বাড়ি যেন ইতিহাসের গ্যালারি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কেন্দুয়া এলাকার তরুণ হাবিবুর রহমান শাহীনের স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ। তরুণ ও আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি শুরু করেছেন ভিন্ন রকমের প্রয়াস। শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তব অবলোকন করতে পারেন তাই তিনি নিজেদের বাড়ির দেয়ালে গড়ে তুলেছেন বিখ্যাত ব্যক্তিদের চিত্রকর্ম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা, শত বছরের ইতিহাস, মনীষীদের বাণী ইত্যাদি। যা দেখতে থমকে দাঁড়াচ্ছেন পথচারী ও শিক্ষার্থীরা।

রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়া গ্রাম। ছায়া-সুনিবিড় শ্যামল এলাকা। পাখির কিচিরমিচির আর শান্ত এ গ্রামেই মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য নিজের বাড়ির প্রাঙ্গণে চিত্রকর্ম তৈরি করেছেন শাহীন। বিশাল আকারের বাড়ির দেয়ালের দুপাশে শিল্পীর তুলির নিপুণ আঁচড়ে গুণীজন, মহামানব, বীরশ্রেষ্ঠদের চিত্রকর্ম দেখে অনেকটা অবাকই হচ্ছেন লোকজন। কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়া গ্রামের বাড়িটি যেন এখন ইতিহাস-ঐতিহ্যের গ্যালারি।

শীতলক্ষ্যা নদের কাঞ্চন সেতু থেকে নেমেই কাচারিবাড়ি। এরপরই ‘ইতিহাসের গ্যালারি’খ্যাত বাড়িটি। বাড়িটির ১০ গজ দূর থেকেই চোখে পড়বে গাছে-গাছে সাঁটানো ছোট ছোট নেমপ্লেটে ধর্মীয় ও মনীষীদের বাণী। বাড়িটির দেয়ালের দক্ষিণ পাশে বিভিন্ন মনীষীদের বাণীর সঙ্গে লেখা রয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াত। রয়েছে হাদিসের বাণী। আর পূর্বপাশে জাতীয় পতাকা দিয়ে চিত্রকর্ম শুরু। পর্যায়ক্রমে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শরৎচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, সিরাজউদ্দৌলাসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সাত বীরশ্রেষ্ঠসহ ৪৭ জনের চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এবং সমকালীন ইতিহাস যেমন মহান ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কথা। সম্প্রতি হাবিবুর রহমানের চিত্রশালায় সরেজমিন গিয়ে এসব চিত্র দেখা যায়।

কেন এসব নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছে হলো এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর বলেন, যুদ্ধের সময় আমার জন্মই হয়নি। বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। যখন ছোট ছিলাম তখন দেখতাম বাবার কাছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আসতেন। আমার এখনো মনে আছে মুক্তিযোদ্ধা পিনু কাকা, নুরুল ইসলাম কাকা, দেলোয়ার কাকা, নজরুল কাকা আমাদের বাড়িতে আসতেন। এসব দেখে আমার মনে দাগ কাটত। বাবা ছিলেন কাঞ্চন ভারতচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অবৈতনিক শিক্ষক। ছোটকালেই দেখতাম বাবা সমাজসেবামূলক কাজ করতেন। আমার খুব ভালো লাগত। তাই ওই চিন্তা থেকেই চিত্রকর্মের মাধ্যমে যুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানোর জন্যই আমার এ চেষ্টা। যাতে এগুলো দেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

জানা গেছে, অনেকটা নীরবে-নিভৃতে এ কর্মযজ্ঞ করে যাচ্ছেন হাবিবুর রহমান। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির বেতনের টাকা থেকে কিছু অংশ খরচ করেন সমাজের কাজে। তাকে এ কাজে সহযোগিতা করছেন তার বাবা এসকেএম হাসমত আলী এবং ছোট ভাই আতিকুর রহমান জনি। আর চিত্রকর্মের কাজগুলো বিনে পারিশ্রমিকে করে দেন হাবিবুর রহমানের ভাগ্নে আল-আমিন মিয়া।

কথা হয় চিত্রকর্ম দেখতে আসা শিক্ষার্থী ইমন, আবদুল্লাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা বলেন, আমরা পাঠ্যবই থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি। তবে এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাচ্ছি।

রূপগঞ্জ উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল জব্বার খান পিনু বলেন, এসব দেখে মনে হবে ইতিহাসটাকে জাগ্রত করছে শাহীন।