পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের প্রতি ইমান আনা ইসলামের মৌলিক আকিদার অন্তর্ভুক্ত। ঈসা (আ.) বনি ইসরাইলের সর্বশেষ নবী ও কিতাবধারী রাসুল। পবিত্র কোরআনের ১৫টি সুরার ৯৮টি আয়াতে ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম, দাওয়াত, ইহুদিদের ষড়যন্ত্র এবং আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে।
আল্লাহর একান্ত কুদরতে পিতাহীন দুনিয়ায় আগমন করেন ঈসা (আ.)। পবিত্র কোরআনের সুরা মারইয়ামের প্রথম ৪০ আয়াতে সেই ঘটনার বিবরণ এসেছে। রাসুলের যুগে আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশি সুরা মারইয়ামের এই আয়াতগুলো শুনেই ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
আল্লাহতায়ালা যখন মারইয়াম (আ.)-কে ঈসা (আ.)-এর জন্মের সুসংবাদ দিলেন, তখন তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আল্লাহকে বলেন, ‘পরওয়ারদেগার, কেমন করে আমার সন্তান হবে; আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। আল্লাহ বললেন, এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন, হয়ে যাও, অমনি তা হয়ে যায়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৪৭)
ঈসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মারইয়াম-তনয় মাসিহ রাসুল ছাড়া আর কিছু নয়।...’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৭৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মাসিহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে কখনো লজ্জার বিষয় মনে করেন না এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতারাও না। যারা আল্লাহর দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।’ (সুুরা নিসা, আয়াত : ১৭২)
ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন। দোলনা থেকেই তিনি কথা বলতে শুরু করেন। মৃত মানুষকে জীবিত করা, মাটির পাখিকে জীবনদান এবং অন্ধদের দৃষ্টিদানের মতো ক্ষমতা আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন। তখনকার অধিকাংশ মানুষ এগুলোকে জাদু বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে অল্পসংখ্যক লোক তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন কোরআনের ভাষায় যারা ‘হাওয়ারিয়্যিন’ নামে পরিচিত।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দোলনায় এবং পরিণত বয়সেও যখন আমি তোমাকে গ্রন্থ, গ্রগাঢ় জ্ঞান, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম এবং যখন তুমি কাদামাটি দিয়ে পাখির প্রতিকৃতির মতো আকৃৃতি নির্মাণ করতে আমার আদেশে। অতঃপর তুমি তাতে ফুঁ দিতে; ফলে তা আমার আদেশে পাখি হয়ে যেত এবং তুমি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করে দিতে এবং যখন তুমি আমার আদেশে মৃতদের বের করে দাঁড় করিয়ে দিতে, যখন আমি বনি ইসরাইলকে তোমাদের থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম, যখন তুমি তাদের কাছে প্রমাণ নিয়ে এসেছিলে। অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কাফির ছিল, তারা বলল, এটা প্রকাশ্য জাদু ছাড়া কিছুই নয়। আর যখন আমি হাওয়ারিদের মনে জাগ্রত করলাম যে আমার প্রতি এবং আমার রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো, তখন তারা বলতে লাগল, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে আমরা আনুগত্যশীল।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ১১০-১১১)
ঈসা (আ.) মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। নিজেকে কখনো প্রভু বলে দাবি করেননি। তাই তাকে প্রভু মনে করা ইসলামি আকিদার বিপরীত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কুফরি করে, যারা বলে, মারইয়াম-তনয় মাসিহ-ই আল্লাহ। অথচ মাসিহ বলেন, হে বনি ইসরাইল, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৭২)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যখন আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন, হে ঈসা ইবনে মারইয়াম, আপনি কি লোকদের বলে দিয়েছিলেন, আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা আমাকে ও আমার মাকে উপাস্য সাব্যস্ত করো? ঈসা বলবেন, আপনি পবিত্র আমার জন্য শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি যা বলার অধিকার আমার নেই। যদি আমি তা বলতাম, তবে আপনি অবশ্যই জানতেন; আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন কিন্তু আপনার গুপ্ত বিষয় আমি জানি না। নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ১১৬)
পবিত্র কোরআনে বারবার ঈসা (আ.)-কে উপাস্য স্থির করার বিরোধিতা করা হয়েছে। ত্রিত্ববাদের বিশ^াসকেও অস্বীকার করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই তারা কুফরি করে, যারা বলে, আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা তাদের উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৭৩)
ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস মতে, ঈসা (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হননি। বরং ইহুদিদের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচাতে আল্লাহ তাকে আসমানে উঠিয়ে নেন। কিয়ামতের আগে মোহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মের অনুসারী হয়ে আবার পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং পৃথিবী জুড়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা বলে, আমরা মারইয়ামপুত্র ঈসা মাসিহকে হত্যা করেছি, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলে চড়িয়েছে, বরং তারা এক ধরনের ধাঁধায় পতিত হয়েছিল এবং যারা এ ব্যাপারে নানা কথা বলে, তারা এ ক্ষেত্রে সন্দেহে পড়ে আছে, শুধু অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোনো খবরই রাখে না। তারা তাকে কোনোভাবেই হত্যা করেনি, বরং আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন নিজের কাছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৫৭-১৫৮)
অসংখ্য হাদিসের আলোকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের আগে ঈসা (আ.) পৃথিবীতে আগমণ করবেন। পবিত্র কোরআনেও তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর আহলে কিতাবের যত শ্রেণি রয়েছে, তারা সবাই (কিয়ামতের আগে) ঈসার ওপর ইমান আনবে, ঈসার মৃত্যুর আগে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৫৯)।
এ আয়াতের দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যা হলো, প্রত্যেক ইহুদিই তার অন্তিম মুহূর্তে যখন পরকালের দৃশ্যাবলি অবলোকন করবে, তখন ঈসা (আ.)-এর নবুয়তের সত্যতা উপলব্ধি করবে। কিন্তু তখনকার ইমান তাদের আদৌ কোনো উপকারে আসবে না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, কিয়ামতের নিকটবর্তী যুগে ঈসা (আ.) আবার পৃথিবীতে আগমন করবেন। তখন ইহুদি-খ্রিস্টানরা মুসলমানদের মতো বিশুদ্ধ বিশ্বাস নিয়ে ইমানদার হবে। আর যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের নিশ্চিহ্ন করা হবে। (মাআরেফুল কোরআন, সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির)