‘লাল তালিকাভুক্ত’ ৭৫ সন্ত্রাসী সক্রিয়

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের ‘লাল তালিকাভুক্ত’ (রেড নোটিস) বাংলাদেশের ৭৫ সন্ত্রাসী এখনো সক্রিয়। পালিয়ে বিদেশে অবস্থান করলেও দেশে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে তারা। তবে তাদের অধিকাংশের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। পুলিশ, র‌্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, দেশের ৬৫ সন্ত্রাসী বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের নানা দেশে পালিয়ে যায়। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রকৃত অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। তবে মাঝেমধ্যেই দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

তারা আরও জানান, সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমদে মন্টি ওরফে জিসান দুবাই পুলিশের হাতে আটক হয়। পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়ে বর্তমানে সে লন্ডনে অবস্থান করছে। সেখান থেকেই দেশে অবস্থানকারী সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তার মতোই ‘লাল তালিকাভুক্ত’ আরও অনেক সন্ত্রাসী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করাসহ অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এসব অপরাধীর অনেককেই দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চিঠি চালাচালি করা হলেও কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ইন্টারপোলের রেড নোটিস বা লাল তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সন্ত্রাসীর বিষয়ে তথ্য বিনিময় হয়ে থাকে। তার অপরাধ কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিয়ে অবস্থান শনাক্তের সহায়তা চাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো অপরাধীর অবস্থান শনাক্ত হলে তাকে ফিরিয়ে আনার কাজ করে থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে পলাতক যেকোনো অপরাধীকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আমাদের যা করণীয় তাই করা হচ্ছে।’

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কোনো সন্ত্রাসী দেশ থেকে পালিয়ে গেছে মর্মে তদন্তসংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার কাছে মনে হলে কিংবা তাকে ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়লে তার বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী ৬৫ অপরাধীর বিষয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইন্টারপোলের মাধ্যমে আরও ৯ বাংলাদেশি নাগরিকের তথ্য পাওয়া গেছে, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। এ নিয়ে ৭৫ বাংলাদেশি অপরাধীর বিষয়ে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে তথ্য দেওয়া হয়েছে। ইন্টারপোলের নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনেই তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, দুবাইয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ধরা পড়ার পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চিঠি চালাচালি করা হয়েছিল। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সফল হওয়া যায়নি। এরই মধ্যে তার অবস্থান বদলে যাওয়ায় বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে তথ্য হালনাগাদ করা হয় ইন্টারপোলের এ রেড নোটিস পাওয়া অপরাধীদের বিষয়ে। সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখা হয়। কোনো অপরাধীর অবস্থান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩ অক্টোবর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দুবাইয়ে আটক হওয়ার পরও তাকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। এক সপ্তাহের মাথায় জিসান মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পাওয়ার পর লন্ডনে চলে যায়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে তার নির্দেশ ও সহযোগিতায় দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে দুবাই থেকে দেশে আসেন শাকিল ওরফে শাকিল মাজহার। জিসানের এ ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেশে এসেছিলেন রাজনীতির মাঠে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে। টার্গেট কিলিংসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চাঁদাবাজির সমন্বয় করাসহ অপরাধ জগতের মাঠ দখলের উদ্দেশ্য ছিল তার। তবে বিষয়টি গোপনে জানতে পাওয়ায় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় শাকিল। এতে জিসানের অপরাধ সিন্ডিকেটের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়। তার বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশ ও সহযোগিতায় বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে দেশে এসেছিল শাকিল।’

র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সন্ত্রাসী জিসানের মতো বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে দেশ থেকে ৬৫ জন সন্ত্রাসী পালিয়ে বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে। তাদের অধিকাংশের অবস্থানের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের বেশিরভাগ এখন দেশে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তারা বিদেশ থেকে অর্থের জোগান দিয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টাও করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের যোগাযোগের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবির তথ্যানুযায়ী, ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড পারসনস’ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ঝুলছে দেশের পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ যুদ্ধাপরাধী, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশের পলাতক অপরাধীর নাম ও ছবি। তবে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে দেশে আনায় তেমন কোনো সফলতা নেই। এরই মধ্যে কয়েক ধাপে চিঠি চালাচালি করে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা অনেক সন্ত্রাসী আটকের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। মাঝেমধ্যে রেড নোটিস বা লাল তালিকাভুক্ত অনেক অপরাধী ভারত, দুবাই, নেপালে আটক হওয়ার তথ্য জানা যায়। বিশেষ করে ভারতে মোল্লা মাসুদ, শাহাদত, তানভীরুল ইসলাম জয়, নেপালে সুব্রত বাইন, দুবাইয়ে জিসান, আতাউর ধরা পড়লেও ওই দেশের আইনি ফাঁকফোকর গলিয়ে তারা এখন মুক্ত। বিশেষ করে বিদেশে আত্মগোপন করা সন্ত্রাসীরা একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে ফেরারি থাকছে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রায় ১০ বছর আগে নেপালে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন আটক হওয়ার পর তার কাছ থেকে পাওয়া যায় ভারতীয় পাসপোর্ট। ওই পাসপোর্টের মূলে সুব্রত বাইনকে নেপালের কাকরভিটা সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা হয় ভারতের কাছে। পাঁচ বছর আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত কলকাতা পুলিশের কাছে আটক হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শাহাদত ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাই হয়ে ইতালি চলে যায়। ফেনীর তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। আতাউর বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইয়ে আত্মগোপনে আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে ‘রেড নোটিস অব ওয়ান্টেড পারসনস’ তালিকায় বিভিন্ন দেশের প্রায় সাড়ে সাত হাজার অপরাধীর নাম, ছবি, জাতীয়তা ও দেশের নাম উল্লেখ আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অপরাধীর সংখ্যা ৭৫ জন। তাদের মধ্যে দেশ থেকে পালিয়েছে ৬৫ জন। বাকি ৯ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের নামগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুলিশের সহায়তা চেয়েছে।

ইন্টারপোলের লাল তালিকাভুক্ত বাংলাদেশিরা হলো : শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত হোসেন (৪৫), সুব্রত বাইন (৫১), মোল্লাহ মাসুদ (৫০), প্রকাশ কুমার বিশ্বাস (৪৭), নবী হোসেন (৫০), তানভীর ইসলাম জয় (৫৩), আবদুল জব্বার (৪৮), জিসান আহমেদ (৫০), কামরুল আলম মুন্না (৪৯) কামরুজ্জামান (৫৪), খোরশেদ আলম (৫৫), প্রশান্ত সরদার (৪৬), মোনতাজ বসাক (৫৬), সুলতান সাজিদ (৪৮), নাসিরউদ্দিন রতন (৪৫), আতাউর রহমান (৪৮), তৌফিক আলম (৪৫), শামীম আহমেদ (৫৩), রফিকুল ইসলাম (৪৯), জাফর আহমেদ (৫০), আমিনুর রসুল (৬২), একাধিক হত্যা মামলার আসামি মো. শহিদউদ্দিন খান (৫৬), খোরশেদ আলম (৩৭), ওয়াসিম (৩৫), হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ (৫৮), গিয়াস উদ্দিন (৫০), মিজান মিয়া (৪২), অশোক কুমার দাশ (৩৯), চন্দন কুমার রায় (৪০), একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত রাতুল আহমেদ বাবু (৩৯), একই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (৬৭), মো. লালু সিরাজ মোস্তফা (২৪), ‘রাজাকার’ জাহিদ হোসেন খোকন (৭৮), হোসেন ওরফে সৈয়দ হোসেন (৬৮), আজিজুর রহমান (৪৪), সৈয়দ মো. হাসান আলী (৭৩), অজয় বিশ্বাস (৩৮), তরিকুল ইসলাম (৩৪), আবদুল জব্বার (৮৭), হানিফ (৩৫), মোহাম্মদ আলাউদ্দিন (৪৭), মোহাম্মদ সবুজ ফকির (৪৫), শফিক-উল (৫২), মোহাম্মদ মনির ভূঁইয়া (৫৬), আমান উল্লাহ শফিক (৩৮), যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আজাদ (৭৩), সাজ্জাদ হোসেন খান (৪১), জাহিদুল ইসলাম (৬৪), রফিকুল ইসলাম (৫১), মকবুল হোসেন (৫৩), মারা গেছে বলে জনশ্রুতি থাকা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ কালা জাহাঙ্গীর ওরফে ফেরদৌস (৪২), মো. নাঈম খান ইকরাম (৫১), মো. ইউসুফ (৭৩), আবদুল আলিম শরিফ (৫০), নুরুল দীপু (৪৩), আহমেদ মজনু (৪৭), মোহাম্মদ ফজলুল আমিন জাভেদ (৩২), বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি এসএইচএমবি নূর চৌধুরী (৬৯), আরেক খুনি আবদুর রশিদ খন্দকার (৭৪), খুনি শরিফুল হক ডালিম (৭৪), খুনি এএম রাশেদ চৌধুরী (৭৩), মোসলেম উদ্দিন খান (৮৩), আহমেদ শরিফুল হোসেন (৭৭), নাজমুল আনসার (৬৮), রউফউদ্দিন (৪৪), মোহাম্মদ আতাউর রহমান চৌধুরী (৫৮), সালাহউদ্দিন মিন্টু (৪১), একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত মাওলানা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন (৪৭), গোলাম ফারুক অভি (৫৪), আমিনুর রহমান (৪৩), হারুন শেখ (৫০), মিন্টু (৪২) ও চাঁন মিয়া (৩৯)।