বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানো যাবে না

১০ মে ১৯৭১, সোমবার বিকেল ৩.০৫ থেকে ৩.৩০ পর্যন্ত গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম এম আহমেদ, ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সহকারী হেনরি এ কিসিঞ্জার, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল স্টাফ হ্যারল্ড এইচ স্যান্ডার্স।

উপদেষ্টা আহমেদ গত ক’বছর পাকিস্তানের রাজনীতিতে যা ঘটেছে তার একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন। শেষে কিসিঞ্জারের অনুরোধে শেষ ক’মিনিটে ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন।

আহমেদ বললেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চাচ্ছিলেন আমি ওয়াশিংটন এসে ডক্টর কিসিঞ্জার ও অন্যদের পাকিস্তানে কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে তুলি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া উদ্বিগ্ন ছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেনাবাহিনী যেন গণপ্রতিনিধি ও বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এই লক্ষ্যে তিনি কঠোর পরিশ্রমও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে তাতে তিনি ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানে বিরাজমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন, সামরিক সমাধান নয়। ঘটনাপ্রবাহ তাই প্রমাণ করে।

১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া চাইলে সহজেই সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একটি সামরিক সমাধান দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করতে চাননি। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে দিয়েছেন, কর্তৃত্ব প্রদেশে ভাগ করে দিয়েছেন আর এতে ভারসাম্য পূর্ব পাকিস্তানের দিকে হেলে পড়েছে। তিনি ১৯৭০ সালে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচনের আয়োজন করেছেন। আহমেদ এসব উল্লেখ করেছেন মূলত এটা বোঝাতে যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বরাবরই প্রত্যাশা ছিল একটি রাজনৈতিক সমাধান।

আহমেদ বলেন, এমনকি সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে একই  দেশের কাঠামোতে তা করতে হবে এ ছাড়া কোনো ধরনের শর্ত তিনি আরোপ করেননি। নির্বাচনের পর থেকে মুজিবুর রহমান তার অবস্থান থেকে সরে যেতে থাকায় প্রেসিডেন্ট খুব হতাশ বোধ করেন। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করার প্রশ্নে মুজিবের প্রথম ইসলামাবাদ এসে বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা কিন্তু ইয়াহিয়া ঢাকা গেলেন। দ্বিতীয় এক দফা বৈঠকের আয়োজন করা হলো কিন্তু মুজিব না আসার অজুহাত খুঁজে  বের করলেন। প্রেসিডেন্ট অনুভব করলেন যে, সংসদীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটা সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন।

আসল সমস্যা হচ্ছে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আঞ্চলিক চরিত্রের। প্রেসিডেন্ট যখন আরেক দফা বৈঠক আয়োজনে সমর্থন হলেন, তিনি অনুভব করলেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা জরুরি। এই স্থগিত করার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো যদিও ছ’দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট সংসদ অধিবেশনের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৫ মার্চ (১৯৭১) ঢাকা গেলেন। আওয়ামী লীগ ছয় দফার সঙ্গে আরও চার দফা বাস্তবায়নের দাবি জানাল। বাড়তি দফাগুলো হচ্ছে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই সামরিক আইন প্রত্যাহার করে  বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। মুজিব আবার অবস্থান থেকে সরতে থাকেন। আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানের  নেতাদের পূর্ব পাকিস্তানে আসতে বলেছিলেন। আহমেদও সমস্যার অর্থনৈতিক দিক নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিষয়ভিত্তিক কিছু মতানৈক্য থাকলেও সবাই একমত হন যে, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে বের করা যাবে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সমাধানের উদ্দেশ্যে তিনটি পথ দেখান

* ছয় দফার অধিকাংশ দফা অঙ্গীভূত করে প্রেসিডেন্টের  ঘোষণার মাধ্যমে একটি অন্তর্র্বর্তীকালীন সংবিধান প্রণয়ন করা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চাইলেন আগে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বসুক, তাদের ওপর সংবিধান প্রণয়নের কর্তৃত্ব অর্পিত হোক; কিন্তু আওয়ামী লীগ সবার আগে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি জানাল।

* যদি জাতীয় পরিষদ প্রথমে বৈঠকে না বসে তাহলে  ঘোষণাবলে অন্তর্র্বর্তীকালীন সংবিধান জারি করা, তবে তখনই সামরিক আইন প্রত্যাহার করা নয়।

* ঘোষণা বলে অন্তর্র্বর্তীকালীন সংবিধান জারি করা, যা জাতীয় সংসদ প্রণীত সংবিধান গৃহীত হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা চাইলেন আগে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা একটি সাধারণ অধিবেশনে মিলিত হয়ে পরে বিভক্ত হয়ে থাক। কিন্তু আওয়ামী লীগ চাইল, শুরু থেকে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা স্ব স্ব হাউজে অধিবেশনে বসুক। এ সময় ডক্টর হেনরি কিসিঞ্জার  ফোড়ন কেটে বললেন, প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি স্টেটের সঙ্গে বৈঠকের জন্য এখনই তাকে উঠতে হবে, সেক্রেটারি অব  স্টেট তার মধ্যপ্রাচ্য সফরের প্রতিবেদন প্রেসিডেন্টের কাছে  পেশ করলেন। তিনি বললেন, আহমেদ যা বলবেন তার সবই তিনি শুনতে চান কিন্তু হাতে আছে মাত্র ১০ মিনিট সময়। কাজেই আহমেদ যেন বাকি সময়টা ভবিষ্যতে করণীয় সম্বন্ধে বলেন।

আহমেদ বললেন, এখনো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রাজনীতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতিতে অটল রয়েছেন। তিনি নতুন করে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন না। গত ডিসেম্বরের (১৯৭০) নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অপকর্মের প্রমাণ রয়েছে তাদের নিয়ে সরকার গঠন করা যাবে না। এই সরকারে মুজিবুর রহমান অন্তর্ভুক্ত হবেন কি-না কিসিঞ্জার জানতে চাইলেন।

আহমেদ বললেন, যারা পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করছেন সেই রাজনৈতিক নেতাদের প্রথম আটজনের একজন তিনি। বাকিরা তাদের দলের নাম বাদ দিয়ে (আওয়ামী লীগ তখন নিষিদ্ধ) একটি সরকার গঠন করতে পারেন। পূর্ব পাকিস্তানের বৈধ চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে ছয় দফার যতটা সম্ভব মেনে নিয়ে একটি সমঝোতার মাধ্যমে তারা কাজ করে  যেতে পারেন। কিসিঞ্জার জিজ্ঞেস করলেন ব্যাপারটা ঘটবে কখন? আহমেদ বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলেই তা সম্ভব, ক’দিনের মধ্যেই। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে।  বেসামরিক প্রশাসন পুনরুদ্ধার ও চালু করা দরকার। সীমান্তে ভারতীয় সক্রিয়তা বন্ধ করতে হবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের সহযোগিতা করবে পাকিস্তান তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকবে। কিসিঞ্জার জিজ্ঞেস করলেন সেটা কেমন করে করা হবে? নয়াদিল্লিকে আমাদের পরামর্শ শোনানোর প্রশ্নে আমাদের অগ্রগতি সামান্যই। আহমেদ বললেন, পাকিস্তান আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা চালিয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আশা করেছেন, এমন রাজনৈতিক প্যাকেজ দেওয়া সম্ভব, যা আওয়ামী লীগকে এগিয়ে আসার সুযোগ করে  দেবে। তিনি বললেন, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতার উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারবে আর সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য চায়।

কিন্তু স্টেট ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ ডেসপাচে যে মন্তব্য তার সারমর্ম হচ্ছে যে পদক্ষেপই পাকিস্তান গ্রহণ করুক বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানো যাবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই উপসংহার মানতে নারাজ প্রেসিডেন্ট নিক্সন।