আনুশকা ধর্ষণ-হত্যা মামলা নিয়ে মায়ের অভিযোগ

বয়স বেশি দেখানোর চেষ্টা!

রাজধানীর কলাবাগানে ‘বন্ধুর’ বাসায় মৃত্যু হওয়া স্কুলছাত্রী আনুশকা নুর আমিনের (১৭) বয়স পুলিশ বেশি দেখাতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তার মা। গতকাল শনিবার কুষ্টিয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে আনুশকাকে দাফনের পর তার মা সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেন। আনুশকাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে তার বিচারের দাবিতে সেখানে মানববন্ধনও করে এলাকাবাসী।

ঢাকার মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও লেভেলে’র শিক্ষার্থী আনুশকার পরিবার এই অভিযোগে কলাবাগান থানায় মামলার পর পুলিশ তার কথিত বন্ধু ইফতেখার ফারদিন দিহানকে (১৮) গ্রেপ্তারও করেছে। এদিকে আনুশকা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে থাকা তিন তরুণকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত শুক্রবার রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা আনুশকা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দিহানের বন্ধু। ওই তিনজনকে ছেড়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আনুশকার বাবা।

আনুশকার মা কুষ্টিয়ায় গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় তার মেয়ে কোচিং থেকে অ্যাসাইনমেন্ট পেপার আনার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। দুপুর দেড়টার দিকে দিহান তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, তার মেয়ে অসুস্থ অবস্থায় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে রয়েছে।

আনুশকার মা বলেন, ‘আমি সেখানে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, মেয়েকে মৃতাবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর দিহান তার মেয়ের বয়স ‘১৯ বছর’ উল্লেখ করেছিল। পুলিশ সেটাই ধরছিল। পুলিশ বিকাল ৪টার দিকে সুরতহাল প্রতিবেদন করাসহ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। বিকেল ৫টায় ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগ লাশ গ্রহণ করে। এ সময় সুরতহাল রিপোর্টে উল্লেখ করা বয়স নিয়ে আমরা আপত্তি তুললে পুলিশ ক্ষুব্ধ হয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মর্গে লাশ ফেলে রাখে।’

তিনি তার মেয়ের বয়সের প্রমাণপত্র দেখালেও পুলিশ তা আমলে নিচ্ছিল না বলে অভিযোগ করে আনুশকার মা বলেন, ‘পরদিন শুক্রবার বয়স প্রমাণের জন্য লাশ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় পুলিশ। আমি আমার পরিচিত বিভিন্ন শুভাকাক্সক্ষীর সাহায্যে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানাই। এরপর বিকেল সাড়ে ৫টায় ময়নাতদন্ত শেষ করে আমাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করে।’

আনুশকার মা আরও জানান, জন্মের পর ইস্যুকৃত টিকা কার্ড, স্কুল কার্ড এবং সর্বশেষ পাসপোর্টে তার মেয়ের জন্ম তারিখ ২০০৩ সালের ৯ অক্টোবর লেখা আছে। সে হিসাবে মৃত্যুর সময় বয়স হয় ১৭ বছর ৩ মাস।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে ১৯ বছর বয়স কোথায় পেল?’

আনুশকার চাচা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল সার্টিফিকেট এবং পাসপোর্টে সুনির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ থাকলেও পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্টে মেয়েটির বয়স দুই বছর বেশি দেখানোসহ নানা গড়িমসি করে ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর ময়নাতদন্ত করেছে।’

বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৬ বছরের নিচে কোনো মেয়ের সম্মতি নিয়ে যৌন সম্পর্ক গড়লেও তা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হয়। আবার দেশে ১৮ বছরের নিচের বয়সীরা শিশু হিসেবে আইনিভাবে স্বীকৃত। গ্রেপ্তারের পর দিহান পুলিশের কাছে দাবি করেছিল, তারা ‘পারস্পরিক সম্মতিতে’ শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিল। পুলিশ বলেছে, তারা ধর্ষণসহ সব অভিযোগ খতিয়ে দেখে তদন্ত করছে।

দিহানের তিন বন্ধুকে ছেড়ে দিল পুলিশ : আনুশকা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে থাকা তিন তরুণকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত শুক্রবার রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা আনুশকা ধর্ষণ-হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার ওরফে দিহানের বন্ধু। 

পুলিশ বলেছে, স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ওই তিন তরুণের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তীকালে এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা হবে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) আবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে দিহানের তিন বন্ধুর হত্যায় ও ধর্ষণে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাই শুক্রবার সন্ধ্যায় মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। যদি পরবর্তীকালে হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় ওই তরুণদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

দিহানের তিন বন্ধুকে পুলিশ ছেড়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আনুশকার বাবা। তিনি গতকাল কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রথমে আমি দিহানসহ আরও তিনজনের নামোল্লেখসহ এজাহার দিলে পুলিশ তাদের আটক করে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর কলাবাগান থানা পুলিশ আমার দেওয়া এজাহার পরিবর্তন করে শুধু দিহানকে আসামি করে মামলা রেকর্ড করে। সে সময় পুলিশ আমাকে বলে, যেহেতু দিহানের বাসা থেকে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই কারণে শুধু দিহানকে আসামি করে মামলা করলে সঠিক বিচার হবে। কিন্তু চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানতে পেরেছি, মেয়ের ওপর যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে এই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই একজন জড়িত নয় বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। দিহানকে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জড়িত অন্যদের তথ্য বেরিয়ে আসবে।’

সহপাঠীদের মোমবাতি প্রজ্বালন করে প্রতিবাদ : আনুশকা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনার বিচার দাবিতে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে সহপাঠী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের সাম্পান রেস্টুরেন্টের সামনে মোমবাতি প্রজ্বালন করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে মোমবাতি নিয়ে পদযাত্রা করে রবীন্দ্র সরবরে গিয়ে রাত ৮টায় কর্মসূচি শেষ করেন। এসময় মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ছাড়াও অন্যান্য স্কুলের অনেকে অংশ নেন। এসময় প্রশাসনের কাছে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।

এগুলো হচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিচারকার্য শুরু ও গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহান এবং তার সহযোগীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। যারা যারা এই অন্যায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল অনতিবিলম্বে তাদের সাজা নিশ্চিত করতে হবে। যে সকল বিকৃত মস্তিষ্কের ব্যক্তি গুজব ছড়াচ্ছে এবং ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটির ব্যাপারে অকথ্য কথাবার্তা বলছে এবং মেয়েটির পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এছাড়া, শুধু এই ঘটনাই নয়, দেশে আর যেন কোনো ধর্ষণের ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানান শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীরা। প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষক ও অভিভাবকরা এ ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি নিজ ছেলেমেয়ের বিষয়েও যেন সচেতন হন তার আহ্বানও জানান।

পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিকেল থেকেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উপস্থিত হতে থাকেন। এসময় আনুশকার সহপাঠী আর্জ স্রেষ্ট রয় বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছি। আমরা যে সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছি তা প্রশাসনকে মানার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের আপাতত আর কোনো কর্মসূচি নেই।’

সহপাঠী নিহান তাহের বলেন, আনুশকার মতো আর কোনো মেয়েকে যেন এভাবে জীবন দিতে না হয়। আমরা এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করছি।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কলাবাগান থানায় ফোন করে জানায়, এক তরুণ এক কিশোরীকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় এনেছে। কিশোরীর শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। কলাবাগান থানার পুলিশ আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল গিয়ে ওই তরুণ দিহানকে আটক করে। খবর পেয়ে তরুণটির তিন বন্ধু হাসপাতালে গেলে পুলিশ তাদেরও আটক করে। এর আগে ফারদিন মেয়েটির মাকে ফোন করে জানায়, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে তার মেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে স্কুলছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয় দিহানের বিরুদ্ধে। কলাবাগান থানায় জিজ্ঞাসাবাদে ফারদিন একাই মেয়েটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। শুক্রবার সে আদালতে দায় স্বীকার করে ১৮৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। এদিকে গত শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনুশকার ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তকালে দেখা গেছে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আর সেটি হয়েছে মূলত তার ‘ভ্যাজাইনাল’ এবং ‘রেক্টাম’ রক্তক্ষরণ। দুইভাবে রক্তক্ষরণের ফলেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটা আপাতদৃষ্টিতে বিকৃত যৌনাচার মনে হয়েছে চিকিৎসকদের।