জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা

বাংলাদেশের পৌর এলাকাগুলোতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশের একটি ধারা ঐতিহাসিকভাবে সক্রিয়। জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা সামাজিক জীবনে যেমন নিজ নিজ এলাকার মানুষদের ভালো-মন্দ, বিচার-আচারে তাদের সঙ্গে থাকতেন তেমনি নিজ নিজ এলাকার রাজনৈতিক পরিসরেও নেতৃত্ব দিতেন।  ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ কিংবা পৌরসভাগুলোতে এই স্থানীয় নেতারাই অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিটি এলাকাতেই প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের সংস্কৃতিও তৈরি হতো। প্রতিদ্বন্দ্বীরা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে স্থানীয় সমীকরণই সব সময় প্রাধান্য পেত। কিন্তু এখন পৌর নির্বাচনসহ সব স্থানীয় নির্বাচনে একদিকে যেমন স্থানীয় উন্নয়নের সমীকরণের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের আধিপত্য বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষিত প্রার্থীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে না।  পাশাপাশি, সম্পদশালীদের প্রভাবে মøান হচ্ছেন তৃণমূল থেকে উঠে আসা পেশাদার রাজনীতিকরা। আসন্ন প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে এ তথ্যই উঠে এসেছে।  

আগামী ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ২৪টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯৩ জন। এসব পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে উপরোক্ত চিত্র পাওয়া গেছে। অবশ্য হলফনামায় প্রার্থীরা সম্পদ ও অন্যান্য তথ্যের যে বিবরণ দেন, তার সত্যতা নিয়ে কারও কারও সংশয় আছে। হলফনামার তথ্য যাচাইয়ের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তা যাচাই করে না। জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে এবং জাতীয় নির্বাচনে সব প্রার্থীর হলফনামার মাধ্যমে তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক। মনে রাখতে হবে, হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থী সম্পর্কে সত্যিকারের চিত্র বের করে আনতে হবে, যাতে ভোটাররা জেনে-শুনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতার বিষয়টি অনেকটা অগ্রসর হয়। 

গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, আসন্ন প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ৪৭ মেয়র পদপ্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১৬ জনের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার বেশি। প্রার্থীদের মধ্যে ১১ জন আওয়ামী লীগের, আর ৫ জন বিএনপির। অন্যদিকে স্থাবর সম্পত্তি বাদে ১০ লাখ টাকার বেশি সম্পদের মালিক প্রার্থী আছেন মোট ১৫ জন। তাদের মধ্যে ১১ জন আওয়ামী লীগের, আর ৪ জন বিএনপির। আবার বিএনপির প্রার্থীদের বড় অংশই বিভিন্ন মামলার আসামি। বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে এখনো মামলা চলছে। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে এখন মামলা আছে। বিরোধী দলের এসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে কি না, সেটা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আবার মেয়র প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার হারও সন্তোষজনক নয়।  জানা যায়, প্রার্থীদের ৩৮ শতাংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস। বাকি ৬২ শতাংশ প্রার্থী সর্বোচ্চ উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। তাদের মধ্যে ২০ শতাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়ায় প্রার্থীদের মানের, বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। তারা আরও বলছেন, দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষিত জনপ্রতিনিধির হার বাড়ছে না। আবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে যেতেও চাইছেন না শিক্ষিত মানুষজন। এর ফলে কম শিক্ষিত লোকজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। আমরা মনে করি, প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনসহ রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ বিবেচনায় আনা উচিত। কেননা, উন্নয়নের একটি বড় শর্তই হলো শিক্ষার প্রসার। আর শিক্ষিত জনপ্রতিনিধির পক্ষে এ বিষয়টি যত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা সম্ভব, স্বল্পশিক্ষিত জনপ্রতিনিধিদের এখানে স্বাভাবিকভাবেই ঘাটতি থেকে যাবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হন। কেননা এই স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনসাধারণের কাছে সরাসরি জবাবদিহিকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার জন্যও এসব নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণেই হয়ে থাকে এবং সেখানে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারও রয়েছে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সমস্যার মূল কারণ সম্ভবত কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের রাজনীতির দুর্বলতা। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে, কেননা এটা জনগণের কাছে তাদের সরাসরি জবাবদিহির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করবে। এ জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ আর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না থাকার সুযোগে রাজনীতি-আমলাতন্ত্রের চক্করে আটকা থেকে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি আদায়ের সুযোগ জনগণ কখনোই পাবে না। আর সেক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।