো এবং আধুনিক। প্রকল্প পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, পুরো ভাসানচরে মোট ৪৩ কিলোমিটার পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এই জনপদে রাতে নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ১২০টি এলইডি লাইট। তিনি আরও বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জনপদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে আছে মোট ১২০টি ডাস্টবিন। রয়েছে চারটি মসজিদ, দুটি স্কুল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, ২০ শয্যা বিশিষ্ট দুটি হাসপাতাল ও তিনটি বাজার। সর্বোপরি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে যা অনুধাবন করা যায়, ভাসানচর প্রকল্পটি রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে কক্সবাজারের ক্যাম্পের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবে। বাসস্থান, কৃষিকাজের সুযোগ, পশুপালন, হাতের কাছে বাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বোপরি জীবনমানের সঙ্গে জড়িত সবকিছু নিয়ে ভাসানচর রোহিঙ্গাদের জন্য ভালো কিছু নিয়েই অপেক্ষা করছে।
ভাসানচরের নিরাপত্তা : নিরাপত্তার কথা বললেই ভাসানচরে দুই রকমের নিরাপত্তার কথা আসে; জলদস্যু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই চর একটা সময় জলদস্যুদের আখড়া ছিল বলে জানায় স্থানীয় মানুষরা। তবে ২০১৭ সালে নৌবাহিনী এই এলাকায় আসার পর থেকে ধীরে ধীরে অপরাধচক্রের অবস্থান কমে যায় এবং বর্তমানে তা নেই। এখন যে কেউ সেখানে নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারে। এমনকি কোনো ধরনের চুরি, ডাকাতি বা এ ধরনের ঘটনাও সেখানে ঘটে না। দোকানদার আবু বকর (৩২) জানান, তিনি এবং তার বাবা দুজনই এখানে থাকেন আর ব্যবসা করেন প্রায় তিন বছর ধরে। তারা কখনো চুরি দেখেননি। এমনকি দোকান খুলে নামাজে গেলেও কখনো চুরির ঘটনা ঘটেনি। সুতরাং বলা যায় বর্তমানে নৌবাহিনীর অবস্থানের পর থেকে ভাসানচরে জলদস্যু ও চুরি-ডাকাতি থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। লেফটেন্যান্ট রশিদ জানান, এ অঞ্চলে এখন কোনো ধরনের অপরাধচক্রের উপদ্রব নেই এবং রোহিঙ্গারা এলে একটি অপরাধমুক্ত সুস্থ পরিবেশ পাবে বলেই তাদের বিশ্বাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকে এ অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে প্রকল্প পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, তারা বিগত ১৭১ বছরের ঘূর্ণিঝড় পর্যালোচনা করেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে কখনো কোনো ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র যায়নি। তবুও তারা সবরকমের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েছেন। ১২০টি ক্লাস্টারের প্রত্যেকটিতে একটি করে মোট ১২০টি পাঁচতলাবিশিষ্ট শেল্টার হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে। নৌবাহিনীর বরাতে জানা যায়, প্রত্যেকটি শেল্টার হাউজ ঘণ্টায় ২৬০ কিমি বাতাসের মধ্যেও টিকে থাকবে। বন্যা, জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার জন্য চরের চারপাশ ঘিরে ৯ ফুট উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হবে বলে জানিয়েছেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা। বাঁধের ৫০০ মিটার দূরে পানিতে নির্মাণ করা হয়েছে শো’র প্রোটেকশন, যাতে করে সমুদ্রের বড় ঢেউগুলো ভেঙে যায় এবং বাঁধ অক্ষত থাকে।
রোহিঙ্গাদের আগমনের অপেক্ষা : গত তিন বছরে নোয়াখালীর ভাসানচর একটি সাধারণ চর থেকে পাল্টে গিয়ে সবরকমের সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তাসহ মানুষের বসবাসযোগ্য একটি আধুনিক শহরের সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠেছে। তবুও এখনো রোহিঙ্গারা এ অঞ্চলে যেতে রাজি হচ্ছে না। তাদের অতীতের দুঃসহ স্মৃতি এবং এ অঞ্চলের বসবাস করা সম্ভব কি না এমন ভয় তাদের রাজি না হওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ভাসানচর সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরির জন্য ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের ৪০ জনের একটি প্রতিনিধিদল ভাসানচর ঘুরে আসে। তারা সরেজমিন ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধা অবলোকন করে। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা এ অঞ্চলে আসতে ভয় পাচ্ছে কারণ তারা নিশ্চিত নয় যে এখানে বসবাস করা আদৌ সম্ভব কি না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু মানুষও যদি অস্থায়ীভাবে তাদের সঙ্গে কিছুদিন থাকে তাহলে তারা আস্থা পাবে। পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জিত হলে তারা আবার নিজস্ব এলাকায় ফিরে যাবে। ভাসানচরে গিয়ে দেখা যায় সেখানে এখনো অস্থায়ীভাবে কিছু শ্রমিক, রাখাল ও ব্যবসায়ী বসবাস করছেন। তারা ভাসানচরকে বসবাসযোগ্য একটি আদর্শ শহর হিসেবে মনে করেন। রাখাল যুবক মইনউদ্দিন (২৮) বলেন, রোহিঙ্গারা না আসতে চাইলে সরকার যদি অনুমতি দেয় তবে তারাই তাদের পরিবার নিয়ে সব সুবিধা নিয়ে ভাসানচরে চলে আসতে চায়। তাদের ভাষ্যমতে, ভাসানচর রোহিঙ্গাদের জন্য সবরকমের দিক থেকেই বসবাসের জন্য ভালো একটি জায়গা হবে।
পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয়দানের জন্য ভাসানচরে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা, ৭৫০ ফুট গভীর থেকে আসা নিরাপদ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল, কৃষি, পশুপালন, ধর্মীয় উপাসনালয়, সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে সবুজে আচ্ছাদিত নির্মল পরিবেশ সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কক্সবাজারের তুলনায় ভাসানচর অনেক বেশি উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করবে এমনটা দাবি করাই যায়।
লেখকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক