বৈবাহিক জীবনে সব দম্পতিই সুখময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। সংসারে বিবাদ-অশান্তি কারও কাম্য নয়। তবে দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকলে সেখানে রাগ-অভিমান এবং সুখ-দুঃখ থাকবেই, কিন্তু তা স্থায়ী কলহে রূপ নিলে বিপদ। দাম্পত্য কলহ এড়াতে এবং আদর্শ পরিবার গঠন করতে স্বামীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন আদর্শ স্বামী হতে হলে রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনা মানার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনাবলি থেকে কয়েকটি তুলে ধরছি।
পরিবারে সময় দেওয়া : পরিবারে স্রেফ নিজের উপস্থিতিই নয়, বরং স্ত্রীর সঙ্গ দেওয়া এবং তাকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া আদর্শ স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য। আদর্শ পরিবার গঠনে স্ত্রী-সন্তানদের হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। সাহাবি উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, ‘আমি একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উভয় জাহানের মুক্তির পথ কী জানতে চাইলাম। উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, কথাবার্তায় সংযমী হও, পরিবারের সঙ্গে তোমার অবস্থান যেন দীর্ঘ হয় এবং নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হও।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৬)
ঘরোয়া কাজে সহায়তা : ঘরোয়া কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করার বিষয়টিকে আমাদের সমাজে লজ্জার বিষয় মনে করা হয়Ñ যা ইসলাম সমর্থন করে না। ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করা নবীজির সুন্নত এবং আদর্শ স্বামীর বৈশিষ্ট্য। ‘উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, নবীজি কি পরিবারের লোকদের তাদের ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, নবীজি ঘরের লোকদের তাদের কাজে সহযোগিতা করতেন এবং নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য যেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)
এ ছাড়া অন্যান্য হাদিসে ঘরোয়া কাজের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘রাসুল (সা.) নিজ হাতেই তার পরিধেয় কাপড় সেলাই করতেন। প্রয়োজনে নিজের জুতা নিজেই সেলাই করে নিতেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৭৫৬)
ব্যক্তিগত কাজে স্ত্রীর মতামত : চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গিনীর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এটি আদৌ উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ঘরোয়া বিষয়ই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রেও নিজের স্ত্রীদের থেকে মতামত নিতেন। ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে নবীজি স্বীয় স্ত্রী উম্মে সালমা (রা.)-এর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময় যা অতি কার্যকরী বলে বিবেচিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ২৭৩১)
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ : হাবভাবে অনেক সময় ভালোবাসার কথা জানান দিলেও মুখে প্রকাশ করা অনেকেই লজ্জার বিষয় মনে করে। তবে স্ত্রীর মন স্বামীর ভালোবাসার কথা শোনার জন্য সবসময় লালায়িত থাকে। কথার মাধ্যমে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো নবীজির সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে তার প্রিয়তমা স্ত্রীদের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর কথা বলে আপ্লুত করে দিতেন। যেমন, হজরত খাদিজা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার মনে তার প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৩৫) আয়েশা (রা.)-এর প্রশংসা করে নবী (সা.) বলেছেন, ‘খাবারের মধ্যে সারিদ যেমন সবার সেরা, নারীদের মধ্যে আয়েশা সবার সেরা।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪১১)
পরিপাটি থাকা : স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিপাটি রাখা এবং নিজের ফিটনেস ধরে রাখা আবশ্যক। এটি স্ত্রীর অধিকার। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমিও চাই স্ত্রী আমার জন্য সাজুক।’ (বাইহাকি, হাদিস : ১৪৭২৮)
আন্তরিকতা বাড়ানো : নবীজির পবিত্র জীবনীতে স্বীয় স্ত্রীদের সঙ্গে আন্তরিকতা ও রোমান্টিকতার এত সব চিত্র অঙ্কিত রয়েছে, যা সত্যি একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবনের উপমা। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে নবীজির সম্মানিত স্ত্রীরা এসব ঘটনার বিবরণ এতটা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দিয়েছেন, যা তাদের ভেতরকার ভাব-আবেগের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ভালোবেসে কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)
তিনি আরও বলেন, ‘পাত্রের যে অংশে আমি মুখ রেখে পানি পান করতাম তিনি সেখানেই মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে পছন্দ করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩০০)
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতাম এবং আমাকে খুশি করতে তিনি প্রতিযোগিতায় ইচ্ছা করেই নিজেকে পেছনে ফেলে দিতেন।’ (মুসনাদে আহমাদ) এ ছাড়া একই সঙ্গে গোসল করা, একই প্লেটে খাবার খাওয়া, একই চাদরে রাত্রিযাপনসহ অসংখ্য আন্তরিকতা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ভরপুর ছিল নবীজির দাম্পত্য জীবন।
একজন আদর্শ স্বামীর জন্য এর চেয়ে উত্তম আদর্শ আর কী হতে পারে! তবে দাম্পত্য কলহ রোধে স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীরও ব্যাপক ভূমিকা রাখা চাই। দুজনের আন্তরিকতা, কোরবানি এবং ধৈর্যের মাধ্যমেই একটি সুখী পরিবার গড়ে ওঠে। আর সুখী পরিবারই আগামী প্রজন্মের জীবন গঠনের আদর্শ বিদ্যাপীঠ।