নতুন দুঃস্বপ্ন ইউরোপে

ইউরোপ অনেক আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে গ্রহণ করলেও ২০২০ সালের ক্ষত তাকে বয়ে বেড়াতে হবে চলতি বছরেও। করোনাভাইরাস ও ব্রেক্সিট ইস্যু ইউরোপকে ব্যাপক নাকানি চুবানি খাইয়েছে গত বছরে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই দুই ইস্যু চলতি বছরেও ইউরোপকে বেশ ভোগাবে। ২০২০ জুড়েই করোনাভাইরাস ইস্যুতে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য দেখা যায়নি। ঐক্যের অভাবে করোনা মোকাবিলায় ইউরোপ যখন নেতৃত্ব দিতে পারত, তখন তারা ছিটকে পড়েছে।

নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে ইউরোপকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে দেখা গেছে গত বছর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের চীনঘেঁষা নীতি বলে দিচ্ছে, তাদের নীতিমালায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। একই অবস্থা ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রেও। টানা কয়েক মাসের মধ্যস্থতার পর ইউরোপ কিন্তু যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ওই অর্থে তেমন কোনো সুবিধা আদায় করতে পারেনি। যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসীমায় মাছ আহরণ ও ভিসা বন্দোবস্ত ছাড়া ব্রেক্সিটপরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে ইউরোপের অর্জন বলতে কিছুই নেই। চলতি বছরে বাণিজ্য চুক্তির সফল প্রয়োগ ছাড়াও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইউরোপকে।

ন্যাটো চালাতে যে খরচ হয় তা ইউরোপের বর্তমান দেশগুলো দেবে কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ ইউরোপের ছোট দেশগুলো ইতিমধ্যেই ন্যাটো ফান্ডে আর কোনো অর্থ দিতে চাইছে না। পোল্যান্ড বা বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলোর ন্যাটোবিমুখতা জার্মানি ও ফ্রান্সকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শুধু ন্যাটো ইস্যুই নয়, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দিতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের যে সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার কথা রয়েছে ইউরোপের, তাও এখনো ঝুলে আছে। ভিক্টর অর্বানের মতো নেতারা ওই তহবিল দিতে চাইছেন না। তার মতে, ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোরই উচিত দায়িত্ব নেওয়া। কিন্তু জোট থেকে যুক্তরাজ্য বের হয়ে যাওয়ায় পুরো অর্থনৈতিক চাপ এসে পড়ছে জার্মানি ও ফ্রান্সের ওপর। এ দুই দেশের ওপর নির্ভর করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ।

ডেমোক্রেসি রিপোর্টিং ইন্টারন্যাশনালের জ্যাকব জারাচেউস্কি সিএনএনকে বলেন, ‘হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের অবস্থা ভালো নয়। আরও কিছু দেশের নাগরিক অধিকার থেকে অন্য অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তারা সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতির হিস্যা চাইছে কভিড-১৯ রিকভারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। এই দাবি ইউরোপকে নতুন বিতর্কের দিকে ঠেলে দেবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কতটা ঐক্যবদ্ধ তা এবার বোঝা যাবে।’

ব্রেক্সিটের আগে যে শুধু যুক্তরাজ্যেই পপুলিস্টরা আন্দোলন করেছেন এমন নয়। ইউরোপের অনেক দেশেই পপুলিস্টরা ক্রমশ ক্ষমতায় আসছেন। ইউরোপের ইউরোসেপটিক পার্টিগুলোকে আর ইউনিয়ন ছাড়ার কথা বলতে শোনা যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্য বের হয়ে যাওয়ার পর যে পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই তা তারা বুঝতে পারছে। কিন্তু পপুলিস্টদের মধ্যে কিন্তু ইউরোপ ছাড়া বা নতুন করে জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। এতদিন যে আলোচনা দেয়ালের ভেতরে ছিল, এখন তা দেয়ালের বাইরে রাজপথে চলে আসছে। আগামীতে নাইজেল ফারাজের মতো অনেক নেতাকে ইউরোপের রাস্তায় দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে দিনকে দিন। ইউরোপের দীর্ঘদিনের মিত্র ও শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতির কারণে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো মিত্র মানতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় এলেও যে অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। কারণ ইউরোপ প্রশ্নে জো বাইডেনকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায়নি। বরং তিনি বেশ কৌশল অবলম্বন করেই কথা বলছেন ইউরোপের রাজনীতি প্রশ্নে।