শরীরচর্চার গুরুত্ব

শরীরচর্চায় উৎসাহিত করে ইসলাম। দেহ সুস্থ ও কর্মক্ষম না হলে জীবনযাপনে ছন্দপতন ঘটে। তাই দেহের যথাযথ যতœ নেওয়া অপরিহার্য। ইবাদতের ক্ষেত্রেও অমানুষিক পরিশ্রম অগ্রহণযোগ্য। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ব্যায়াম এবং কায়িক শ্রমের মাধ্যমে শরীরচর্চা করার অনুপ্রেরণা কোরআন-হাদিসে বিভিন্নভাবে এসেছে।

খাবার গ্রহণ মানবদেহের জন্য আবশ্যক। তবে পরিমিত খাবার গ্রহণ করাই স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। অপরিমিত খাবার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে; শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাইপারটেশন, হাইপোটেনশন ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধি অপরিমিত খাবার থেকেই সৃষ্টি হয়। তাই ইসলাম পরিমিত খাবার গ্রহণের নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা খাও, পান করো ও অপচয় করো না।’ অর্থাৎ পরিমিত খাবার গ্রহণ করো। (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)

উদরপূর্তি করে খাওয়া নিন্দনীয়। প্রয়োজনাতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘উদরের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে (শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারে) এমন কয়েক লোকমা খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৮০)

শারীরিক শক্তি ও কায়িক সামর্থ্য আল্লাহতায়ালার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) পাঁচটি অমূল্য সম্পদ হারানোর আগে এগুলোর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। এর অন্যতম হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা। তিনি বলেন, ‘পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি বিষয়কে মূল্যায়ন করো। জীবনকে মৃত্যু আসার আগে। সুস্থতাকে অসুস্থ হওয়ার আগে। অবসর সময়কে ব্যস্ততা আসার আগে। যৌবনকে বার্ধক্য আসার আগে এবং সচ্ছলতাকে দরিদ্রতা আসার আগে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, খ- ৮, পৃষ্ঠা ১২৭; সহিহুল জামে, হাদিস : ১০৭৭)

ইবাদতে বাড়াবাড়ি করা এবং শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা নিষেধ। রাসুল (সা.) আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-কে বললেন, ‘শুনলাম, তুমি নাকি রাতভর ইবাদত করো এবং সারা দিন রোজা রাখো?’ ইবনে উমর (রা.) বললেন, ‘জি, আমি তাই করি।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি এমন করলে তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তোমার ওপর তোমার দেহের অধিকার রয়েছে, তোমার পরিবার-পরিজনেরও অধিকার রয়েছে। কাজেই তুমি রোজা রাখবে এবং বাদও দেবে। রাত জেগে ইবাদত করবে এবং ঘুমাবেও। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫৩)

রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে একবার বললেন, ‘তোমাদের কাউকেই নিজের আমল নাজাত দেবে না।’ তারা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনাকেও না?’ তিনি বললেন, ‘আমাকেও না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে তার রহমত দ্বারা আবৃত করেন। তবুও তোমরা সঠিকভাবে আমল করতে থাকবে এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে ইবাদত করবে। সাবধান, তোমরা ইবাদতে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে তবেই তোমরা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৩)

নিয়মিত শরীরচর্চার প্রতি ইসলাম উদ্বুদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তাদের মোকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত করো। তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৬০) রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)

হাঁটাহাঁটি করা শরীরচর্চার অন্যতম মাধ্যম। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) দ্রুত হাঁটতেন। আবার কখনো কখনো দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির চেয়ে দ্রুতগতিতে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৮)

দৌড়ানো শরীরচর্চার একটি মাধ্যম। মহানবী (সা.) আয়েশা (রা)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। আয়েশা (রা.) নিজেই বলেছেন, ‘নবী করিম (সা.) দৌড়ে আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করলেন। তখন আমি এগিয়ে গেলাম। পরে যখন আমার শরীর ভারী হয়ে গেল, তখন রাসুল (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আমাকে হারিয়ে দিলেন এবং তিনি বললেন, এবার আগেরবারের বদলা নিলাম।’ (মুসনাদ আহমদ ও আবু দাউদ)

কুস্তি ও শারীরিক কসরত করাও ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ। নবী করিম (সা.) রুকানা নামক এক নামকরা কুস্তিগিরের সঙ্গে লড়েছিলেন। সে ছিল খুবই বলিষ্ঠ। মহানবী (সা.) একাধিকবার তাকে পরাজিত করেছিলেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ- ৩, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০০)

সুস্থ দেহের জন্য শারীরিক পরিচর্যার পাশাপাশি হাসিখুশি থাকা ও মানসিক প্রফুল্লতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। নবীজি (সা.) নিজেও অত্যন্ত সদালাপী ও হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। সাহাবিরা বলতেন, ‘আমরা রাসুল (সা.)-এর চেয়ে হাসিখুশি আর কাউকে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪১)

এসব আয়াত ও হাদিস নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যয়ামের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।