২৪ বার এভারেস্টের চূড়ায়

এভারেস্টের চূড়া জয় যেখানে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, সেখানে পুরুষদের মধ্যে ২৪তম এবং নারীদের মধ্যে নবমবার এভারেস্ট জয় করে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছেন কামি রিতা শেরপা ও লাখপা শেরপা। বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে গেলেও এই রেকর্ড তাদের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। চোখের সামনে অনেক পর্বতারোহীকেই তুষারপাতে মারা যেতে দেখছেন দুজনেই। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

মাউন্ট এভারেস্ট

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য স্বপ্ন দেখেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি যেতে পারেন, তবে বেশির ভাগের কাছেই সে স্বপ্ন অধরা থাকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৮৪৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্বতশৃঙ্গে ওঠার জন্য তবু মানুষের চেষ্টা আজও আছে। কতজন মানুষ এই চূড়ায় উঠেছেন, সেই হিসাব সঠিকভাবে রাখার জন্য ১৯৫৫ সাল থেকে সর্বপ্রথম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুক প্রকাশ করা হয়। এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা একইসঙ্গে মানসিক শক্তি ও শারীরিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। ঠিক কতটুকু ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন মানুষ বারবার একই জায়গায় ফিরে আসেন এবং পর্বতে চড়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন? কয়েকজন মানুষ সত্যি সত্যিই যেন ভালোবেসে নিজেদের বেঁধেছেন এই এভারেস্টের সঙ্গে। এমনই দুজন ব্যক্তি কামি রিতা শেরপা ও লাখপা শেরপা। পুরুষ হিসেবে সর্বোচ্চ ২৪ বার এবং নারী হিসেবে ৯ বার এভারেস্টের চূড়ায় ওঠায় গিনেস বুকে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন তারা।

কামি রিতা শেরপা

২০১৯ সালের ২১ মে নেপালের কামি রিতা শেরপা যখন ২৪ বারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন, সেটি ছিল তার এককভাবে চূড়ায় ওঠা। মজার বিষয় হচ্ছে, এ ঘটনার মাত্র ছয় দিন আগেই তিনি ২৩তম বার চূড়ায় ওঠা পর্ব শেষ করেছিলেন। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন রেকর্ড করা মোটেও সহজ কথা নয়। কিন্তু অসাধ্যকে সাধ্যের মধ্যে আনাই যেন রিতার অভ্যাস। ৫০ বছর বয়সী রিতা নিশ্চিত ছিলেন তিনি এটি করতে পারবেন।

কামি রিতার অনুপ্রেরণা তার বাবা। ১৯৫০ সালে, নেপাল যখন পর্বতারোহীদের জন্য বর্ডার খুলে দেয়, রিতার বাবা সে সময় এভারেস্টে আসা মানুষের জন্য প্রফেশনাল গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেন। এভারেস্টে এই পেশায় তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম ব্যক্তি। এই পেশার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অন্যরকম। টানা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি এই কাজ করে গেছেন। দুঃখজনকভাবে সে বছর তিনি ফ্রস্টবাইটে (বরফের স্পর্শে শরীর হিমশীতল হয়ে যাওয়া) মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন। একই বছর বড় ভাই লাকপার সঙ্গে এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে রান্নার সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন রিতা। তখন তার বয়স মাত্র ১২। বয়স কম হলেও বাবাকে চোখের সামনে এমন সাহসী কাজ করতে দেখে তিনি নিজেও সিদ্ধান্ত নেন এভারেস্টের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকার। ১৯৯৪ সালে, পর্বতে সাফল্যের সঙ্গে প্রথম ওঠেন কামি রিতা। প্রতিভাবান ব্যক্তিরা যে একদম শুরু থেকে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসেন, এ কথাটি ভুল প্রমাণিত করেন কামি রিতা। তাকেও এভারেস্টে উঠতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালে এভারেস্টে চড়া শুরু করলেও শীর্ষে পৌঁছাতে পারিনি, কারণ আমি তখন মাত্র শুরু করেছিলাম। সবকিছু পরিকল্পনামতোই চলছিল কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, প্রথমবার আমি চূড়ায় উঠতে সক্ষম হইনি। দুই বছর যখন প্রথমবার চূড়ায় উঠেছিলাম, তখন আনন্দের সীমা বোঝানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি যে আসলেই শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান আর উপযুক্ত ছিলাম, সেটি তখন প্রমাণ করতে পেরেছি।’

গাইড হয়ে কাজ

কয়েক দশক ধরে চেষ্টার পর, ১৯৫৩ সালের ২৯ মে যৌথভাবে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং শেরপা। হিমালয়ের তথ্যসূত্র অনুসারে, এই দুজনের পরে প্রায় ছয় হাজার পর্বতারোহী তাদের দেখানো পথ অনুসরণ করেছেন। চীন ও নেপালের আন্তর্জাতিক সীমান্ত এভারেস্ট পর্বতের শীর্ষবিন্দু দিয়ে গেছে। অভিজ্ঞ গাইডদের সহায়তা নিলে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা পর্বতারোহীদের সংখ্যা আরও বাড়বে। ২০১৯ সালের ২৩ মে, এই এক দিনেই চূড়ায় উঠেছিলেন একসঙ্গে ৩৫৪ পর্বতারোহী।

কামি রিতা নিজেও কাজ করছেন গাইড হিসেবে। দেশের বাইরে থেকে যারা পর্বতে চড়ার জন্য আসেন, তাদের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। গাইড ছাড়াও একজন শেরপা থাকেন যিনি ক্যাম্প প্রস্তুত করা, অন্য শেরপাদের নিয়ন্ত্রণ করা, কোনো শেরপার কাঁধে ভার বেশি হয়ে গেল কি না, ট্রেকিং দলের নিরাপত্তা, দলের সবার জন্য রান্না, এমনকি অক্সিজেন বোতল বহনের কাজ করার জন্য। কামি রিতা ও লাখপা রিতা (যিনি নিজেও ১৭ বার চড়েছেন এভারেস্টে) এসেছেন নেপালের খুম্বু রাজ্যের থামে নামক গ্রাম থেকে। গ্রামটি এভারেস্টের উপত্যকাতেই অবস্থিত। এই গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষই পর্বতের গাইড হিসেবে কাজ করেন। এমনকি রিতার পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যে প্রায় সব পুরুষই কমপক্ষে একবার করে এভারেস্ট জয় করেছেন। কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন রিতা শেরপা।

চূড়ায় ওঠার সময়

১৯৯৪ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছর এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করার চেষ্টা করে আসছেন রিতা। তার অধিকাংশ এভারেস্ট যাত্রা ছিল মার্চ মাসের দিকে। প্রতি যাত্রায় তার গড়ে তিন মাসের মতো সময় প্রয়োজন হয়, অর্থাৎ সাধারণত মে মাসের দিকে তিনি এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করতে সক্ষম হন। এভারেস্ট বিজয়ের জন্য মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কে আদর্শ ধরা হয়। কারণ এ সময় পর্বতের আবহাওয়াও তুলনামূলক ভালো থাকে। তবু দুর্গম ও বরফাচ্ছাদিত হিমালয়ে আরোহণের জন্য পর্যটকদের গাইডের সহায়তা নিতে হয়। গাইড হিসেবে নেপালের শেরপাদের সুখ্যাতি বিশ্বব্যাপী। আর রিতা শেরপার এভারেস্ট সম্পর্কে জানাশোনা ও অভিজ্ঞতা থাকার কারণে সুখ্যাতি স্বাভাবিকভাবেই সবার ওপরে। এভারেস্ট ছাড়াও কে-২, চু-ইয়ো, মানাসলু, লটসিসহ বিশ্বের আরও প্রায় দুই ডজন উচ্চপর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করেছেন।

বিপদের ঘটনা

তবে রিতা শেরপার এই পথচলা যতটা রোমাঞ্চকর, ততটাই বিপজ্জনক। ২০১৪ সালের ১৮ এপ্রিল এভারেস্টে তুষারধসে যখন ১৬ পর্বতারোহী নিহত হন, তখন রিতা শেরপাও সেই বেস ক্যাম্পে ছিলেন। তুষারের নিচে চাপা পড়া লাশগুলোকে টেনে বের করেছিলেন দুই ভাই। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পরিবারের চাপে তিনি এই পেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু বেশিদিন তিনি এভারেস্টকে ত্যাগ করে থাকতে পারেননি। অল্প কিছুদিন পর আবার গাইড পেশায় ফিরে আসেন এবং এভারেস্ট যাত্রা অব্যাহত রাখেন। প্রতিবার গাইড হিসেবে রিতা শেরপা ১০,০০০ মার্কিন ডলার নেন। বর্তমানে তিনি ‘সেভেন সামিট ট্রেকস’ নামক একটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছেন। এই কোম্পানি মূলত এভারেস্টের পর্যটকদের নিয়ে কাজ করে।

নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে এভারেস্টের চূড়ায় যাত্রা করা হয় বলে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল পর্যটন ব্যবসা। তবে নেপাল থেকে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যাই বেশি। এর অন্যতম কারণ, নেপালের অভিজ্ঞ শেরপাদের গাইড হিসেবে পাওয়া। এ ছাড়া বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের আটটিই নেপালে অবস্থিত। ফলে এটি বর্তমানে নেপালের প্রধান রাজস্ব উপার্জনের খাতে পরিণত হয়েছে। এত কিছু হলেও রিতার মতো অভিজ্ঞদের ভাগ্যে তেমন পরিবর্তন হয়নি। সরকারি তেমন কোনো সাহায্য তারা পান না। বিশ্ববাসী চিনলেও নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে সাহায্য না পাওয়ার আক্ষেপ হয়তো কখনোই ভোলা হবে না ২৪ বার এভারেস্ট জয় করা কামি রিতা শেরপার।

লাখপা শেরপা

২০০০ সালের ১৮ মে প্রথম এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন লাখপা শেরপা। সর্বশেষ উঠেছিলেন ২০১৮ সালের ১৬ মে। নবমবারের মতো এই আরোহণ করেন তিনি। আর চূড়ায় ওঠা নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার। পর্বতারোহণ লাখপার রক্তেই মিশে আছে। এভারেস্টের কোলেই তিনি বড় হয়েছেন। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে এভারেস্টে আসা আরোহীদের মালামাল বহন করা শুরু করে ১২ বছর পর প্রথমবারের মতো চূড়ায় ওঠেন লাখপা। লাখপারা ছিলেন ১১ ভাই-বোন। এত বড় পরিবার চালানোর জন্য তার বাবার বড় কোনো আয়ের পথ ছিল না। ছোট্ট একটি চায়ের দোকান থেকে যা উপার্জিত হতো, তাই দিয়ে চলত সংসার। ছোটবেলায় লাখপা বিদ্যুৎ ব্যবহারের কোনো সুবিধা পাননি, যেতে পারেননি স্কুলেও। এভারেস্টের উপত্যকায় বড় হওয়ায় সুযোগ পেয়েছিলেন পর্বতের কাছাকাছি থাকার। অন্য পর্বতারোহীদের শেরপারা যেভাবে সাহায্য করে, নিজেরা চেষ্টা করলে হয়তো এভারেস্টে ওঠা এতটা সহজ হতো না। লাখপা বলেন, ‘যদি কোনো শেরপা কখনো না থাকত, কেউই হয়তো এভারেস্টে চড়তে পারতেন না।’

আট হাজার মিটারের ওপরে পৌঁছে গেলে ধীরে ধীরে অক্সিজেন কমতে থাকে, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট ও হ্যালুসিনেশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে তখন। আর এই অংশটিকেই বলা হয় ‘মৃত্যুপুরী’। এভারেস্টের কোলে বড় হলেও এ ধরনের ‘মাউন্টেন সিকনেস’ শেরপাদের মধ্যেও হয়। ১৯৭৬ সালে আমেরিকার একটি গবেষণায় বলা হয়, ছয় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর অন্যতম বেশি উচ্চতায় আর হিমালয়ের তাপমাত্রায় থাকতে থাকতে শেরপাদের শরীর ওই আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তাদের শরীর বেশি উচ্চতায় আর কম অক্সিজেনে বেঁচে থাকার মতো করে প্রস্তুত করেছে। হিমোগ্লোবিনে বাঁধা তাদের শরীরের এনজাইমগুলো আমাদের থেকে একটু আলাদাই। তাদের হৃৎপিণ্ড শর্করাকে কাজে লাগায়, আর ফুসফুস কম অক্সিজেনে থাকার জন্য অধিকতর উপযোগী। আর এ কারণে ক্যানসার ও হৃদরোগের মতো জটিল অসুখও তাদের কম হয়। পাসাং লামু শেরপা নামে নেপালের একজন নারী ১৯৯৩ সালের ২২ এপ্রিল এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেদিনই তার মৃত্যু হয়। চূড়ার কঠিন আবহাওয়ার সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তবু পর্বতারোহীদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণাদায়ক একজন নারী। এডমন্ড হিলারি আর তেনজিং শেরপার পর ১৯৭৩ সালে জুনকো তাবেই নামে একজন জাপানি নারী প্রথম এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেও নেপালি কোনো নারীর সেটিই ছিল প্রথম।

অর্থকষ্ট

নারী হিসেবে নবমবারের মতো একজন সফল পর্বতারোহী হওয়ার পরও লাখপাকে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য স্পন্সর পেতে বেশ কষ্ট হয়। উত্তর-পূর্ব নেপালের মারকালু থেকে আসা লাখপা এখন বাস করেন আমেরিকার কানেকটিকাটের ওয়েস্ট হার্টফোর্ডে। তবে দেশ ছেড়ে সেখানে যে তিনি ইচ্ছে করে গিয়েছেন, এমনও নয়। লাখপা যখন ভাই-বোন, আত্মীয়দের সঙ্গে এভারেস্টে আরোহণ শুরু করেছিলেন, তখন তিনি নিতান্তই এক কিশোরী। তবে বেশ দুরন্ত ছিলেন, মেয়েলি আচরণের কোনো কিছুই তার মধ্যে ছিল না। সবার মধ্যে পরিচিত ছিলেন টমবয় বলে। তিনি কখনো সংসার করতে পারবেন কি না এমন চিন্তায় মা বেশি অস্থির ছিলেন। এভারেস্টে চড়ার সময়ই স্বামীর সঙ্গে সেখানেই লাখপার পরিচয় হয়। বিয়ের পর ২০০২ সালে স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় চলে আসেন লাখপা। তারা একইসঙ্গে পর্বতে চড়তেন, তবে নিজেদের সম্পর্ক জটিল হওয়া শুরু হয় বিয়ের কিছুদিন পর থেকে। ২০০৪ সালে লাখপার স্বামী তাকে এভারেস্টেই গায়ে হাত তোলেন, গালাগালি করেন, এমনকি প্রথম সন্তানের জন্মের পর বাড়িতে তার ওপর অত্যাচার করতে থাকেন নানাভাবে। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পরও লাখপা স্বামীর কাছ থেকে ভালো আচরণ পাননি। ২০১২ সালের পর দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন আলাদা হয়ে যাওয়ার। সন্তানদের নিয়ে নিজের ঘর ছেড়ে আসেন লাখপা। গিনেস বুকে নাম তোলা এই নারী এখন থালাবাসন ধোয়ার কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য অর্থ আয় করছেন। নিজে গাড়ি চালাতে পারেন না বলে কাজের জায়গায় হেঁটে যান আর ট্রেনিংয়ের জায়গায় যাওয়ার জন্য উবারে ওঠেন।  লোকে যখন বলে টাকা থাকলেই আর বেশ সহজভাবে হেঁটেই এভারেস্টে ওঠা যায়, তখন লাখপার ভীষণ মন খারাপ হয়। লাখপা জানেন এভারেস্টের কোন জায়গায় বিপদের কতটুকু শঙ্কা আছে, মৃত্যু সেখানে কীভাবে পদে পদে লেগে থাকে। তিনি নিজে অর্থের জন্য কষ্ট করে যাচ্ছেন সব সময়। পশ্চিমা দেশ থেকে কেউ এলে যেখানে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়, সেখানে একজন নেপালির খরচ হয় ৩০ হাজার ডলার। নেপালি হয়েও এই অর্থ তাকে জোগাড় করতে হচ্ছে থালাবাসন মেজে।

টিকে থাকার চেষ্টা

চোখের সামনে তুষারপাতে কীভাবে মানুষের মৃত্যু হয় দেখেছেন লাখপা। পর্বতারোহীরা একে একে লাশ বয়ে নিচে নামিয়ে আনতেন যেখানে একা একা হাঁটাই ছিল কষ্টসাধ্য। খুম্বুতে তুষারপাতের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত থেকে পর্বতারোহীদের দরকারি বিভিন্ন জিনিস ও দড়ি দিয়ে সাহায্য করেছেন। দিনের পর দিন লাখপা কোনো ধরনের অনুমোদন চুক্তি ছাড়া, পুষ্টিবিদ বা ট্রেইনারের সাহায্য ছাড়া এভারেস্টে উঠছেন। তিনি এখন যে ট্রেনিং করেন, সেখানে বেশি সময় থাকতে চাইলেও পারেন না, কারণ কাজ করে তাকে বাসাভাড়া দিতে হয়, সংসার চালাতে হয়। একা মা হয়ে জীবনের এই যে সব কষ্ট তিনি সহ্য করছেন, তার একমাত্র সমাধান তিনি খুঁজে পান এভারেস্টে চড়ার সময়ই। যত দিন শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান আছেন, তত দিন তিনি এভারেস্টে চড়তে চান।