স্কুলছাত্রী ধর্ষণ-হত্যা: পুলিশের বিরুদ্ধে বাবা-মায়ের অভিযোগ

রাজধানীর কলবাগানে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিহত স্কুলছাত্রীর বয়স পুলিশ বেশি দেখাতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তার মা।

শনিবার কুষ্টিয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে মেয়েটিকে দাফনের পর মেয়েটির মা সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেন।

মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে তার বিচারের দাবিতে সেখানে মানববন্ধনও করেন স্থানীয়রা।

ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ও লেভেলে পড়ুয়া মেয়েটির পরিবার ইতিমধ্যে কলাবাগান থানায় মামলা করেছে।

মেয়েটির মা জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় তার মেয়ে কোচিং থেকে অ্যাসাইনমেন্ট পেপার আনার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। দুপুর দেড়টার দিকে দিহান তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তার মেয়ে অসুস্থ অবস্থায় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি সেখানে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, মেয়েকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে।

মেয়েটির মা বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পর দিহান তার মেয়ের বয়স ‘১৯ বছর’ উল্লেখ করেছিল। পুলিশ সেটাই ধরেছিল।

মেয়েটির মা বলেন, এ সময় সুরতহাল রিপোর্টে উল্লেখ করা বয়স নিয়ে আমরা আপত্তি তুললে পুলিশ ক্ষুব্ধ হয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মর্গে লাশ ফেলে রাখে। মেয়ের বয়সের প্রমাণপত্র দেখালেও পুলিশ তা আমল নিচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, পরদিন শুক্রবার বয়স প্রমাণের জন্য লাশ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা করা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় পুলিশ। আমি আমার পরিচিতি বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীর সাহায্যে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানাই। এরপর বিকেল সাড়ে ৫টায় ময়নাতদন্ত শেষ করে আমাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করে।

তিনি জানান, তার মেয়ের জন্মের পর ইস্যুকৃত টিকা কার্ড, স্কুল কার্ড এবং সর্বশেষ পাসপোর্টে তার মেয়ের জন্ম তারিখ ২০০৩ সালের ৯ অক্টোবর লেখা আছে। সে হিসেবে মৃত্যুর সময় বয়স হয় ১৭ বছর ৩ মাস।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে ১৯ বছর বয়স কোথায় পেলেন?

মেয়েটির চাচা শহিদুল ইসলাম বলেন, স্কুল সার্টিফিকেট এবং পাসপোর্টে সুনির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ থাকলেও পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্টে মেয়েটির বয়স দুই বছর বেশি দেখানোসহ নানা গড়িমসি করে ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর ময়নাতদন্ত করেছে।

এই অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এদিকে মেয়েটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর দিহানের সঙ্গে থাকা তিন বন্ধুকে পুলিশ আটকের পর সম্পৃক্ততা পাওয়া না পাওয়ায় শুক্রবার রাতে তাদের ছেড়ে দিয়েছে।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেয়েটির বাবা কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমে আমি দিহানসহ আরও তিনজনের নামোল্লেখসহ এজাহার দিলে পুলিশ তাদের আটক করে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর কলাবাগান থানা-পুলিশ আমার দেওয়া এজাহার পরিবর্তন করে শুধু দিহানকে আসামি করে মামলা রেকর্ড করে।

তিনি বলেন, সে সময় পুলিশ আমাকে বলে, যেহেতু দিহানের বাসা থেকে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই কারণে শুধু দিহানকে আসামি করে মামলা করলে সঠিক বিচার হবে। কিন্তু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে যতটুকু জানতে পেরেছি, মেয়ের ওপর যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে এই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই একজন জড়িত নয় বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

দিহানকে ‘সঠিকভাবে’ জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জড়িত অন্যদের তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে বলে মনে করেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কলাবাগান থানায় ফোন করে জানায়, এক তরুণ এক কিশোরীকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় এনেছেন। কিশোরীর শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। কলাবাগান থানার পুলিশ আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল গিয়ে ফারদিনকে আটক করে। খবর পেয়ে তরুণটির তিন বন্ধু হাসপাতালে গেলে পুলিশ তাদের আটক করে। এর আগে ফারদিন ইফতেখার ওরফে দিহান মেয়েটির মাকে ফোন করে জানান, আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতাল তার মেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।

ওই দিন গভীর রাতে স্কুলছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয় ফারদিনের বিরুদ্ধে। কলাবাগান থানায় জিজ্ঞাসাবাদে ফারদিন একাই মেয়েটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। পরে গতকাল তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।