পুলিশে রাইফেল যুগ শেষ

প্রকাশ্যে রাইফেল দেখিয়ে আর চলাফেরা করবে না পুলিশ। পুলিশের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে কেউ যেন আর ভয় না পান সেই উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অস্ত্র দেখে জনআতঙ্ক দূর করতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দেওয়া হচ্ছে ‘অপারেশনাল গিয়ার ট্যাকটিক্যাল বেল্ট’।

পর্যায়ক্রমে সারা দেশের পুলিশ সদস্যরাই পাবেন এই ট্যকটিক্যাল বেল্ট। ওই বেল্টের সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকবে ক্ষুদ্র পিস্তল। এতদিন পুলিশ সদস্যরা চায়নিজ রাইফেল কখনো কাঁধে ঝোলানো আবার কখনো হাতে রেখে দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। বছরের পর বছর ধরে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের এভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখে সবাই অভ্যস্ত। প্রাথমিকভাবে ডিএমপি ও সিএসপিতে কর্মরত কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের ট্যাকটিক্যাল বেল্ট দেওয়া হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটরিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে ট্যাকটিক্যাল বেল্টের কথা ঘোষণা দেবেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ।

এদিকে পুলিশের ওয়্যারলেস সেটেও আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এখন আর ওয়্যারলেস সেট হাতে নিয়ে কথা বলতে হবে না। ট্যাকটিক্যাল বেল্টে যুক্ত ওয়্যারলেস সেটের জন্য কানে হেডফোন এবং পোশাকের কলার অথবা বোতামে থাকবে স্পিকার। কোমরের বেল্টে অস্ত্র ছাড়া বাকি সবকিছু থাকবে। আর পিস্তলের জন্য নির্ধারিত চেম্বারটি ডান পাশের ঊরু বরাবর পরবেন পুলিশ সদস্যরা।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা রাইফেল ব্যবহার করে আসছিল। এ অভিযোগ দূর করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নানাভাবে চেষ্টা করছেন। মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত উন্নতমানের অস্ত্র দিতে পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। পরে আইজিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষ অনুমোদন নেন। চায়নিজ রাইফেলের পরিবর্তে ট্যাকটিক্যাল বেল্টের অস্ত্র দেওয়ার ব্যাাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। উন্নত বিশ্বে পুলিশের অস্ত্র সাধারণত প্রয়োজন ছাড়া প্রদর্শন করা হয় না। আবার এমনভাবে পুলিশ সদস্যদের কাছে সংরক্ষণ করা হয়, যেন অপরাধীদের দমনে দ্রুত সেটি ব্যবহার করতে পারে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (লজিস্টিক) ড. তৌফিক মাহবুব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ সদস্যদের মাঝে প্রায় ১০ হাজার ট্যাকটিক্যাল বেল্ট সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা চায়নিজ রাইফেল ব্যবহার করছেন। এটি বহন কষ্টসাধ্য। একই সঙ্গে কাঁধে ও হাতে বড় রাইফেল থাকায় সহজে হাত দিয়ে কিছু করা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের। চায়নিজ রাইফেলের পরিবর্তে ‘তরাস’ পিস্তল দেওয়া হবে। তরাসের পাশাপাশি অন্য ছোট পিস্তলও দেওয়া হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিশে^র বিভিন্ন দেশে পুলিশের অস্ত্র কোথায় আছে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে পুলিশ সদস্যরা অস্ত্র ব্যবহার করলে সবাই দেখতে পায়। আবার আগ্নেয়াস্ত্র দেখে অনেকে ভয়ও পান। আর সেই ভয়ভীতি কাটাতে আইজিপি বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্যাকটিক্যাল বেল্টের মূল স্লোগান হচ্ছে ‘হ্যান্ডস ফ্রি পুলিশিং’ মানে হাত খালি রাখা। এতে বড় অস্ত্র বহনের ঝক্কি-ঝামেলা আর থাকবে না। এতে পুলিশের কাজে গতি আসবে, মনোবলও বাড়বে। একই সঙ্গে পুলিশকে দেখতেও আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী লাগবে। এখন ডিএমপি ও সিএমপি পর্যায়ক্রমে সারা দেশের প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে এ ট্যাকটিক্যাল বেল্ট দেওয়া হবে। ট্যাকটিক্যাল বেল্টে ছয়টি চেম্বার থাকবে। এসব চেম্বারে থাকছে ছোট অস্ত্র, এক্সপেন্ডেবল ব্যাটন, ওয়্যারলেস সেট, ৫০০ মিলিলিটার পানির বোতল ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের জন্য পজ মেশিন। পরবর্তী সময়ে ট্যাকটিক্যাল বেল্টে বডি অন ক্যামেরা, টর্চলাইটসহ প্রয়োজনীয় আরও কিছু ফিচার যুক্ত করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওয়্যারলেস সেটেও আসছে বড় পরিবর্তন। ওয়্যারলেস সেট এখন আর হাতে নিয়ে কথা বলতে হবে না। ট্যাকটিক্যাল বেল্টে যুক্ত ওয়্যারলেস সেটের জন্য কানে হেডফোন এবং পোশাকের কলার অথবা বোতামে থাকবে স্পিকার। কোমরের বেল্টে অস্ত্র ছাড়া বাকি সবকিছু থাকবে। আর পিস্তলের জন্য নির্ধারিত চেম্বারটি ডান পাশের ঊরু বরাবর পরবেন পুলিশ সদস্যরা। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে এসব ট্যাকটিক্যাল বেল্ট। শুরুতে অপারেশনাল ফোর্স, ফুট ও মোবাইল প্যাট্রল টিম, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দেওয়া হবে। ডিএমপির সাত হাজার ও সিএমপির তিন হাজার সদস্যকে ট্যাকটিক্যাল বেল্ট দেওয়ার কথা রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা জানান, আজ মঙ্গলবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটরিয়ামে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ট্যাকটিক্যাল বেল্ট’ প্রদানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেবেন। এতে ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।