আট মাস আগে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় করোনা মোকাবিলায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ১১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যেই আবার প্রকল্পের সংশোধনী আনা হচ্ছে। ব্যয় বাড়ছে এক লাফে পাঁচগুণ। অর্থাৎ ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকার প্রকল্প গিয়ে ঠেকছে ৬ হাজার ৮১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়। টাকার অঙ্কে ব্যয় বাড়ছে ৫ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। সংশোধনী প্রস্তাবে দুটি গাড়ির ভাড়া বাবদ চাওয়া হয়েছে ১৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আর শুধু তাই নয়, এমন অনেক খাতেই অস্বাভাবিক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এ পরিস্থিতিতে শিগগিরই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হতে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডামিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ শীর্ষক প্রকল্পটির সংশোধনীতে মোট ৬ হাজার ৮১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বা জিওবি ২১২ কোটি ৭৩ লাখ এবং বিশ্বব্যাংক ও চীনের সংস্থা এআইআইবির ঋণ ৬ হাজার ৬০৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। চলতি বছর এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন নাগাদ এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানবজীবনে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সরকার দ্রুততম সময়ে সঠিক কৌশল অনুসরণ করায় এখন পর্যন্ত এ দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। তবে এ অনাহূত দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের জরুরি সহায়তা তহবিল থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এমতাবস্থায় এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যেই বাংলাদেশের করোনা মোকাবিলায় এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকটার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিশ্বব্যাংকের কো-লিডিংয়ে এআইআইবি এ অর্থ প্রদান করবে। বাস্তবায়নের জন্য নতুন কার্যক্রম চিহ্নিতপূর্বক তা প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে করোনা ভ্যাকসিন কেনা বাবদ বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুত ৫০ কোটি ডলারের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া করোনাভাইরাসের ধরন বারবার পরিবর্তন হওয়ায় তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, করোনা পরিস্থিতির শুরুতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যে যথাযথ চাহিদা নিরূপণ করে এবং যথেষ্ট পর্যালোচনা করে ডিপিপি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে ডিপিপিতে বিদ্যমান অসংগতি দূর করা এবং নতুন নতুন চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিপিপি সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুততার সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল বলে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে বাস্তবায়নকারী সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাবনাতে কিছু অসংগতি লক্ষ করা গেছে। এগুলো নিয়ে পিইসি সভায় ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।’
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পে সংশোধনীর মাধ্যমে ভ্যাকসিন কেনা, পরিবহন ও সংরক্ষণ বাবদ ৪ হাজার ৩১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু পরিমাণ বা একক মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। এ ক্রয় ও বিতরণ কার্যক্রম ধাপে ধাপে সম্পাদন করা হবে। কোন দেশ থেকে কী উপায়ে বা কতদিনের মধ্যে ভ্যাকসিন আনা হবে এবং তা কোন নিয়ম অনুসরণ করে প্রদান করা হবে তার একটি সমন্বিত ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা থাকা উচিত। কিন্তু সংশোধনী প্রস্তাবে তা নেই। পরিকল্পনা কমিশন সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (আরডিপিপি) তা সংযুক্ত করতে বলবে।
প্রকল্পটির বাৎসরিক বরাদ্দ বিভাজনে প্রকল্পটির অনুকূলে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে ভ্যাকসিন ও অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য কত টাকা ব্যয় হবে এবং অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে প্রস্তাবনায় কিছু বলা হয়নি, যা পিইসি সভায় আলোচনা হবে।
আগে কোনো সুপারিশ না থাকা সত্ত্বেও সংশোধিত ডিপিপিতে পরামর্শক বা কনসালটেন্সি (টেলিমেডিসিন) খাতে ১৫ কোটি টাকা, নন-রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং (রেনোভেশন) খাতে ৭ কোটি ১১ লাখ টাকা, নন-রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিংস খাতে ৩১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং সিঅ্যান্ডএফ খাতে আড়াই কোটি টাকা, ম্যানেজমেন্ট চার্জ ৫০ লাখ এবং রি-এজেন্ট, পিসিআর ও র্যাপিড টেস্ট কিট বাবদ ৩১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার সংস্থান রেখে নতুন খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পিইসি সভায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
এছাড়া প্রকল্পের রাজস্ব ব্যয় খাতেও বেশকিছু বিভাজন প্রদান করা হয়নি। এর মধ্যে সেমিনার, অডিও-ভিডিও প্রডাকশন, বইপত্র ও প্রকাশনা, স্থানীয় প্রশিক্ষণ, প্রিন্টিং ও বাইন্ডিং, কনসালটেন্সি ও ভোগ্যপণ্য রয়েছে। এগুলোর বিভাজন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সেমিনার/ওয়ার্কশপ খাতে ব্যয় আড়াই কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সভায় জানতে চাওয়া হবে।
মূল প্রকল্পে আউটসোর্সিং (পিআইইউ) খাতে ৯৯ লাখ টাকা ও কনসালটেন্সি (পিসিআর, আইসিএস) খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত ডিপিপিতে তা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১ কোটি ৯৬ লাখ ও ৯২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর যৌক্তিকতা সভায় জানতে চাওয়া হবে।
প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশোধিত ডিপিপিতে মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং আসবাবপত্রের মূল্য যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের কথা থাকলেও মূল অনুমোদিত ডিপিপি অপেক্ষা তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমএসআর খাতে ১ হাজার ১৭৬ কোটি এবং মেডিকেল যন্ত্রপাতি খাতে ২০২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া সংশোধিত প্রকল্পে কম্পিউটার সফটওয়্যার খাতে বরাদ্দকৃত ৪.৭৫ কোটি টাকার মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪.২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। জুন ২০২০ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিভূত অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এমএসআর থেকে ইতিমধ্যে ৫০.৩২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অডিও-ভিডিও/ফিল্ম প্রোডাকশন খাতে ১ কোটি ৪৩ লাখ এবং মেডিকেল মেশিনারি খাতে ৫৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে যানবাহন ভাড়া বাবদ ৬০২টি গাড়ির জন্য ৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। নতুন প্রস্তাবে ভাড়া গাড়ির সংখ্যা হ্রাস করে দুটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু ভাড়া বাবদ সংস্থান রাখা হয়েছে ১৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া ডাবল কেবিন পিকআপ একটির বদলে দুটি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মূল্য প্রাক্কলনে ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে। এটি সংশোধন করা আবশ্যক। প্রকল্পের আওতায় ২৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন, আইইডিসিআর এবং বিআইটিআইডিতে স্থাপন, একটি মোবাইল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব, প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন, ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ শষ্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের কথা রয়েছে। এছাড়া প্রতি জেলা সদরের হাসপাতালে ২০ শয্যায় আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করা হবে।