দেশে করোনার টিকাগ্রহীতাদের তালিকা তৈরি ও টিকা পেতে নিবন্ধনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ তৈরি করছে সরকার। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যাদের টিকা দেওয়া হবে ওই অ্যাপে তাদের নাম, বয়স, পেশা, প্রতিষ্ঠানের নাম ও এলাকা উল্লেখ থাকবে। সেখান থেকে বয়সের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পাবেন এমন মানুষকে ওই অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। পরে ওই অ্যাপেই চূড়ান্তভাবে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হবে।
তালিকা অনুযায়ী ওই ব্যক্তি নির্দিষ্ট তারিখ ও স্থানে (টিকাকেন্দ্র) টিকা নিতে পারবেন। তবে নিবন্ধন শুধু অনলাইনে নাকি সরকারের সরবরাহ করা ফরম পূরণ করেও করা যাবেসেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
টিকার তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্মসূচির নির্দেশনায় এবং সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি ডিভিশন) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের সহযোগিতায় তালিকা তৈরির একটি পদ্ধতি ঠিক করা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে পদ্ধতিটি জেলা ও উপজেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তারপর ৭-১০ দিন লাগবে তালিকা সম্পূর্ণ করতে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকার তালিকার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটা ডাটাবেজ হচ্ছে। সেটার জন্য আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা কাজও শুরু করেছি। এটার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস, সরকারের এটুআই ও আইটি মন্ত্রণালয়এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলে ডাটাবেজ তৈরি করছি। ডাটাবেজে টিকা পাবেন এমন নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, এরিয়া, ঠিকানা, বয়স উল্লেখ থাকবে।
এই কর্মকর্তা বলেন, যেসব ক্যাটাগরিতে টিকা দেওয়া হবে, তাদের মধ্যে শুধু জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, আইনজীবী ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পর কারা কারা আছেন তাদের তালিকা আমাদের কাছে নেই। সেটা সংগ্রহ করব। পরে ওই ডাটাবেজ তালিকায় সবার নাম থাকবে। সে তালিকা অনুযায়ী টিকা দেওয়া হবে।
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ করোনার টিকা কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকার, দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ছয় মাসে এই টিকা পাবে বাংলাদেশ। সরকার বিনামূল্যে এই টিকা দেবে। পাশাপাশি বেক্সিমকো বেসরকারিভাবেও ৩০ লাখ টিকা আনবে এবং প্রতি ডোজের দাম পড়বে ১২শ টাকা। আশা করা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এই টিকা বাংলাদেশে আসবে। এ ছাড়া আগামী জুনের মধ্যে কোভ্যাক্সের আওতায় আরও ছয় কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এই টিকা বিতরণে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার ও বেক্সিমকো। অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। টিকা সংরক্ষণে সরকার উপজেলা পর্যন্ত কোল্ড চেইন তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছে। কোথায় কোথায় ও কীভাবে টিকা দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে কাজ করছে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতরণ ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটি। টিকার জন্য ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে মানুষ। কবে এই টিকা দেশে আসবে, সে দিকে তাকিয়ে সবাই।
টিকা বিতরণের ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে দুই সপ্তাহ আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেখানে তালিকা তৈরিসহ টিকার ব্যাপারে বিস্তারিত পরামর্শ রয়েছে। ওই পরিকল্পনায় টিকা গ্রহণকারীদের অগ্রগণ্যতার ক্রম বা অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির কথা বলা হয়েছে। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির তত্ত্বাবধান করবে জেলা/সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/উপজেলা কভিড-১৯ কমিটি। সেই নাম ধরে নিবন্ধন করবে এটুআই কর্মসূচি। নিবন্ধনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্মনিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্টের দরকার হবে। এর পাশাপাশি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হবে।
টিকার তালিকা তৈরির পদ্ধতির ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী যারা টিকা পাবেন তাদের তালিকা সরাসরি সংগ্রহ করছি। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে নেওয়া হচ্ছে। তালিকার জন্য একটা অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সম্মুখসারীর কভিড যোদ্ধা এবং যারা প্রথমদিকে টিকা পাবেন, তারা অ্যাপে ন্যাশনাল আইডি দিয়ে নিজেরা নিবন্ধন করবেন। পরে সে তালিকার সঙ্গে সরাসরি করা তালিকার সমন্বয় ও যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে। এই তালিকা দেখে টিকা দেব।
অ্যাপে যারা টিকা পাবেন, তাদের সবার নাম থাকবেউল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একটা আলাদা অ্যাপস ডেভেলপ করব। সেখানে যে কেউ ঢুকলে তার নাম আছে কি না, দেখতে পাবেন। টিকার ক্যাটাগরিতে পড়েন, এমন কারও নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে তারা নিজেরাও অনলাইনে নিজের নাম নিবন্ধন করতে পারবেন। পরে আমরা সেটা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করব।’
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ কীভাবে টিকার তালিকায় নিবন্ধিত হবেনজানতে চাইলে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বয়স্ক যারা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ তারা যে স্থানে আছেন, সেখান থেকেই নিবন্ধন করতে পারবেন। কারণ অ্যাপস উন্মুক্ত থাকবে। যে কেউ যে কারও সাহায্য নিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে দেশে টিকা আসার আগেই অ্যাপ তৈরির কাজ শেষ হবে এবং সেখানে তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
শুধু তালিকায় নাম থাকলেই হবে না, টিকা নেওয়ার সময়ও তাকে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। সেক্ষেত্রে তালিকা ও নিবন্ধনের মধ্যে যাদের বয়স বেশি হবে, তারাই টিকার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। বয়স অনুযায়ী ধাপে ধাপে টিকা দেওয়া হবে। সরকারের করা টিকার তালিকায় নাম আছে এমন ব্যক্তিদের টিকা নেওয়ার আগে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। সে জন্য সরকার একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ তৈরি করছে। ওই অ্যাপে টিকা পাবেন এমন ব্যক্তিদের নাম থাকবে। নামের পাশে বয়স, অঞ্চল, পেশা ও প্রতিষ্ঠানের নাম থাকবে। সেখান থেকে যাদের বয়স বেশি, এমন লোকজনকে ধাপে ধাপে ওই অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। আগের তালিকার সঙ্গে নিবন্ধিত তালিকার তথ্য মিলে গেলে তিনি টিকার জন্য চূড়ান্ত হবেন। পরে ওই অ্যাপে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখ ও স্থানে টিকা নিতে পারবেন।
তালিকার বাইরে কেউ টিকা পাবেন না বলে জানান করোনার টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা টিকা পাবেন তালিকায় সবার নাম থাকবে। এর মধ্যে যাদের বয়স বেশি প্রথম ধাপে তারাই টিকা পাবেন। যারা টিকা পাবেন এনআইডি দিয়ে তাদের নিবন্ধন করতে হবে। এই নিয়মনীতি করার জন্যই তালিকা তৈরির কাজে একটু সময় লাগছে। শুধু তালিকায় নাম উঠলেই হবে না, আগে না পরে পাবে, সেটাও ঠিক করতে হবে। তবে টিকা পেতে হলে সবাইকে তালিকায় থাকতে হবে। তালিকার বাইরে কেউ টিকা পাবেন না।
এ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তালিকা তৈরি এমনভাবে করতে হবেযাতে সারা দেশে সবার জন্য সঠিক হয়। এ রকম একটা পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এ জন্য আমরা দুটি পদ্ধতির কথা ভাবছি। একটা হচ্ছে অনলাইনে নিবন্ধন করা, আরেকটা হচ্ছে হাতে ফরম পূরণ করা। তবে সব শ্রেণির মানুষের জন্য যেন সুবিধা ও সঠিক হয়, সেটা যতটা সহজ করা যায়সেটাই করা হবে।
কত দিন লাগতে পারে তালিকা তৈরি করতেজানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৭-১০ দিন লাগবে তালিকা করতে। এখন ডিসেম্বর মাস। বেশি আগে করে ফেললে নানা ধরনের ঝামেলা তৈরি হতে পারে। তালিকার প্রথম দিকে নাম তোলার জন্য চাপ আসবে। তা ছাড়া নিবন্ধনের জন্য একটা ছক দিতে হবে। এটা খুব জটিল কাজ। আমরা নিজেরাও হিমশিম খাচ্ছি। আমরা ধারণা পাওয়ার জন্য প্রশাসনের কী পরিমাণ লোকজন আছে, সেটার একটা তালিকা করেছিলাম। পরে দেখলাম, যে ছক দিয়েছি, সেটা সবাই ঠিকমতো পূরণ করতে পারেনি। পরে সেটা বাদ দিয়েছি। এখন সুন্দর করে একটা ছক তৈরি করছি।
গ্রামের মানুষ কীভাবে নিবন্ধন করবেজানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রামে বয়স্ক, দরিদ্র ও বিধবা ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদে তাদের একটা তালিকা আছে। সেখান থেকে তারা নিবন্ধন করতে পারবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সম্মুখসারীর কভিডযোদ্ধাদের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও প্রশাসনের লোকজনের নামও থাকবে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিক ইউনিয়নের যে কমিটি আছে, তাদের থেকে তালিকা নেওয়া হবে। সেখানে যারা রেজিস্টার্ড সাংবাদিক, তালিকায় তারাই অন্তর্ভুক্ত হবেন। এর বাইরে কেউ টিকা পাবেন না। যেন সঠিক নামটাই আসে, আমরা সেটা আশা করব। আগে ও পরে সবাই টিকা পাবেন। সুতরাং টিকা পেতে সবাইকে সহানুভূতিশীল হতে হবে।
জাতীয় পরিকল্পনায় যা আছে : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া করোনার টিকা ব্যবস্থাপনা জাতীয় পরিকল্পনায় টিকার ব্যাপারে বেশকিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মতো করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার সময়ও একটি কার্ড ব্যবহার করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কার্ডে টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম, পরিচয়, পেশা, জন্মতারিখ, ঠিকানা ইত্যাদির পাশাপাশি তার যেসব শারীরিক রোগ বা অসুস্থতা রয়েছে, তারও বিবরণ থাকবে। এই কার্ডে করোনাভাইরাসের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের জন্য পৃথক রং ব্যবহার করা হবে।
জাতীয় পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, করোনার টিকার জন্য নির্দিষ্ট বুথ স্থাপন করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, সিটি করপোরেশন হাসপাতাল, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়, আরবান প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি ডিসপেনসারি, সরকারি ১০-২০ শয্যার হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল, বন্দর হাসপাতাল, সচিবালয় ক্লিনিক ও জাতীয় সংসদ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।