জুলিয়ান কোপকের অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরা

সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন হ্যান্স উইলিয়াম ও মারিয়া দম্পতি। পেশাগত কারণে জার্মানি ছেড়ে পেরু চলে গিয়েছিলেন তারা। সেখানেই তাদের একমাত্র কন্যা জুলিয়ানের জন্ম এবং ১৭ বছর বয়সে সেখানেই এক নির্মম দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। নিশ্চিত মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে তার ফিরে আসার গল্প লিখেছেন পরাগ মাঝি

জুলিয়ানের বাবা-মা

হ্যান্স উইলিয়াম কোপকে এবং মারিয়া র‌্যাডেকির মধ্যে প্রথম চোখাচোখি হয় জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব কিয়েলে। তারপরই তারা প্রেমে পড়েন এবং বিয়ে করেন। পড়াশোনার খাতিরেই এই দম্পতি একসময় নিজেদের দেশ জার্মানি ছেড়ে পেরুতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। কারণ তারা যেসব বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন সেই অনুযায়ী ক্যারিয়ার গড়তে আমাজন জঙ্গলের দেশ পেরুই ছিল উপযুক্ত ঠিকানা। প্রাণিবিদ্যা, পাখিবিদ্যা এবং সরীসৃপ-সংক্রান্ত বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন হ্যান্স। সরীসৃপবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়েছিলেন মারিয়াও।

১২ লাখ ৮৫ হাজার বর্গমাইল আয়তনের পেরুর ৭০ ভাগই আমাজন জঙ্গলের অংশ। তাই দেশটিতে গাছপালা, পশুপাখি এবং বিভিন্ন ধরনের সরীসৃপ নিয়ে গবেষণা করার জন্য খুবই উপযুক্ত জায়গা ছিল হ্যান্স-মারিয়া দম্পতির জন্য। পেরুতে অবস্থান করে এই দম্পতি যৌথভাবে বেশ কটি বইও লিখেছেন।

১৯৫৪ সালের ১০ অক্টোবর কোপকে দম্পতির ঘর আলো করে পেরুতেই জন্ম নেয় তাদের মেয়ে জুলিয়ান। পেরুর রাজধানী লিমায় অন্য শিশুদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, শিশু বয়স থেকেই গবেষক বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমাজন জঙ্গল সম্পর্কিত বিচিত্র জ্ঞান লাভ করেন।

লিমায় অবস্থিত ‘মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরি’-তে কাজ করতেন হ্যান্স ও মারিয়া। জুলিয়ানের যখন ১৪ বছর বয়স তখন তারা তাদের কাজের অংশ হিসেবে আমাজন জঙ্গলের গহিন অঞ্চল পুকাল্পার পাঙ্গুয়ানা জীববৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রে কিছুদিন অবস্থান করেন। এ সময় জুলিয়ানও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সেখানে বন্য পরিবেশে টিকে থাকা এবং জঙ্গলের নানা পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন তিনি। যদিও বাবা-মাকে রেখেই কিছুদিনের মধ্যেই তাকে আবারও লিমায় ফিরতে হয়। কারণ লিমার একটি জার্মান স্কুলে তিনি পড়াশোনা করতেন। এই স্কুল থেকেই ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি স্নাতক হন।

ক্রিসমাসের ছুটি

১৯৭১ সালে ক্রিসমাসের দুদিন আগেই জুলিয়ানের স্নাতক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তাই মায়ের সঙ্গে তিনি তখন লিমাতেই ছিলেন। আর তার বাবা হ্যান্স ছিলেন পাঙ্গুয়ানার জীববৈচিত্র্য কেন্দ্রে। তাই পরিবারের সবাই মিলে ক্রিসমাসের ছুটি কাটানোর জন্য পাঙ্গুয়ানায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জুলিয়ানের মা মারিয়া। তিনি কয়েক দিন আগেই সেখানে চলে যেতে চেয়েছিলেন, যেন ক্রিসমাসের ছুটি উপলক্ষে যাত্রাপথের ভিড় এড়ানো যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি সম্ভব হয়নি জুলিয়ানের স্নাতক অনুষ্ঠানের জন্য। স্নাতক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরদিন ২৪ ডিসেম্বরেই পুকাল্পাগামী একটি বিমানে চড়ে বসেন মা-মেয়ে। ক্রিসমাসের ছুটি থাকায় খুব কষ্ট করে তারা এমন একটি বিমান সংস্থার টিকিট কেটেছিলেন, যার অতীত রেকর্ড খুব একটা সুবিধার নয়। কিন্তু মা-মেয়ের মন পড়েছিল পাঙ্গুয়ানায়, যেখানে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন হ্যান্স।

ফ্লাইট বিলম্ব হওয়ার কারণে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকার পর লিমার জর্জ শ্যাভেজ ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর থেকে ‘এলএএনএসএ ফ্লাইট ৫০৮’-এ চড়ে বসেন মারিয়া ও জুলিয়ান। যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে মোট ৯১ জন ছিলেন বিমানটিতে। সবাই যার যার আসনে বসার পর বিলম্ব হওয়ার জন্য যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন কেবিন ক্রু। বিমানটি উড্ডয়নের আগে আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার। কিন্তু আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নীল আকাশের রং হঠাৎ করেই কালো হতে শুরু করে। তুমুল এক ঝড়ের কবলে পড়ে হঠাৎ করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে বিমানের যাত্রী থেকে শুরু করে কেবিন ক্রুরাও। এ অবস্থায় বিমানচালকদের কাছে দুটি উপায় ছিল। প্রথমত, বিমানটিকে ফিরিয়ে এনে জরুরি অবতরণ করা। আর দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি সত্ত্বেও যাত্রা অব্যাহত রাখা। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় উপায়টিকেই বেছে নিলেন পাইলট। কারণ ক্রিসমাসের ছুটি উপলক্ষে যাত্রীদের অনেকেই যত দ্রুত সম্ভব তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হতে চাইছিলেন। পুকাল্পা থেকে বিমানটি তখন মাত্র ৩৫ মিনিটের দূরত্বে।

সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা

ঝড়ো মেঘকবলিত বিমানটি প্রায় ২১ হাজার ফুট ওপরে তখন। হঠাৎ করেই লোডশেডিংয়ের মতো বিমানের সব লাইট নিভে যায় এবং বিমানটি কাঁপতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র আওয়াজ তুলে বিমানটির ছাদ উড়ে যায়। বিমানের মধ্যে থাকা অসংখ্য লাগেজ, প্রিয়জনের জন্য কেনা যাত্রীদের উপহারসামগ্রী এবং ক্রিসমাস কেকগুলো নিমিষেই মিলিয়ে যায় বাতাসে। সব যাত্রীই আসনের বেল্টে নিজেদের আটকে রেখেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতর হতে শুরু করে। বিশৃঙ্খলার মধ্যেই জুলিয়ান ও মারিয়া জানালা দিয়ে দেখতে পান একটি বজ্রপাত বিমানটির তেলের ট্যাংকিতে আঘাত হেনেছে এবং এর মধ্য থেকে ধাতব উপাদানসহ জ্বলন্ত অগ্নিকাণ্ড বিমানের ডান পাখাটিকে গিয়ে আঘাত করেছে। যাত্রীদের কারও বুঝতে বাকি নেই যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মৃত্যুকে বরণ করে নিতে যাচ্ছেন। এবার নিচের দিকে নামতে শুরু করে বিমানটি। মাটি থেকে ১০ হাজার ফুট ওপরে থাকা অবস্থায় খাঁড়া হয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে নিচের দিকে ছুটতে থাকে।

এদিকে, পুকাল্পা বিমানবন্দরে অধীর হয়ে বসেছিলেন হ্যান্স। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে তার দেখা হওয়ার কথা। বেশ কয়েক মাস ধরেই তারা তার কাছ থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরও ফ্লাইট-৫০৮ বিমানটির দেখা নেই। হ্যান্সের মতো আরও অনেকেই প্রিয়জনদের অপেক্ষায় বসেছিলেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করে। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন বিমানটি হয়তো দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে। কিন্তু এ আশঙ্কাকে মনের মধ্যে ঠাঁই দিতে পারছিলেন না হ্যান্স। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি তার বাসস্থানে ফিরে আসেন। বড়দিন উদ্যাপনের জন্য তিনি একটি ‘ক্রিসমাস ট্রি’ এনে রেখেছিলেন। বিদেশের মাটিতে এই বুনো পরিবেশে স্ত্রী-কন্যা ছাড়া তার আর কেউ নেই। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা ভাবতেও পারছিলেন না হ্যান্স। নিজেকেই দোষারোপ করছিলেন। কারণ স্ত্রী-কন্যার পরিবর্তে তিনিই যদি লিমায় গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিতেন, তবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। স্ত্রী-কন্যার হদিস জানতে সারারাত না ঘুমিয়ে ছটফট করেন তিনি। সকালবেলায় জানতে পারেন ঝড়ের কবলে পড়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে আমাজন জঙ্গলের কোথাও গিয়ে পড়েছে। কিন্তু কোথায় গিয়ে পড়েছে তা এখনো অজানা। আমাজনের মতো গহিন জঙ্গলে এটি খুঁজে বের করাও সহজ ব্যাপার নয়!

মা-মেয়ের ভাগ্যে যা ঘটে

বিমানটি যখন উপুড় হয়ে মাটির দিকে পড়ছিল তখন এটি আকাশের মধ্যেই টুকরো টুকরো হয়ে যেতে শুরু করে। আসনসহ কিংবা আসনের বেল্ট ছিঁড়ে যাত্রীরা দিগ্বিদিক উড়ে যাচ্ছিলেন। বাতাসের প্রচণ্ড চাপে চোখ মেলতেই পারছিলেন না জুলিয়ান। তিনি তার আসনের মধ্যেই বেল্টে আটকে ছিলেন, তবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। আসনে বসেই তীব্র বেগে মাটির দিকে পড়ে যাচ্ছিলেন।

এরপর যখন চোখ খুললেন, দেখলেন তিনি একটি জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছেন। নড়াচড়া করতে পারছেন না। তার একটি কণ্ঠা হাড় ভেঙে গেছে। ডান হাতে একটি গভীর ক্ষত হয়েছে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন তিনি। তখনো তার শরীরটি বিমানের আসনের সঙ্গে বাঁধা। কোনোক্রমে এটি থেকে নিজেকে মুক্ত করেন। তিনিই ছিলেন বিধ্বস্ত বিমানটির একমাত্র বেঁচে যাওয়া যাত্রী। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য আরও বহু পথ তখনো বাকি!

জুলিয়ান যেখানে গিয়ে পড়েছিলেন, আমাজনের সেই গহিন অঞ্চল থেকে একজন সুস্থ সবল মানুষের ফিরে আসাই প্রায় অসম্ভব। কারণ এর কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে লোকালয়ের কোনো চিহ্নই নেই। আর জঙ্গল-পরিপূর্ণ নানা বিষাক্ত সাপ, পোকা-মাকড় ও জীবজন্তুতে। জুলিয়ানের কাছে কোনো খাবারও নেই। তার পরনের স্কার্ট এবং জামাটি ছিঁড়ে চৌচির। কাছের জিনিস ঝাপসা দেখার জন্য তিনি চশমা ব্যবহার করতেন। কিন্তু চশমাটিও হারিয়ে গেছে দুর্ঘটনায়। কিন্তু তার যা ছিল, তা হলো তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে জঙ্গলে টিকে থাকার জ্ঞান। জ্ঞান ফেরার পর হন্যে হয়ে তিনি তার মাকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও তার হদিস মেলেনি। মায়ের সম্ভাব্য মৃত্যুর কথাই ভাবছিলেন তিনি। আর ভাবছিলেন, কীভাবে তিনি বেঁচে থাকবেন!

জুলিয়ানের বেঁচে ফেরা

মাকে যখন কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন জঙ্গলের মধ্যে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন জুলিয়ান। লোকালয়ের সন্ধানে তিনি পথ চলতে শুরু করেন। যদিও শরীরে শক্তি বলতে অবশিষ্ট কিছু নেই আর। বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে যে পথ ধরে হাঁটছিলেন সেদিকে তিনি তার একটি জুতো ছুড়ে মারছিলেন, যেন কোনো বিষাক্ত সাপ সেখানে অবস্থান করলে ভয় পেয়ে নড়েচড়ে ওঠে। বেঁচে থাকার নানা কৌশল জানা থাকলেও তার কাছে কোনো রসদ-সরঞ্জাম ছিল না। মিনি স্কার্টের জন্য পা উন্মুক্ত থাকায় তাকে অসংখ্য পোকা-মাকড়ের কামড় খেতে হয়েছে। তার কাছে কোনো চাকু না থাকায় পামগাছ কেটে এর ভেতরের মিষ্টি অংশও খেতে পারছিলেন না। কোনো লাইটার না থাকায় আগুন জ্বালিয়ে উদ্ধারকর্মীদের নিজের অবস্থান জানাতে ধোঁয়া সৃষ্টি করাও সম্ভব ছিল না। এভাবেই কয়েক দিন কেটে যায় তার। এই কয়েক দিনে তিনি ঘুমোতেও পারেননি পোকার কামড়ে।

চার দিন পর বিধ্বস্ত বিমানটির একটি ভাঙা অংশ দেখতে পান জুলিয়ান। এই অংশটিতে বেশ কয়েকটি আসন ছিল। আসনগুলোতে কয়েকটি লাশ পড়েছিল শুধু। তবে, আশপাশে চোখ বুলিয়ে তিনি একটি ক্রিসমাস কেক খুঁজে পান। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত জুলিয়ান ছুটে গিয়ে দেখতে পান কেকটি প্রায় পুরোপুরি সাবাড় করে ফেলেছে পিঁপড়া। তবে, এর কাছেই তিনি ললিপপের একটি অক্ষত প্যাকেট দেখতে পান। এগুলো সঙ্গে নিয়ে আবার এগোতে শুরু করেন। শিগগিরই তিনি একটি জলধারার শব্দ শুনতে পান। আমাজন থেকে বেঁচে ফেরার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ জুলিয়ান তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে জেনেছিলেন পেরুভিয়ানরা সাধারণত কোনো নদী কিংবা স্রোতোধারার কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করেন। বাবার শিখিয়ে দেওয়া কৌশল হিসেবে তিনি যেদিকে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে সেদিকে হাঁটতে শুরু করেন। প্রায় হাঁটু-সমান পানি ছিল ওই স্রোতোধারাটিতে। এখানেও রয়েছে বিপদের আশঙ্কা। কোনো বৈদ্যুতিক ইল মাছের শক যেন না খেতে হয় সেজন্য তিনি একটি লাঠি হাতে নিয়ে চলার পথে শব্দ করে করে এগোতে থাকেন। এ ধরনের স্রোতোধারায় কুমির আর অ্যানাকোন্ডার মতো ভয়ংকর প্রাণী থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। সৌভাগ্যক্রমে একটি কুমিরের হাত থেকে তিনি বেঁচেও যান।

স্রোতোধারার ওই পানি ছিল খুব ময়লা। এই ময়লা পানি জুলিয়ানের ক্ষতগুলোকে আরও নাজুক করে তোলে। মাঝেমধ্যে কোমর-সমান গভীর পানি পেরিয়েও তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। এভাবেই চেতন আর অচেতনের মধ্য দিয়ে কেটে যায় ১১ দিন। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছিলেন না। তবু জীবনকে টেনে নিয়ে যেতে থাকেন বাঁচার আশায়। একাদশতম দিনেই তিনি হঠাৎ একটি নৌকা দেখতে পান। নৌকাটির মধ্যে কোনো মানুষ নেই। নৌকার ইঞ্জিনের মধ্যে পেট্রল খুঁজে পান। বাবা তাকে বলেছিলেন, ক্ষতস্থান থেকে রোগ-জীবাণু তাড়ানোর ক্ষমতা আছে পেট্রলের। তাই নিজের ক্ষতস্থানগুলোতে তিনি পেট্রল ঢেলে দেন। এতে তার ডান হাতের ক্ষত থেকে বড় বড় ৩৫টি পোকা বেরিয়ে আসে। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও দুর্বল শরীর নিয়ে আর কোথাও না গিয়ে তিনি নৌকার মধ্যেই শুয়ে পড়েন। পরে ওই নৌকা থেকেই তাকে উদ্ধার করে কাছাকাছি একটি গ্রামে নিয়ে যান এক ব্যক্তি। প্রাণে বেঁচে যান জুলিয়ান।

মেয়েকে জীবিত খুঁজে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন হ্যান্স। বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন জুলিয়ান। পরে দুর্ঘটনাস্থল খুঁজে বেড়ানো উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে তিনি যোগ দেন। উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পরও অন্তত ১৪ জন বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাজনের মতো গহিন জঙ্গলে টিকে থাকতে না পেরে সবাই মারা গেছেন। ওই ১৪ জনের মধ্যে জুলিয়ানের মা মারিয়াও ছিলেন!

দুর্ঘটনার কিছুদিন পরই পাকাপাকিভাবে পেরু থেকে জার্মানি চলে যান জুলিয়ান। সেখানে বাবা-মায়ের মতো তিনিও জীববিজ্ঞান বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব কিয়েলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮০ সালে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে তিনি তার আত্মজীবনী ‘হোয়েন আই ফেল ফ্রম দ্য স্কাই’ প্রকাশ করেন। বেশ কটি পুরস্কার জেতে এই বইটি। বর্তমানে তিনি তার স্বামীর সঙ্গে জার্মানির মিউনিখে বসবাস করছেন।