চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। গতকাল রবিবার বিকেলে ঢাকার বনানীর নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি দুই পুত্র ও পুত্রবধূ, দুই কন্যা ও দুই জামাতা, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগর চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত রাবেয়া খাতুনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘রাবেয়া খাতুনের মৃত্যু দেশের সাহিত্য অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলা সাহিত্যের প্রসারে তার অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ রাষ্ট্রপতি মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

চ্যানেল আইয়ের জেনারেল ম্যানেজার (প্রোগ্রাম) আমিরুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, আজ সোমবার দুপুর ১২টায় বাংলা একাডেমিতে রাবেয়া খাতুনের মরদেহ নেওয়া হবে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর বাদ জোহর চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

রাবেয়া খাতুন ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর গ্রামে। ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই চলচ্চিত্র পরিচালক এ টি এম ফজলুল হকের সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তান ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী।

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন একসময় শিক্ষকতা করেছেন। সাংবাদিকতার সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ইত্তেফাক, সিনেমা পত্রিকা ছাড়াও তার নিজস্ব সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো ‘অঙ্গনা’ নামের একটি নারীবিষয়ক মাসিক পত্রিকা। তার প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গবেষণাধর্মী রচনা, ছোটগল্প, ধর্মীয় কাহিনী, ভ্রমণ কাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা। রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তার লেখা থেকে অসংখ্য নাটক। তার গল্পে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র। রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি। তার প্রথম উপন্যাস মধুমতী ১৯৬৩ সালে প্রকাশ হয়। একাত্তরের নয় মাস (১৯৯০) বইয়ে লিখেছেন একাত্তরের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোর কথা। রাবেয়া খাতুন রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘের পর মেঘ’ অবলম্বনে একই নামে ২০০৪ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। ২০১১ সালে তার আরেক উপন্যাস ‘মধুমতী’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক শাহজাহান চৌধুরী। ২০০৩ সালে তার লেখা ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ অবলম্বনে এই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মৌসুমী।

সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক, জসীমউদ্দীন পুরস্কার, শেরেবাংলা স্বর্ণপদক, ঋষিজ সাহিত্য পদক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, শেলটেক পদক ইত্যাদি পুরস্কার পেয়েছেন।

রাবেয়া খাতুন বাংলা একাডেমির কাউন্সিল মেম্বার। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের গঠনতন্ত্র পরিচালনা পরিষদের সদস্য, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরিবোর্ডের বিচারক, শিশু একাডেমির কাউন্সিল মেম্বার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুড়ি’র বিচারক। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্কের জুরিবোর্ডের বিচারক ও সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্ত ছিলেন বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিজ ক্লাব, বিজনেস ও প্রফেশনাল উইমেন্স ক্লাব, বাংলাদেশ লেখক শিবির, বাংলাদেশ কথাশিল্পী সংসদ ও মহিলা সমিতির সঙ্গে। তার লেখা বিভিন্ন উপন্যাসের মধ্যে আছে মধুমতী, সাহেব বাজার, অনন্ত অন্বেষা, রাজারবাগ শালিমারবাগ, মন এক শ্বেত কপোতী, ফেরারী সূর্য, অনেকজনের একজন, জীবনের আর এক নাম, দিবস রজনী, সেই এক বসন্তে, মোহর আলী, নীল নিশীথ, বায়ান্ন গলির এক গলি, পাখি সব করে রব, নয়না লেকে রূপবান দুপুর, মিড সামারে, হানিফের ঘোড়া, হিরণ দাহ, এই বিরহকাল, হোটেল গ্রীন বাটন, বাগানের নাম মালনিছড়া, বসন্ত ভিলা, ছায়া রমণী, সৌন্দর্যসংবাদ, হৃদয়ের কাছের বিষয়, মালিনীর দুপুর, রঙিন কাচের জানালা প্রভৃতি।