পৌরসভা নয় প্রয়োজন নগর সরকার নির্বাচন

আগামী ২৮ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচন। এবারও দলীয় প্রতীকে মেয়র এবং নির্দলীয়ভাবে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপের নির্বাচনের পর আরও তিনটি ধাপে ১৬৯ পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ২৫ পৌরসভায় নির্বাচন হবে ইলেট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাপে ৬১ পৌরসভায় ভোট হবে ১৬ জানুয়ারি।

তৃতীয় ধাপেও প্রায় ৫০-এর বেশি পৌরসভায় ভোট করার চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য প্রয়োজনীয় ইভিএমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের পর ২০১৫ সালে প্রথম দলীয় প্রতীকে ভোট হয় পৌরসভায়। দেশে পৌরসভা রয়েছে মোট ৩২৯টি। আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই পৌরসভার নির্বাচন করতে হয়। ২০১৫ সালের দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত পৌরসভার নির্বাচনে ২০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং একই দিনে ভোট হয় ২৩৪টি পৌরসভায়। বাকিগুলোয় ভোট হয় মেয়াদের তারিখ বিবেচনা করে এবং অন্যান্য জটিলতা সেরে পরবর্তী সময়ে।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। দেশে বহু লোক আছেন, যারা স্থানীয়ভাবে সমাজের উন্নয়নমূলক কাজ করেন। কিন্তু দলীয় রাজনীতি করেন না। তারা স্থানীয় জনগণের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ান। সাহায্য-সহযোগিতা করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনাথ আশ্রম, প্রবীণ নিবাস গড়ে তুলেন। দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা করেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির গড়ে তুলেন। স্থানীয় ছোটখাটো ঝগড়া বিবাদের শান্তিপূর্ণ  সমাধান দেন। দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে এইসব সমাজসেবী, গণ্যমান্য, সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরোপকারী ব্যক্তিরা আর স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হতে পারছেন না। নির্বাচিত হচ্ছেন দলীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা। এতে একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে সৃষ্টি হচ্ছে দ্বন্দ্ব। বাড়ছে বিশৃঙ্খলা। বাড়ছে মারামারি, হানাহানি ও শত্রুতা। অন্যদিকে পরীক্ষিত পরোপকারী সমাজসেবকদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় জনগণ।

পৃথিবীর যেসব দেশ আজ উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে, সফলভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে সক্ষম হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, খাদ্য, পুষ্টি ও কৃষি, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন করেছে, তার মূলে রয়েছে স্বশাসিত, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এলাকার মানুষের সব খবর রাখেন। এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনার কথাও জানেন।

দেশে স্থানীয় সরকারের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের সব প্রতিনিধিই যে সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরোপকারী তাও বলা যাবে না। অনেকে এলাকায় সন্ত্রাসী লালন-পালন করেন। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও বেনামে ঠিকাদারি করেন। এসবের  কারণ হলো বাংলাদেশে এখনো স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত উৎকর্ষ সাধিত হয়নি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জালে আটকা পড়ে মাছের মতো লাফালাফি করছেন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের অপকর্মকে পুঁজি করে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন আমলারা। সরকারও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের চেয়ে আমলাদের ওপর বেশি আস্থাশীল। অপর দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কাজে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের খবরদারি এবং অযথা হস্তক্ষেপ দেশের দুর্বল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে একেবারে পঙ্গু করে ফেলেছে বললে ভুল হবে না।

বাংলাদেশে তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দেখা যায়। এক. গ্রামীণ স্থানীয় সরকার শুধু গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত, যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাবিহীন উপজেলা পরিষদ। দুই. নগরীয় স্থানীয় সরকার শুধু নগরীয় এলাকা নিয়ে গঠিত। যেমন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। তিন. গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার নগরীয় ও গ্রামীণ উভয় এলাকা নিয়ে গঠিত, যেমন জেলা পরিষদ ও পৌরসভাযুক্ত উপজেলা পরিষদ। এই সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পদ্ধতি ও গঠন এক রকমের নয়। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়ররা দলীয় প্রতীকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। উপজেলার চেয়ারম্যান দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হন। আবার ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নির্দলীয়ভাবে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নির্বাচিত হন স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে। আবার স্থানীয়  সরকারের স্তর বিন্যাস নিয়েও রয়েছে বেশ জটিলতা। একটি স্থানীয় সরকারের এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়েছে অপর একটি স্থানীয় সরকারের এলাকা। যেমন উপজেলার মধ্য অবস্থিত পৌরসভাগুলো।

দেশে ৩২৯টি পৌরসভার অধিকাংশের উন্নয়ন কর্মকা- ও কর্মচারীদের বেতনভাতার খরচ মেটানোর জন্য নিজস্ব আয়ের কোনো উৎস নেই। পৌরসভাগুলোকে অর্থের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হয়। নির্ভর করতে হয় বিদেশি সাহায্য সংস্থার ওপর। তাই পৌরসভাগুলোকে স্বাধীনভাবে নয়, কেন্দ্রীয় সরকারে স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে হয়। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই পৌরসভাগুলোর নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিশদ নগর বা অঞ্চল পরিকল্পনা। পয়ঃনিষ্কাশন, পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো আধুনিক ব্যবস্থা। পৌরবাসীরা তাদের ইচ্ছেমতো গাছপালা কেটে, জলাশয় ভরাট করে, যেখানে সেখানে বাড়িঘর, মিল-কারখানা নির্মাণ করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রভূত ক্ষতি করছেন। পৌরসভাগুলো সরাসরি নদীনালার তীরে বর্জ্য ফেলে দূষিত করছে পানি। অপরিকল্পিকভাবে পৌর এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাগুলো তরল বর্জ্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে ফেলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। ক্ষতি করছে জনস্বাস্থ্য ও উর্বর কৃষিজমির। এসবের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ পৌরসভা গঠনে কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। মানা হয়নি সরকারি নিয়মও।

আমরা যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ চাই, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ণ চাই, তা হলে বিদ্যমান ঔপনিবেশিক আমলের পৌরসভাগুলোর গঠন কাঠামো পরিবর্তন করে প্রতিটির জন্য এক ধরনের নগর সরকার গঠন করতে হবে। নগরের সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে নগর সরকারের একক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ নগর সরকার ও নগরীয়

কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরবাসীর খাদ্য, পুষ্টি, যানজট, জলাবদ্ধতা দূর করতে সক্ষম হয়েছে। নগরের শান্তিশৃঙ্খলার উন্নয়ন, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে পেরেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নগরবাসীর অনেক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর নির্বাহী সদস্য ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি ‘কার্যকর-গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে করণীয়’ শীর্ষক এক অনলাইন গোলটেবিল বৈঠকে বলেন বর্তমান স্থানীয় সরকার কাঠামো গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা চর্চার অনুকূল না হওয়ায় একদিকে যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না, অপরদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা চর্চায় থাকছে না যুগোপযোগী ভারসাম্য। প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ছে এক ব্যক্তি তথা চেয়ারম্যান বা মেয়র সর্বস্ব এবং আমলা নিয়ন্ত্রণ দিন দিন বাড়ছে। মেয়র ও চেয়ারম্যান নির্বাচন অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল। সদস্য ও কাউন্সিলর নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে গুরুত্বহীন। তাই আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে সংস্কার করে নির্বাচন পদ্ধতির সহজীকরণ এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গভীর মনোযোগ দাবি করে। সংস্কার প্রসঙ্গে তার কথা হলো সব নির্বাচন একটি একক তফসিলে করা সম্ভব। তিনি ৬টি সংস্কার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবগুলো হলো স্থানীয় সরকারের গ্রাম ও নগরের বিভক্তি ও স্তরের সংখ্যা হ্রাস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি একক আইন বা মাদার ল’, রাষ্ট্রপতি আদলের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির স্থানীয় সরকার কাঠামো, নারীর আসন সংরক্ষণ আবর্তন পদ্ধতি প্রবর্তন, একক তফসিলে সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ও গ্রামীণ পৌরসভাগুলোর বিলুপ্তি ইত্যাদি।

অপরদিকে সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভর্ন্যান্স (সিডিএজি)-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নগর সংসদ, নগর নির্বাহী বিভাগ ও নগর বিচার বিভাগের সমন্বয়ে স্বশাসিত, স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক নগর সরকার গঠন করতে হবে। নগর সরকারের নির্বাহী বিভাগের প্রধান হবেন নগরবাসীর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মেয়র। প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে একজন পুরুষ ও একজন নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন নগরবাসীদের  ভোটে। নির্বাচিত পুরুষ ও নারী কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদের মতো নগর সংসদ গঠিত হবে। নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে একজন নগর সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তার কাজ হবে অনেকটা জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো। নগর সংসদের গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে নগর নির্বাহী বিভাগ। বার্ষিক বাজেটও উত্থাপিত এবং অনুমোদিত হবে নগর সংসদে। নগরের ছোটখাটো অপরাধ ঝগড়া-বিবাদের বিচারের জন্য প্রতিটি নগরে থাকবে একটি নগরীয় আদালত। এই নগর সরকারের মেয়াদ হবে ৪ থেকে ৫ বছর। নগরবাসীর খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিটি নগরীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত নগরীয় কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে শতকরা ৩৯ ভাগ লোক নগরে বসবাস করে। ২০৫০ সালে প্রায় শতভাগ লোক নগরে বসবাস করবে এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে নগরীয় সরকার ও নগরীয় কৃষির বাংলাদেশ। তাই পৌরসভার গতানুগতিক নির্বাচন নয়, নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন স্বশাসিত, স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক নগর সরকার গঠনপূর্বক নগর সরকার নির্বাচন।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড

netairoy18@yahoo.com